Home

০১. মাঝে মাঝে ছায়াকে দেখে নেয় শরীর। দেখে শরীরটা যখন হেলান দেয়, তখন ছায়াও হেলান দেয়। ছায়াটা যখন দুলে ওঠে, শরীরটাও দুলে ওঠে। ছায়াটা যখন ভালবাসে, শরীরটাও ভালবাসে।
তারপর ছায়া ও শরীর একসাথে ঘুমুতে যায় বিছানায়।

০২. একদিন বৃষ্টির সাথে দেখা হল গরমের। অঝোর ধারায় পড়তে থাকল বৃষ্টি। তবু গরম গেল না সরে। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই, আর গরমও যাচ্ছে না কিছুতেই। আমি ছাদের ওপরে বৃষ্টি গায়ে মেখে ঘামছিলাম।

০৩. একদিন জোস্নার সাথে পাল্লা দিয়ে শহরে জ্বলে ওঠল হাজার হাজার বাতি। লাল-নীল-সবুজ হাজার রঙের বাতি। শহরের মানুষেরা রাতে এই আনন্দে নেমে এল ঘরের বাইরে। বাজি ফুটাল। হৈ-হুল্লুর আর উল্লাস করতে লাগল। তারপর অনেকদিন এই শহরে জোস্না আসেনি।

০৪. ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নও ভেঙে যায়। তাই এই আধ-মরা ভঙুর জরাজীর্ণ বাড়ির দিকে কেউ যায় না। যেন তার ঘুম ভেঙে না যায়, যেন সে স্বপ্নের ভেতর কাটিয়ে দিতে পারে আরও কিছু কাল।

০৫. ট্রেন যখন আসতে থাকে,তখন সাইরেন বাজে। স্টেশন মাস্টার বাঁশি ফু দেয়। সবাইকে রেললাইন থেকে সরিয়ে দেয়,যেন কেউ ট্রেনে কাটা না পড়ে। পতাকা উড়িয়ে ট্রেনকে জানিয়ে দেয়,এই পথ এখন তার। একদিন লোকজন অভিজ্ঞ,বুড়ো এই স্টেশন মাস্টারেরই থ্যাতলানো লাশ দেখতে পায় রেললাইনে।

০৬. আমি মাঝে-মধ্যে দৌঁড়াই। যেন পথে কারও সাথে দেখা হলে কুশল বিনিময় করতে না হয়। যেন পথে কোনও খাবার দেখলে, খাওয়ার জন্য বসে না পড়ি, যেন পথে তোমাকে দেখলে আমার ভালবাসার কথা মনে না পড়ে। আমি মাঝে-মধ্যেই দৌঁড়াই। দুই হাত উর্ধ্বে প্রসারিত করে আমি দৌঁড়াতে থাকি। মনে হয় আমি উড়ছি। আর ঘরে রেখে যাচ্ছি আমাকে।

০৭. যখন বন্যা হয়,তখন মাঠ-ঘাট,ঘর-বাড়ি সব ডুবে যায়। মানুষ মাচা বানিয়ে থাকে। যেন সেখানে জল না ঢুকে। মানুষ তখন নৌকা করে এ ঘর থেকে যায় ও ঘরে। যখন বন্যা হয়, তখন চারপাশে শুধু দেখা যায় জল আর জলরাশি। যখন বন্যা হয়,কোথাকার জল যে কোথায় যায়;কেউ জানে না।

০৮. দিন আর রাতের ঝগড়া কিছুতেই থামে না। যখন দিন আর রাত ঝগড়া থামিয়ে দুই জনের দুই মুখ দুই দিক করে রাখে, তখন গোধূলি আসে। গোধূলি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করে, তোমরা সারাক্ষণ ঝগড়া কর কেন, অন্তত আমার জন্য হলেও তোমরা একটু চুপচাপ থাক। তবু তারা শুনে না,কিছুতেই শুনে না। দিন চলে যায় বাপের বাড়ি। আর রাত চলে যায় অন্ধকারে।

০৯. একদিন কলিং বেলের শব্দে তোমার মা আসল,আমি কিছু একটা বলে চলে এসেছিলাম। একদিন কলিং বেলের শব্দে তোমার বাবা আসল, আমি কিছু একটা বলে কোনো রকমে চলে এসেছিলাম। একদিন কলিং বেলের শব্দে তুমি আসলে, আমি তোমাকে কিছুই বলিনি।

