Home
art
১. ঝড় মানে সবসময়ই এতটা শক্তিশালী নয় যে
যে কোনও ঝড়ে সবকিছু ওড়ে যাবে
মানুষ মারা যাবে
কিছু ঝড় আসে
তোমার ঠিক সমালোচনা করার মত
তোমার হেসে হেসে কথা বলার মত
অথবা কোনও সিনেমার মত
ঠিক ঝড় নয়
ঝড়ের মত কিছু একটা ঝড়
আমি আসলে ব্যস্ত ছিলাম
আমি আসলে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম
যে এই ঝড়ের ভেতরে আমি একটি দ্বীপের উপর ছিলাম
আর আমি আমার আবেগের গাছ বেয়ে উঠছিলাম
আর সেই গাছে থাকা একটি সাপ আমাকে কামড়াতে চেয়েছিল
এটা সত্যি
এরকম গাছ আছে
আর সেই গাছে কেউ উঠলে
সাপ তাকে কামড়াতে আসে
আর জনমানবহীন দ্বীপও থাকে
সেই দ্বীপে ঝড় এলেও কিছু হয় না
মানে তোমার কথা বলার মত যে ঝড়
তোমার সমালোচনা করার মত যে ঝড়
সে ঝড়ে আমার কোনও ভয়-ডর করে না
কেবল তোমার হাসি হাসি সমালোচনামুখর মুখে
তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে
আর আমার আবেগের গাছ বেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে
যেখানে একটি সাপ কামড়াতে আসে।
২. ধর তুমি একজন ফুল
পৃথিবী সত্যি প্রেমময়
ভোট গণনার পর ভুলগুলো মেনে নাও
ভাব এটা আসলে প্রতিযোগিতা নয়
এখানে সবাই বিজয়ী
তোমার ফুলের বাগানের পোকাগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ
সত্যি এরাও প্রেমময়
ছোটবেলায় তুমি যে চাঁদকে তোমার পাশে দেখেছ
সেই চাঁদ এখনও পাশে আছে তোমার
তোমার সবচেয়ে প্রিয় প্রাণিটি কখনও বিলুপ্ত হবে না
কারণ তাকে তুমি ভালবাস
আর ভালবাস বলে ঘরে এনে তাকে লালন-পালন কর
আমরা ভেবেছিলাম মদ আমাদের যকৃতের জন্য ভাল
এই ভাল ভাল বলে আমরা প্রচুর মদ খেয়েছি জীবনে
এইভাবে ভাব যে আমরা শুধুমাত্র একটা ভুল করেছিলাম
এই ভুলটা আমরা আর করতে চাই না
দেখ তোমার আকাশ সবসময়ই সুন্দর
তুমি দেখ
তুমি আসলে ফুল
তুমি চাইলেই আকাশটাও সরিয়ে ফেলতে পার
এটা তোমার ওপরে নির্ভরশীল
এটা তোমার নতুন পৃথিবী
আর তুমি এই পৃথিবীতে অনেক সুখী

এভাবে ভাব
এটা ভাল কিছু ভাবনা বা চিন্তা করার একটা সহজ পদ্ধতি হতে পারে।

৩. পদার্থবিদদের মতে
মহাবিশ্ব বড় হচ্ছে
এবং মহাবিশ্বের একটি উপাদান আরেকটি উপাদান থেকে
নির্দিষ্ট দূরত্বে উড়ছে
এবং সবকিছুই এক সময় ছোট হতে হতে মহাশূন্যে মিলিয়ে যাবে
কাজেই তোমাকে যদি বলি
তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না
তাহলে তা হবে আসলেই হাস্যকর
কাজেই আমি তোমাকে বলছি
তোমার স্যুটকেস ও আন্যান্য জিনিসপত্রগুলো রাখ
এটা তোমার শিকড়
আর আমরা দুজনে
মহাবিশ্বের দুইটি গাছ
চা খাও
আমি তোমার পছন্দের গানটা ছেড়ে দিচ্ছি
আমার ক্রেডিট কার্ড তোমার হাতে দিচ্ছি
আমি সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দেব
আমি আমার ক্যান্সারের চিকিতসা করাব
আমি নিয়মিত মন্দিরে যাব
বাচ্চাদের নিয়ে খেলব
অফিস শেষে বাড়ি চলে আসব
তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।
৪. আমার ধারণা
আমার মৃত্যু হয়েছে
এমন কিছু কেউ প্রমাণ করতে পারবে না
কোনোভাবেই কেউ পারবে না
এবং এটা আমার এক ধরনের মুক্তি
বড় একটা মুক্তি
এবং এই কারণে
আমি আমার মৃত্যুর একটা চিঠি লিখে রাখব
আমি আমার পরিসমাপ্তির একটা কিছু লিখে রাখব
আমি অনিশ্চয়তাকে রাখতে চাই না
অযৌক্তিক কিছু রাখতে চাই না
আমি আমার মৃত্যু হয়েছে
এটা লিখে রাখলে
অনিশ্চয়তা আর অযৌক্তিক বিষয়গুলো আর থাকবে না
তবে আমার কষ্ট হচ্ছে
কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে এরকম কিছু ঘটলে
একটা বড় ধরনের বিশ্বাসের ফাটল শুরু হবে।
৫. আজ বৃষ্টির দিন
বৃষ্টির দিন মানে শুধু সাধারণত যে বৃষ্টি হয়ে থাকে
সেভাবে ভাবলে হবে না
ঘরের টিনে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে আজ
মনে হচ্ছে ঘরের টিন নয়
বৃষ্টি দিয়েই তৈরি এই টিন
আর তা নেচে বেড়াচ্ছে সেখানে
ঘরের জানালা দেখলে মনে হবে
বৃষ্টির ফোটা লেগে আছে রেলিং এর গায়
আসলে বৃষ্টির ফোটা নয়
বৃষ্টি দিয়েই গড়া এই রেলিং
আর তাই চকমক করছে খানিক আলোয়
অথবা গাছের দিকে তাকাও
দেখ গাছগুলো গাছ নয়
কেমন একবার নুয়ে পড়ছে
আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে
কেমন সাদা হয়ে উঠেছে বৃষ্টির জলে
আসলে সাদা হয়ে উঠেনি
গাছগুলো বৃষ্টি দিয়ে তৈরি
হাজার হাজার বছর ধরে
হোটেলে যে পানি খাচ্ছ
এটা আসলে পানি নয়
বৃষ্টির জলই খাচ্ছ তুমি
আর যে হোটলের ছেলেটি তোমাকে পানি এনে দিয়েছে
তার চোখের দিকে তাকাও
তারপর তাকাও তার পুরো শরীরে
দেখ তার সারা শরীরে কেমন বৃষ্টি আর বৃষ্টির উল্লাস
আসলে সে বৃষ্টির ছেলে
হোটেল থেকে রাস্তার দিকে তাকাও
গাড়িগুলো কেমন বৃষ্টি-রঙা
আসলে গাড়িটা বৃষ্টি-রঙা নয়
গাড়িটা আজ বৃষ্টি-গাড়ি
বৃষ্টির জলে কেমন মাছ উঠে এসেছে ডাঙ্গায়
এটা আসলে মাছ নয়
বৃষ্টিমাছ
বৃষ্টির জলে উঠানে হেঁটে যাচ্ছে দেখ সাপ
কেমন ভেজা শরীর আর নরম
এটা আসলে সাপ নয়
বৃষ্টিসাপ
সমস্ত দিন কেমন সুন্দর আর ঝকমকে হয়ে উঠেছে দেখ
আর তোমার শরীরের দিকেও একবার তাকিয়েছে গোপনে
তোমার শরীর কেমন অন্যদিনের মত নয়
আজ অনেক বেশি উজ্জ্বল আর সুন্দর
তুমি আসলে শুধু প্রেমিকা নও
বৃষ্টিপ্রেমিকা
আর আমার শরীর ও ঠোঁটের দিকেও তুমি তাকাতে পার
দেখ কেমন ভেজা ভেজা
আর অন্যদিনের চেয়ে নরম ও উজ্জ্বল
আমিও আসলে ঠিক আমি নই আজ
আমিও কিন্তু বৃষ্টিপ্রেমিক
৬. একদিন আমরা গাছের সবুজ কচি পাতায়
আলো ঝলমল করতে দেখেছি
একদিন না প্রায়ই এমন আলোতে
আমাদের চোখ পুলকিত হয়ে ওঠে
বিশেষ করে বৃষ্টির পর
যখন সূর্য হেসে ওঠে
সোনা রং এর আলো ছড়িয়ে পড়ে ভুবনময়
পাতাগুলোও নেচে ওঠে তখন
এবং
এই পাতার ওপর আলোর নাচন
আমাদের চোখকে আনন্দ দেয়
আমরা তাকিয়ে থাকি খানিক
এই আনন্দের জন্য
কখনও কখনও একা একাই হেসে ওঠি আমরা
আবার ছায়াও আমাদের চোখে আনন্দ দেয়