১০. একদিন বিকাল বেলায় আমরা বেড়িয়ে পড়েছিলাম রাস্তায়। তুমি মেঘ ভেবে ঘরে চলে গিয়েছিলে। ভেবেছিলে এক্ষুনি হয়ত নামবে বৃষ্টি। তুমি হয়ত জানতে না,আকাশে মেঘ থাকলেই সব সময় বৃষ্টি হয় না।

১১. যেদিন লোকটা জুতা ভাল করে পায়ে দিয়ে বের হয় না,সেদিন লোকটার সারাদিন যায় অস্বস্তিতে। কারও সাথে ভাল ব্যবহার করতে পারে না, কারও সাথে কথা বলতে বিরক্তি লাগে তার। ঠিকমত হাঁটতে পারে না,বাসায় ফিরতে পারে না। যেদিন লোকটা ভাল করে জুতা পড়ে বের হয়, সেদিন তার সবকিছুই ভাল ভাবে হয়। তার ভেতরে ভাললাগা কাজ করে। তাই প্রতিদিন লোকটা ভাল করে জুতার যত্ন নেয়, আর বের হবার সময় জুতা ভাল করে পায়ে দিয়ে বের হয়।

১২. যখন পাল তুলে দেয় নৌকা,তখন বাতাস পাল ধরে চলে যেতে চায় দূরে,অনেক দূরে,অন্য কোনও নদীর কাছে। আর মাঝি বসে বসে এইসব খেলা দেখে,যেন কতদিনের বন্ধু,কত চেনা-জানা তার এই বাতাসের সাথে। মাঝির হাসির সাথে বাতাসের হাসি উড়ে বেড়ায় সমস্ত নদীতে। একদিন এই বাতাস নৌকার পাল ছিঁড়ে মাঝিকে নিয়ে চলে যায় দূরে।

১৩. বড়শিতে পুঁটি মাছ গেথে শোল মাছ ধরত সে। একদিন বড়শিতে শোল মাছ গেথে পুকুরটা নিয়ে নিল সে। একদিন বড়শিতে নিজেকে গেথে পুকুরের জলে ভেসে রইল সে।

১৪. এপার থেকে তুমি গাইছ রবীন্দ্রসঙ্গীত, ওপার থেকে আমি গাইছি রবীন্দ্রসঙ্গীত। ওপারের ফোনে বাজছে এপার, এপারের ফোনে বাজছে ওপার। আমাদের প্রেম দেখ উড়ছে হাওয়ায়।

১৫. মেয়েটি সুন্দর করে চিঠি লিখত। গুটি গুটি অক্ষরে চিঠি লিখত মেয়েটি। মেয়েটি প্রতিদিন একটি করে চিঠি পোস্ট করত। মেয়েটি জানত না, এইভাবে চিঠির সাথে নিজেকেও সে অল্প অল্প করে পাঠিয়ে দিত খামে ভরে। হঠাত একদিন মেয়েটি বাড়ি থেকে হারিয়ে গেল। হঠাত একদিন মেয়েটি খামের সাথে চলে গেল কোথাও।

১৬. শিউলি খুব ভোরে ওঠে শিউলি ফুল কুড়োয়। শিউলি ফুল দিয়ে সে মালা গাথে। শিউলি ফুলের মালা গলায় পড়ে শিউলি সারা দিন ঘুরে বেড়ায়। শিউলি ফুলের ঘ্রাণে শিউলি শিউলি হয়ে ওঠে।

১৭. আইল তাকে নিয়ে চলে ধানের ক্ষেতে। এ ক্ষেত থেকে ও ক্ষেত,ও ক্ষেত থেকে এ ক্ষেত আইল তাকে ঘুরিয়ে বেড়ায়। ধান ক্ষেতের সবুজ বাতাস দেখায়,ধানের নাচন দেখায়। দেখায় কিভাবে একটি ধান ভালবাসে আরেকটি ধানের গাছকে। আইল তাকে ধানক্ষেতের স্বপ্ন দেখায়। ধান ক্ষেত থেকে সে আর বের হয়ে আসতে পারে না।

১৮. একই পথ দিয়ে তার ঘরে ফেরা। একই পথে জন্ম,মৃত্যু। একই পথে হাসি,কান্না,ভালবাসা। একই পথে স্কুল পালানো। একই পথে নদীতে সাঁতার। একই পথে তোমার সাথে দেখা। তবু একই পথ চিরকাল একই পথ নয়।