কিন্তু এই আনন্দ হয়ত ততটা নয়
চোখ হয়ত ততটা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে না
যেমর ধরুন
আমি বেঘুরে ঘুমে
আমার কবিতার শব্দগুলো
একটি চিত্র হয়ে দাঁড়ালো এই ঘুম কালো অন্ধকারে
এটা আমাকে আনন্দ দেয়
শুধু আমাকে নয়
যারা এভাবে দেখেন
তাদের প্রত্যেকেই এমন আনন্দ পান
সুখী সুখী লাগে তাদের
একটি গাছে অনেক পাতাই থাকে
এত পাতা যে
আমাদের পক্ষে তা গণনা করা সম্ভব না
কখনও কখনও গণনা করার চেষ্টা করলেও
হার মানতে হয়
সেই সব পাতা আবার
শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত থাকে
বলা যায়
শাখা-প্রশাখাগুলো ঢেকে রাখে পাতা
আমার মাঝে মাঝে এই শাখা-প্রশাখাগুলোকে
বিদ্যুতের তারের মত মনে হয়
আর
বিদ্যুতের তারগুলোকে মনে হয়
ঢেকে রেখেছে এইসব কচি পাতা
আর সেসব পাতার ওপর
হঠাত যে আলোর ঝলকানি দেখা যায়
তাকে মনে হয়
সত্যিকারের আলো
মনে হয়
বিদ্যুতের সত্যিকারের আলো এই বুঝি জ্বলে ওঠল
এইসব দেখাকে অবশ্য
অনেকেই বলে ফেলবেন অলঙ্কার
বা অলঙ্কারের মত অনেকটা
৭. আমরা একটি গিফট শপের সামনে দিয়ে হাঁটছিলাম
দোকানটির কাচ গলে বেরিয়ে আসছিল অনেকগুলো সুন্দর
সেই সৌন্দর্য্য আমাদের আটকে রেখেছিল
যেন এই দোকান থেকে অন্য দোকানে আমাদের দৃষ্টি না চলে যায়
যেন এই দোকানেই আমরা ঢুকে পড়ি
আমাদের পকেটে টাকা থাকুক আর নাই থাকুক
আমরা গরীব হই আর নাই হই
আমাদের হৃদয়ে ভালবাসা আর প্রেম থাকুক আর নাই থাকুক
আমাদের কোনও মেয়েকে ভাল লাগুক আর নাই লাগুক
আমাদের প্রেমিকাকে উপহার দিতে ইচ্ছে হোক আর নাই হোক
আমরা এই দোকানের দিকে তাকাবই
এই দোকান আমাদের দৃষ্টি তার দিকে নিয়ে যাবেই
আর বাধ্য করবে কিছু কিনতে
কেননা আদতে গরীব মানুষেরও হৃদয় থাকে
সেও চায় তার প্রেমিকাকে কিছু একটা উপহার কিনে দিতে
যাতে করে সে খুশি হয়
খুব খুশি হয়
আর খুশি হয়ে তার সেদিনকার রান্নাটা আরও ভালো হয়ে যায়
আমরা তাই কেউ হয়ত প্রেমিকার জন্য
কেউ হয়ত মার জন্য
কেউ হয়ত বাবার জন্য
কেউ হয়ত ছোট বোন বা ভাইয়ের জন্য
কোনও একটা উপহার দেবার কথা ভাবছিলাম
আর সেজন্যেই তাকিয়েছিলাম দোকানের দিকে
গিফট শপের দিকে
আমরা হয়ত ভাবছিলাম
কোন উপহারটি কেনা যায়
কোন উপহারটির দাম কত হতে পারে
কোন উপহারটি অবশ্যই কিনতে হবে
কোন উপহারটি এই দোকানে এসে নিয়ে নিতে হবে
যখন পকেটে টাকা আসবে
পকেটে টাকা আসা মাত্র আমরা কিনে নেব সেই উপহার
আমাদের চোখে হয়ত আমাদের প্রিয় মানুষগুলোর হাসি মুখ ভাসছিল
আমরা হয়ত ভাবছিলাম
একদিন অবশ্যই পকেটে টাকা আসবে
আর কিনে নেব এই উপহার
এত এত দামি উপহারের ভিতর আমরা কিনতে পারি এমন উপহারও সেখানে নিশ্চয় আছে
অথবা যতই দামি উপহার হোক
প্রিয় মানুষের যেন সেই উপহার তো কেনাই যায়
আমরা এসব যখন ভাবছিলাম
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে
দোকান থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে
সেখান থেকে অনেক মানুষকেও কিনতে দেখেছি
এইসব দামি উপহার
কিন্তু কখন এইসব দামি উপহার দেখতে দেখতে
এইসব চোখ ঝলমলো উপহার দেখতে দেখতে
এইসব উপহারের কথা ভাবতে ভাবতে
প্রিয় মানুষগুলোর হাসি মুখ মনে আসতে আসতে
কখন যে খুব বেশি দোকানের কাছাকাছি চলে এসেছি
কখন যে দোকানের খুব বেশি কাছে চলে এসেছি
এত বেশি যে সেখান থেকে
সেখানে দাঁড়িয়ে দোকানের কিছু দেখা দোকানের নিরাপত্তার জন্য হুমকির মত
আর তাই আমাদের পেছনে কখন যে দারোয়ান এসে দাঁড়িয়ে আমাদের খেয়াল রাখছিল
টের পাই নি
টের পাইনি একজন দারোয়ার পেছন থেকে আমার শার্ট ধরেও টানছিল।
৮. সে হাঁটছিল।
তাকে তার পা নিয়ে যাচ্ছিল।
সে একটি নোংরা পথ দিয়ে হাঁটছিল।
তার পা ছুঁয়েছিল মাটি
আর মন ছুঁয়েছিল গভীর চিন্তা।
এত সুন্দর একটি মেয়েকে মানুষ জানালা দিয়ে হাঁটতে দেখছিল।
মেয়েটির চোখ ছিল পথের সামনে
অবশ্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না
কোনও লক্ষ্যও ছিল না মনে
মানুষগুলো মেয়েটির সামনাসামনিই তাকিয়েছিল
ভাবছিল মেয়েটি এভাবে কোথায় যাচ্ছে
মেয়েটির হয়ত বিশেষ কোনও কাজ আছে
তাই এভাবে এত দ্রুত
কোথাও কোনও দিকে না তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে
মেয়েটি এতটা ব্যস্ত যে
সে হাঁটছিল
কিন্তু মনে হচ্ছিল দৌঁড়াচ্ছে
তার মুখ যদিও মলিন
তার মন ছিল চাঞ্চল্যে ভরা
চিন্তা আর অজস্র কথায় ভরপুর
মানুষের চিন্তায় আর কি হয়
মেয়েটি যাচ্ছে তো যাচ্ছেই
মেয়েটিই জানে সে কোথায় যাচ্ছে
মেয়েটিই জানে সে কি হতে চায়
মেয়েটিই জানে সে কি করতে চায়
মেয়েটিই জানে কোথায় তাকে থামতে হবে
৯. এমন কিছু জায়গা থাকে
যেখানে শুধুই অন্ধকার
এতটাই অন্ধকার তুমি তোমার হাতটা পর্যন্ত দেখতে পাবে না
সেখানে কখনই সন্ধ্যা হয় না
এই অন্ধকারে সবকিছুই শুনে শুনে বুঝতে হয়
ধর তুমি মোম জ্বালাচ্ছ
এই মোমটি অন্ধকারে দেখা যাবে না
জ্বালানোর পরও
কেবল শব্দ শোনা যাবে
শব্দে বোঝা যাবে যে তুমি মোম জ্বালিয়েছ
তোমার শ্বাস কষ্টের শব্দ শোনা যাবে
বোঝা যাবে তুমি খুব একটা কিছু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবছ
এখানকার শূন্যতাকে তোমার মদের মত মনে হবে
বোঝা যাবে তুমি কখনই আমাকে চাও নি
এখনও আমাকে চাও না
এই অন্ধকার জায়গাটা আমি বানিয়েছি
একদিন এখানে তোমাকে নিয়ে আসব।
১০. পৃথিবী এতটা এগিয়ে গেলেও
এত এত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও
দ্বীপগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ
ওরা কেমন নি:সঙ্গ একা
পৃথিবী থেকে কেমন মনে হয় বিচ্ছিন্ন
একই সূর্যের নিচে হলেও
কেমন অনিরাপদ
সন্দেহজনক
খারাপ
এমন মনে হয়
বড় কোনও ঝড় হলে
এই দ্বীপই আক্রন্ত হয় বেশি
এই দ্বীপ আসলে এই আমরা
আমরা অনেক মানুষকে খেতে দেখেছি সমুদ্রের
সমুদ্রের গর্জনে অনেক মানবতা গুড়িয়ে যেতে দেখেছি
আবার দেখেছি
বড় বড় জাহাজ
সেই জাহাজে করে গভীর রাতে অনেক ধনী লোককে যেতে দেখেছি
তারা দুর্বীন দিয়ে আমাদের দেখে যেত
আর হাসত
সমুদ্রে গর্জনে এই জাহাজ কেঁপে ওঠেনি
কেবল প্রায়ই কেঁপে ওঠি আমরা
কারণ সমুদ্রের গর্জন কেবল এই দ্বীপকেই
তছনছ করে যায়
১১. মাঝে মাঝে তোমার আঁকা ছবি
গ্যালারিতে দেখতে যাই
গ্যালারিতে নয়
মনে হয় আমার মনের ওপরই যেন অনবরত ছবি এঁকে গেছ তুমি
যেন মনে হয় আমি উড়ছি
যেন মনে হয়
আমার চিন্তাগুলোই তুমি ছড়িয়ে দিচ্ছে তোমার রং তুলিতে
এর ঘ্রাণ মনে হয় আমার ভাবনারই ঘ্রাণ
আমি উড়ছি
আর পাখনা দুইটি তোমার
তোমার পাখনায় ভর করে মুক্ত হচ্ছি আমি
বাতাসে নাচছি
গান গাচ্ছি
তুমি তোমার এক একটি রং তুলির রেখায়
আমাকে নিয়ে যাচ্ছ
আমাকে ছড়িয়ে দিচ্ছ
তোমার যা কল্পনা
আমার কাছে তা সত্যি ঘটছে
আমি জানি না
আমি কেন মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলি
মাঝে মাঝে আমি কেন কাউকে না জানিয়ে চলে যাই দূরে
এখন থেকে তোমার কাছে আসব
তোমার রং তুলির রেখায় উড়ে বেড়াব আমি
মুক্ত হয়ে উড়ব বাতাসে
গান গাব
আর কখনই কাউকে না জানিয়ে দূরে কোথাও যাব না
একা একা হাঁটতে হাঁটতে কোথাও কেঁদে ফেলব না
১২. ব্যর্থতার ভেতরেও সৌন্দর্য থাকে
ব্যথায় কুকড়ে যাওয়া জীবনও সুন্দর
এই জীবনে আমাকে হয়ত কষ্ট করতে হয় অনেক
কষ্ট করতে করতে শিখতে হয় বেঁচে থাকা
সংগ্রাম করতে করতে জানতে হয় কাকে বলে ভাল করে বাঁচা
মাঝে মাঝেই আমি ভেঙে পড়েছি
মাথা নিচু করে সারা শহর হেঁটেছি
কিন্তু জীবনই দেখিয়েছে
কিভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়
আমি জানি আমি আমার চাওয়াগুলো হারিয়ে ফেলেছি
আমার আশা থাকতে পারে
এমন কিছু ভাবতে দেয় নি কেউ
কেবল এই একটু পরে কি করে বাঁচব
এই নিয়ে থেকেছি ব্যস্ত