১৯. অনর্গল কথা বলে মেয়েটি। মার্কস-লেলিন-মাও সেতুং নিয়ে। রাশিয়া-চীন-লাতিন আমেরিকা নিয়ে। বলশেভিক বিপ্লব, মাওবাদী বিপ্লব আর হতাশা নিয়ে। প্রেম দ্রোহ ঘৃণা নিয়ে। আর যখন তার কথা শেষ হয়ে যায়, তখন সে একা হয়ে যায়।

২০. রাতে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেই সে নিজেকে
খোঁজে পায়। আর তখনই সে বউ পেটায়, না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ছাদে গিয়ে সিগারেট ধরায়। একা একা কান্না কাটি করে।
এ কারণে সে দরজা খোলা রেখে ঘুমায়।

২১. আজকাল কেউ অপেক্ষা করে না। সবারই কত তাড়া। সময়মত এসে কথা বলে চলে যায়। অথবা ফোন করে নেয় আগে থেকে। যেন তাকে অপেক্ষা করতে না হয়। আমারও আসতে একটু দেরি হলেই তুমি কেমন যেন করে ওঠ। বারবার ফোন করো। দেখা হবার পর কত বার যে ধমকাও। আমার এসব ভাল লাগে না। তাই তুমি যে সময়ে আসবে তার এক ঘণ্টা আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। তোমার জন্য অপেক্ষা করি। তোমার জন্য অপেক্ষা করতে আমার ভাল লাগে।

২২. বৃষ্টিতে কত কিছু ধুয়ে যায়। গাছের পাতার ময়লা সাফ হয়ে কেমন চকচক করতে থাকে। পিচঢালা পথগুলো মনে হয় নতুন করে বানানো। ঘরগুলো পরিপাটি হয়ে রয়। উঠান পরিষ্কার আর ধবধব করত থাকে। বৃষ্টিতে ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখছি, আমারও শরীর কেমন ফর্সা হয়ে ওঠেছে। কেবল বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল না তোমাকে বিদায় জানাবার দৃশ্য।

২৩. রোদ এসেই কত ফুল ফোটায়। কত শত ফুল। সকাল বেলায় কেমন হেসে হেসে হেলে দুলে ফোটে ওঠে ফুল।
দুপুরে রোদের তাপে কেমন শরীর ছেড়ে দেয় তারা। বোঝা যায় খুব ক্লান্ত হয়ে ওঠেছে তারা। মনে হয় এই বুঝি শেষ। তবু কোনও অভিযোগ নেই তাদের। বিকালে আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে ঝড়ে যায় ওরা। তবু কোনও অভিযোগ নেই তাদের।

২৪. মোমবাতি যখন পোড়ে তখন সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোড়ে। একটুও নড়ে না। একা একা দাঁড়িয়ে পুড়তেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পুড়ে নি:শ্বেস হয়ে যায়। মোমবাতি এইভাবে স্খির দাঁড়িয়ে পুড়ে; দেখিয়ে যায়,তার বেঁচে থাকা কতখানি সততা আর দৃঢ় সংকল্পের।

২৫. হলুদ পাতা জমে জমে স্তুপ হতে হতে,গাছের ডালপালা শুকিয়ে যেতে যেতে,আবর্জনার পাহাড় হতে হতে একদিন বনের চেহারা পাল্টে যায়। একদিন একটি ডালের সাথে আরেকটি ডাল ঘষে ঘষে
নিজেরাই জ্বলে যায় আগুনে। সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় মাইলের পর মাইল বন। কারণ বন জানে প্রকৃতি কত ভয়ানক।

২৬. মাছের চোখ তো তাকে কাতর করে না, সে ভাবে। সে ভাবে যখন সে বাজারে যায়, কত মাছ সে কিনে আনে বাসায়। সে মাছ তার বউ কুটে, তারপর রান্না করে, তারপর বাসার সবাই মজা করে খায়। সে ভাবে কই মাছের নিষ্পাপ ও নিরীহ চোখ তো তাকে কাতর করে না।