তবু আমিই সবচেয়ে ভালবাসা দেখেছি
শুনেছি কত ভালবাসা নিয়ে বসে আছে প্রকৃতি
দেখেছি পৃথিবী কিভাবে ভরে ওঠে লাল রঙে
প্রকৃতিকে আমিই ভাল করে দেখেছি
দেখেছি সূর্য কিভাবে ফুল ফুটিয়ে তোলে
আর সমুদ্র কিভাবে একা একা হেলে দুলে নেচে ওঠে
আমিই দেখেছি আকাশের সবগুলো রঙ
যা দেখে আমি ভুলে গিয়েছি
একজন ভাল প্রেমিকার কি প্রয়োজন।

১৩. আকাশ এতটা কালো
আর বাতাসও আসছে ঘনিয়ে
খুব দ্রুত বেশ বড় একটা বৃষ্টি হবে
অনেকক্ষণ ধরে হবে এই বৃষ্টি
ঘরের বাইরের সব কিছু এবং আমরা সবাই মিলে চলে এলাম নিরাপদ আশ্রয়ে
আমার পুকুর
প্রিয়তম পুকুর
আর পুকুরের মাছ
কেমন লাফিয়ে উঠেছে আনন্দে
বৃষ্টির ফোঁটার মত নেচে উঠছে মাছ
এই আনন্দ আর সুখ নিয়ে আমরা চলে এলাম ঘরে
রাতভর বৃষ্টি হল
বৃষ্টির জলে ভরে উঠল আমাদের পুকুর
আমাদের পুকুরের জল উপচে আরও দূরে চলে গেল
টইটুম্বুর এই পুকুর থেকে চলে গেল আমার প্রিয়তম সকল মাছ
১৪. গতরাতে তোমাকে আমি আকাশে দেখেছিলাম
আকাশ তখন কালো ছিল
আর তুমি আলো ছড়াচ্ছিলে
যেভাবে তারা আলো ছড়ায়
আসলে তুমি তারাই ছিলে
তোমাকে তারারূপে যখন দেখছিলাম
তখন অন্য তারাগুলোও জ্বলছিল
এবং একই রকম দেখাচ্ছিল
আমি বুঝতে পারছিলাম না
এটা আসলেই তুমি নাকি অন্য কেউ
প্রায় রাতেই আমি আকাশে তারা দেখি
তারাদের কথা বলা
চলাচল
এসব দেখি
কিন্তু এতসব তারাদের মাঝে যে তুমিও আছ
এটা আমি জানতাম না
১৫. কোনও মানুষকে যদি কেউ পছন্দ না করে
সেই মানুষটি যদি ভীষণ একা হয়ে যান
তাহলে তার মায়ের কথা মনে পড়ে।