২৭. একদিন রাজহাঁসের ডানা ঝাপটানোর শব্দে তোমাদের জানালা খুলে যাবে। তারপর রাজহাঁস তোমাদের হাঁসের রাজা হওয়ার গল্প শোনাবে। তারপর রাজহাঁসকে তোমরা দেবতা ভেবে দক্ষিণা দেবে। তারপর একজন একজন করে আরও রাজহাঁস আসবে। তোমরা তাদের থাকতে দিবে তোমাদের ঘরে। তারপর এতবেশি রাজহাঁস আসবে যে তোমাদের ঘরগুলো রাজহাঁসের জন্য ছেড়ে দিতে হবে। তারপর তোমাদের এলাকাটি রাজহাঁসের এলাকা হয়ে যাবে।

২৮. শিমুল তুলোগুলো বালিশের ভেতর কেমন মরে পড়ে থাকে। তুলোগুলো কি বালিশকে কখনো বলেছিল কিছু। বলেছিল কি আমাকে ছেড়ে দাও। উড়ে বেড়ানো ছাড়া আমার বেঁচে থাকাটা অনেক কষ্টের। মনে হয় নি বলেছে। বলেও হয়ত থাকতে পারে। তবে বালিশে কাত করে ঘুমানোর সময় মাঝে মাঝে টের পাই শিমুল তুলোর কান্না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় আমার। তাই একদিন বালিশ ছিঁড়ে শিমুলতুলোগুলো সব উড়িয়ে দিয়েছিলাম।

২৯. একটি গাছ আরেকটি গাছকে বলছিল, তোমরা কি আমরা মত নিরব থাকতে পার? আরেকটি গাছ অন্য আরেকটি গাছকে বলছিল তোমরা কি আমার মত নিরব থাকতে পার? এইভাবে আরেকটি গাছ আরেকটি গাছকে, এইভাবে সমস্ত গাছ সমস্ত গাছকে বলেছিল তোমরা কি আমার মত নিরব থাকতে পার? একদিন সমস্ত গাছ মিলে পৃথিবীর মানুষদের শাসিয়ে গেল তোমরা কি একটু হলেও আমাদের মত নিরব থাকতে পার?

৩০. সমুদ্রের কোনও ছায়া থাকে না, থাকে চিহ্ণ। একদিন আমাদের গ্রামেও সমুদ্র এসেছিল। সে সময়েও কোনও ছায়া ছিল না। সমুদ্র চলে যাবার পর পড়ে ছিল শামুক আর ঝিনুকের খোসা, মাটির ওপরে দীর্ঘ আঁচড়ের দাগ ছিল। মাটি তবু মানতেই চাইল না। বিশ্বাসই করল না যে সমুদ্রের কোনও ছায়া থাকে না, থাকে চিহ্ণ।

৩১. আবেগের বাসায় যুক্তি কি যায় নি? যুক্তির বাসাতেও আবেগ যায়। শুধু যায় না প্রায় সময়েই এরা দুজন মিলে ব্যাপক আড্ডা দেয়। তখন বোঝা যায় এদের কি পরিমাণ খাতির। কিন্তু পাড়ার লোক এটা বিশ্বাস করে না। ভাবে যে মানুষ যখন আবেগী হয়ে ওঠে, তখন তার সাথে যুক্তি থাকে না। পরে যুক্তি আসলে মানুষের আবেগ চলে যায়। অথচ ঘটনাটা হল, মানুষ যখন আবেগী হয়ে ওঠে, সেই আবেগই মানুষকে যুক্তির কাছে নিয়ে যায়।

৩২. কেবল অন্ধকারই পারে দৃষ্টিকে মেরে ফেলতে। তাই দৃষ্টি কখনোই অন্ধকারের কাছে যায় না। কোথাও মোম জ্বলতে থাকলে সে মোমের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কোথাও কোনও বিদ্যুতের আলো বা লণ্ঠনের আলো-এসবের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্ধকার তবু দৃষ্টির পথ ছাড়ে না।

৩৩. বোবা লোকটি গান গাইত। বোবা লোকটি গান শুরু করলেই রাস্তায় জড়ো হয়ে যেত হাজারও মানুষ। বোবা লোকটির গানের ক্যাসেট বের হল। হাজার হাজার ভক্ত বাড়তে থাকল তার। বোবা লোকটি এখন কনসার্টে গান করে। লাখ লাখ মানুষ থাকে এই কনসার্টে। কারণ বোবা লোকটি বোবা।

৩৪. ঘড়ি আর ঘড়ির কাঁটার সংসারটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়। ঘড়ি লক্ষ্মী বউয়ের মত সারাক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে। আর ঘড়ির কাঁটা দৌঁড়ায় যে শুধু দৌঁড়াতেই থাকে। বিরামহীনভাবে দৌঁড়াতে থাকে। এমন সংসারও জগতে হয়।

৩৫. সরলরেখা আর বক্ররেখার সাথে কখনোই পাড়া যাবে না আর। সরলরেখা বলে-আমি তো সরল। জগত সংসারটা সরল হলে কতই না ভাল হতো। যতদোষ এই বক্ররেখাটার। আর বক্ররেখা বলে-পৃথিবীটা সরল বলেই তো এত পিছিয়ে আছে। দয়া করে পৃথিবীটাকে একটু এগোতে দাও।

৩৬. ব্যাঙ যখন পুকুরে ঝাপ দেয়, তখন জল শব্দ করে ওঠে। ভয়ে নয়, উল্লাসে। এই উল্লাসে যে এখন অন্তত কেউ তার বুক জুড়ে দৌঁড়িয়ে বেড়াবে কেউ। কাউকে সে বলতে পারবে, এই এত দৌঁড়াদৌঁড়ি করছ কেন? কাউকে সে বলতে পারবে, অনেক দুষ্টামি হয়েছে। এবার ঘরে গিয়ে চুপচাপ ঘুমাও।

৩৭. এমন এমন পথও থাকে যেখানে কেউ যান না। আগে হয়ত যেতেন। এখন কেউ এই পথ ব্যবহার করেন না। পথটি মৃত সাপের মত মরে পড়ে আছে। সাপটির মত এই পথও রোদের আলোতে ঝলসে উঠে। পঁচে গন্ধ বের হয়। মানুষজন কেউ আর যান না সেখানে। তবু পথটির শেষ মাথায় সন্ধ্যা নেমে আসে। রাত হয়।

৩৮. লোকটি কিছুতেই ফুলের বাগানে যায় না। লোকটিকে কোনভাবেই ফুলের বাগানে নিয়ে যাওয়া যায় না। অজস্র ফুলের গর্তে নিজেকে দেখতে পেলেই নাকি লোকটার মৃত মানুষদের কথা মনে পড়ে,কারণ মানুষ মরে যাবার পর ফুল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। তাই তার নিজেকে মৃত মনে হয়। অজস্র ফুলের কাছে গেলেই তার নাকি মনে হয়,এখনই মরে যাবে সে।

৩৯. এই যে নদী, এই যে শীতল নদী। ছোট ছোট স্রোত তার। মাঝে মাঝে পানকৌড়ি উড়ে এসে বসে। ডুব দেয়। নদীর মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে উড়ে অজস্র পাখি। তার উপর একটি সেতু আছে। সেই সেতু দিয়ে গাড়ি যায়। ঘোড়া যায়। আমার ঘোড়াটি সেতু দিয়ে যাবে না। নেমে পড়ল নদীতে। সে সাঁতরিয়েই যাবে।

৪০. কিছু কিছু বাতাস নাকি আসে পাতা উড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্য। কিছু কিছু বাতাস উড়ে এসে এসে নাকি জিজ্ঞেস করে যায়, কে আছে বাকি আর তার সাথে যাওয়ার। তারপর সে একদিন হুট করে আসে। তারপর সে একদিন হুট করে এসে নিয়ে যায় পাতা। একদিন নাকি হুট করে এসে আমাকেও নিয়ে যাবে।

৪১. একটি মাছ যখন সামুদ্রিক পাখির ঠোঁট ধরে উড়ে,তখন মাছটি উড়ে না। মাছটি প্রাণভয়ে ছটফট করতে থাকে। মাছটি পাখির ঠোঁটে ব্যথায় কাতরাতে থাকে। মাছটি সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠোঁট থেকে বের হয়ে আসতে চেষ্টা করে। এই মাছটি হয়ত অর্ধমৃত অবস্থায় সমুদ্রে পড়ে যাবে নয়ত পাখিটি উড়ে উড়েই গিলে খাবে তাকে।