কোনও মানুষকে যদি কেউ ফোন না করে
বা কেউ চিঠি না লেখে
তাহলে তার পুরনো বন্ধুদের কথা মনে পড়ে।

এরপর তারা নিরবতার চাদরে ঢাকা পড়ে
এবং শেষপর্যন্ত তারা নিজেরা নিজেদের খুঁজে পায়।

১৬. আমরা বাস্তবে যা ভাবি
বাস্তবে যা করতে চাই
দেখতে চাই
হতে চাই
তা কখনও কখনও বাস্তবে করতে পারি না
এজন্যই হয়ত তা স্বপ্নে করি
স্বপ্নে দেখি
স্বপ্নে হতে চাই
বা পৃথিবী আমাদের কোনও বিষয়ে অপূর্ণ করে রাখতে চায় না
তাই সে স্বপ্নের ভিতর
আমাদের না পাওয়াগুলো
আমাদের চাওয়াগুলো
আমাদের অদেখাগুলো
দেখিয়ে দেয়
পাইয়ে দেয়
এইভাবে আমরা সম্পূর্ণ হয়ে উঠি
আমাদের কোনও কিছুই অপূর্ণ থাকে না
কাজেই আমাদের স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না
স্বপ্ন আমাদের পুষ্টির যোগানদাতা
আমাদের প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখে যেতে হবে
তা না হলে আমরা মারাও যেতে পারি
১৭.
আমরা পরিবর্তিত হতে ভয় পাই
কারণ হয়ত
আমরা ছোটবেলায় যে পাহাড়টিকে যেখানে দেখেছি
সে পাহাড়টি এখনও সেখানেই আছে
অথবা আমরা দেখেছি
সবুজ পাতাগুলো যখন হলুদ হয়ে উঠে
এবং হলুদ হতে হতে তা যখন শুকিয়ে যায়
তখনই সে পড়ে যায়
বন্যায় আমাদের বাগানে জল ঢুকে পড়েছিল
থেকেছিল অনেকদিন
জল চলে যাবার পর
আমাদের বাগানের সবগুলো গাছ কেমন মলিন হয়ে উঠেছিল
তারপর ধীরে ধীরে তারা ঢুলে পড়েছিল মৃত্যুর কাছে
আমরা পরিবর্তিত হতে চাই না
এইসব আতঙ্কে আমরা প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ি
এভাবে একইভাবে আমরা প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়তে চাই
অথবা ছোটবেলায় যেভাবে মার কাছে গল্প শুনে শুনে ঘুমিয়ে পড়তাম
সেভাবে এখনও ঘুমিয়ে পড়তে চাই
পরিবর্তন কতকিছু যেন ছিনিয়ে নিয়ে যায়
আর হু হু করে হাসে
পরিবর্তন প্রতিদিন আমাদের ভেতরে আতঙ্ক তৈরি করে
আর আমরা ভয়ে ঘুমিয়ে পড়ি
১৮.
ভেতরের সৌন্দর্য আসল সৌন্দর্য বলে বলে
আমাদের বাহিরটা কেমন কুতসিত হয়ে গেছে দেখ
কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না
ভাবে যে দেখেছ লোকটার চেহারা
দেখেছ কেমন ডাকাতের মত
যে শিশুটিকে পার্কে সেদিন কি এক কারণে
কোলে তুলে নিতে চেয়েছিলাম
সেই শিশুটি সেদিন ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল
সেই শিশুটি আমার চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল
শিশুরাও দেখতে পারে না ভেতরের সৌন্দর্য
কাজেই যারা ভেতরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কথা বলেন
তারা ভুল কথা বলেন
তারা মিথ্যা কথা বলেন
ফুলের দিকে তাকাও
বাইরের সৌন্দর্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলেই
ফুল এভাবে ফোটে
অথবা এই যে এতসব ভাস্কর্য দেখছ
শহরে রাস্তায় রাস্তায় আছে দাঁড়িয়ে
তাকে কতভাবে কতকিছু করে সুন্দর করে তোলে ভাস্কর শিল্পী
কত শ্রম দিয়েছেন এখানে তিনি
কত মেধা খরচ করেছেন এখানে তিনি
বাইরের সৌন্দর্যই আসল
এই কারণেই মানুষ হেসে উঠে
যেন এই হাসির কারণে তার মুখ
উজ্জ্বল প্রাণবন্ত হয়ে যায়
মানুষ তাকে ভালবাসে
১৯. ফুলকে বললাম
ও ফুল
কেন বেঁচ আছ তুমি
ফুল বলল
আমি সুন্দর
এই কারণেই বেঁচে আছি আমি