৪২. আমরা যারা সিনেমা দেখি,বুদ হয়ে থাকি সিনেমায়,কখনো কখনো কেঁদে ফেলি,কখনো হাসি। নিজেরা নিজেদের দিকে তাকাই। সিনেমা আমাদের ধীরে ধীরে তার গভীরে নিয়ে যায়। ব্যথা আর হাসিতে ভেসে যেতে থাকি। যদিও জানি সিনেমা কখনোই বাস্তব নয়।

৪৩. পাখি যখন পাতায় পাতায় ওড়ে তখন শুধু ওড়ে না,খাবার সংগ্রহ করে। কখনো কখনো পাতায় লুকিয়ে থাকে। যেন তার শক্ররা দেখতে না পারে। পাতা তাকে এমনভাবে লুকিয়ে রাখে যেন কেউ তাকে দেখতে না পায়। এভাবে পাখি আর পাতার খেলা চলতে থাকে।

৪৪. মাকড়সা তার জাল বানায় পোকা আটকে রাখার জন্যে। যেন এই পোকাটি আর কোথাও যেতে না পারে। যেন এই পোকাটি পরে সে আয়েস করে খেতে পারে। মাকড়সার এই জালে শিশিরও আটকে থাকে। কিন্তু মাকড়সা শিশির খায় না। একটু দূরে বসে চেয়ে থাকে। আর শিশির হেসে হেসে ওড়ে যেতে থাকে।

৪৫. শীতকালে যখন গাছের সব পাতা ঝড়ে যায়,একটিও পাতা থাকে না যখন,তখন গাছের ডালগুলো হাত উপরে তুলে প্রার্থনা করতে থাকে। কি প্রার্থনা করে তখন গাছ।

৪৬. ছেলেটা যখন পাথর ছোড়ে মারে তখন শুধু পাথর ছোড়ে মারে না, একটি মেঘ সে ছোড়ে মারে। সেই মেঘ উড়তে উড়তে কোনও একটা জায়গায় গিয়ে অনেক কালো হয়ে যায়, আর তখনই ভারী হয়ে আসে বাতাস। তখন বৃষ্টি নামে। কেউ একজন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে আর সেই বৃষ্টিতে সারারাত ভিজে।

৪৭. ছেলেটি আদর-যত্ন করে ঘুড়িটি ঘরে রেখে দেয়। রাতে সে স্বপ্ন দেখে কত উপরে উড়িয়েছে সে ঘুড়িটি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাটাই আর ঘুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ছেলেটি। ছেলেটি সুতা ছেড়ে দেয় আর ঘুড়িটি পাগলের মত উড়তে থাকে। ঘুড়িটি উপরে উড়তে উড়তে কোথাও চলে যেতে চায়। ছেলেটি ঘুড়ির সুতা ধরে টান দেয়। ঘুড়িটি যেতে পারে না। ছেলেটি শিখল নাটাইয়ের ব্যবহার। ছেলেটি জানল না ঘুড়ির গলায় সুতা বেধে যাকে সে উড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সে উড়ে উড়ে চলে যেতে চায় অন্য কোথাও।

৪৮. অনেক রাতে কখনও কখনও পাখির শব্দ শোনা যায়। এটি পাখির কান্নার শব্দ। রাতে যে পাখি শব্দ করে, তা গান নয় কখনই। মানুষও রাতে ঝগড়া-ঝাটি করে। কাঁদে। গভীর রাতে কান পেতে রাখলে এই সব শব্দ শোনা যায়।

৪৯. কিছু কিছু আলো জলের গভীরে বাস করে। পুকুরের জল কিংবা নদীর জলে। তাকিয়ে দেখলে মনে হবে কত শান্ত আর ভালবাসার সংসার তাদের। এত স্থির-স্নিগ্ধ সংসারও হয়। এইভাবে দু’জনে এত বেশি মিলে-মিশে যাওয়া যায়। এতটা একাট্টা যে জল নড়ে উঠলে, আলোও নড়ে উঠে তেমন করে।

৫০. আজকাল কারও জন্য কেউ অপেক্ষা করে না এটা সে জানে। তারপরও কেন যে সন্ধ্যা বেলায় একা একা ডালে বসে থাকে লক্ষ্মী পেঁচা। কেমন স্থির আর মায়াবি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এখনও তাহলে কেউ কেউ ভাবে- কেউ একজন অবশ্যই আসবে। কোনও অন্যমনস্ক মুহূর্তে পেছন থেকে চুপিচপি এসে কেউ একজন তার হাত ধরে জানতে চাইবে- কেমন আছ?

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s