নদীকে বললাম
ও নদী
কেন বেঁচ আছ তুমি
নদী বলল
আমি বহমান
বহে বেড়াবার জন্যই বেঁচে আছি আমি

আকাশকে বললাম
ও আকাশ
কেন বেঁচে আছ তুমি
আকাশ বলল
আমি বিস্তার
এই কারণেই বেঁচে আছি আমি

বাতাসকে বললাম
ও বাতাস
কেন বেঁচে আছ তুমি
বাতাস বলল
আমি উড়ে বেড়াই
এই জন্যই বেঁচে আছি আমি

পাখিকে বললাম
ও পাখি
কেন বেঁচে আছ তুমি
পাখি বলল
আমি গান গাই
এই কারণেই বেঁচে আছি আমি

মানুষকে বললাম
ও মানুষ
কেন বেঁচে আছ তুমি
মানুষ বলল
আমি বেঁচে থাকতে চাই না
একঘেয়েমি জীবন আমার ভাল লাগে না

২০. যখন তোমার কথা কেউ শুনছে না
তখন তুমি তোমার কথা শুনতে পার
যখন কেউ তোমাকে বিশ্বাস করছে না
তখন তুমি তোমাকে বিশ্বাস কর
যখন কেউ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে না
তখন তুমি তোমার জন্য অপেক্ষা কর
যখন কেউ তোমাকে ভালবাসছে না
তখন তুমি তোমাকে ভালবাসতে পার

কেননা দেখ
খাঁচায় রাখা পাখিও তোমার নাম ধরে ডাকে
খাঁচায় পা বেধে রাখা পাখিও
গান গেয়ে ওঠে

২১. এই যে চোখ খুললেই অবারিত প্রকৃতি
সবুজ, হলুদ, লাল
হাজারো রঙের
হাজারো ঘ্রাণের
প্রকৃতি
কখনও চোখ জ্বালাপোড়া করলে
আমাদের চোখ সবুজ খুঁজে চলে
কখনও একা একা মনে হলে
আমাদের পাহাড়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করে
কখনও সমু্দ্রে নামিয়ে দিতে ইচ্ছে করে সমস্ত শরীর

প্রকৃতি তবু প্রকৃতির মতোই
কিন্তু আমাদের ইচ্ছে অনেক রকম
আমাদের অনুভূতি অনেক রকম

কখনও কখনও প্রকৃতিকে মনে হয় অনেক নিরব।
প্রকৃতি কি শব্দ করে কথা বলে?

২২. যখন প্রচণ্ড রোদ
তুমি ঘরে থেকে বের হও ছাতা নিয়ে
রোদ তোমার গা ছুঁতে পারে না

যখন প্রচণ্ড বৃষ্টি
তুমি ঘর থেকে বের হও ছাতা নিয়ে
বৃষ্টি তোমার গা ছুঁতে পারে না

যখন প্রচণ্ড কান্না পায় তোমার
তখনও তুমি ছাতা খোঁজ
কিন্তু কান্না আটকানোর ছাতা নেই তোমার।

২৩. আমাদের শেকড় প্রয়োজন। আমরা যেখানে জন্মেছি, যেখানে ভাষা শিখেছি, সেই শেকড়। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যেখানে ছিলেন, আমার মা যেখানে, আমার বাবা যেখানে থাকেন, সেই জায়গার প্রতি আমাদের অবশ্যই বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

আমাদের ডানাও প্রয়োজন। ডানা আমাদের স্বপ্নকে প্রসারিত করে। আমাদের ভালবাসার জগতে নিয়ে যায়। ভালবাসার জগত তৈরি করতে সহায়তা করে। ডানা ছাড়া মানুষের সভ্যতা এত দূর এগোত না।

এই শেকড় ও ডানা এক সাথে কখনই কোনও মানুষের থাকে না। থাকা সম্ভব না। যাদের থাকে তারা মহাপুরুষ।

২৪. নিবিড় কোনও বনের ভেতর হাঁটলে আমরা অনেক গাছ দেখতে পাই, সেই গাছগুলোর থাকে অনেক পাতা। বনের উদ্দেশ্য হল গাছ রাখা আর গাছেরও একটা উদ্দেশ্য থাকে পাতা রাখার। আর তা হল খাবার আহরণ। যেসব পাতা গাছের আর খাবার আহরণ করিয়ে দিতে পারে না তারা ঝড়ে পড়ে। এভাবে সব পাতাই এক সময় বুড়ো হয়, এবং খাবার যোগার করতে পারে না গাছের জন্য আর তখন তা ঝড়ে পড়ে।

শহরগুলো অনেক খোলামেলা থাকে। যেন সেখানে সহসাই আলো আসতে পারে। শহরের উদ্দেশ্য হল গাছ না রাখা।

তবু কেউ কেউ শহরে গাছ লাগিয়ে থাকে।

২৫. একদিন একটি গরু কোথাও পথ খুঁজে না পেয়ে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। গরুটি সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে, কিছু গাছের পাতা, লতা খেয়ে খেয়ে তার নিজের ঘরে চলে এল।

সেই পথ দিয়েই একদিন একটি কুকুর আসল।

আরেকদিন মানুষ এই পথ দিয়ে খড়-কুটো নিয়ে যাওয়া শুরু করল।

কয়েকদিন পর থেকে শ্রমিকেরাও এই ফতে হাঁটতে শুরু করল। এটি হয়ে উঠল একটি সরু পথ।

অনেক অনেক দিন পর এই বন শহরে পরিণত হল। আর এই পথটি হয়ে উঠল প্রধান সড়ক।

২৬. আমি টানা সাতদিন পাহাড়ে কাটালাম
এই সময়টাকে বলা হয় পাহাড়ি সময়
তাহলে সময় কি
আমি যখন যেভাবে থাকি
কাজ করি
ভাবি
তা দিয়েই তৈরি হয় সময়
যখন প্রায়ই বৃষ্টি হয়
তখন তাকে বলা হয়
বৃষ্টির সময়

যখন ঝড় হয়
তখন বলা হয়
ঝড়ের সময়

যখন ছোটবেলায়
বিকাল হতেই খেলতে চলে যেতাম
এই সময়টাকে বলা হত খেলার সময়

যখন প্রচুর ফল উঠে বাজারে
সেই সময়কে বলা হয়
ফল-ফলান্তির সময়

যখন তোমার হাত ধরে হাঁটছি
তখন তোমার এই হাত ধরে হেঁটে যাওয়ার সময়টাকে বলা যায়
হেঁটে বেড়ানোর সময়

একবার আমি দীর্ঘ এক মাস
ঘরের ভেতর ব্যাঙের মত শীত নিদ্রায় ছিলাম
এই সময়টা নিশ্চয়ই আমার সময়

২৭. বৃদ্ধাটি ঘর থেকে বের হয় না
বৃদ্ধা সারারাত ঘরে বসে কাঁশে
বৃদ্ধা ডাক্তারের কাছে যান না
বৃদ্ধা গাছ, লতা-পাতার ওষুধ খান
বৃদ্ধার কাছে কেউ জান না
বৃদ্ধা একা একা খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েন
বৃদ্ধার সাথে কেউ কথা বলেন না
বৃদ্ধা সারাক্ষণ নিজে নিজে কথা বলে ঘুমিয়ে পড়েন
বৃদ্ধা দিনের বেলা ঘর থেকে বের হন না
কেননা বৃদ্ধা মনে করেন
দিনের বেলায় ঘর থেকে বের হলে
তাকে তার শরীরের ছায়া দেখতে হবে
আর সেই ছায়ারূপী শয়তান
তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে বলবে।
২৮. আমরা যখন ইতিহাস পড়ি
বা আমরা যখন ইতিহাস লিখি
তখন আমরা কেবল মানুষের ইতিহাস পড়ি
পড়ি কে ছিল রাজা
তার কতজন রানী ছিল
পড়ি কে ছিল জমিদার
সে কি কি করত

লিখি আমাদেরকে সরকার কিভাবে দমিয়ে রাখে
আর আমরা কিভাবে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে চাই

কিন্তু আমরা কেউ পড়ি না
বা আমরা কেউ লিখি না
সেইসব মানুষের সাথে
এইসব মানুষের সাথে
প্রকৃতি কিভাবে ছিল

তখন কি বৃষ্টি ছিল
না ঝড়
আমাদের এই সব পড়া হয় না
কারণ এই সব লেখা হয় না

আমাদের এইসব লেখা হয় না
কারণ মানুষের ইতিহাসের সাথে প্রকৃতির ইতিহাস কিভাবে জড়িত
তা আমরা বুঝতে পারি না

এইভাবে কেবল মানুষের ইতিহাস লেখা হয়
এইভাবে কেবল মানুষের ইতিহাস লেখা হয়
আড়ালে পড়ে থাকে প্রকৃতির ইতিহাস

২৯. আমরা দিনে কতবার যে সিগারেট খাই
কতবার সিগারেট খেয়ে ধুয়া উড়াই
আর ভাবি
আমার কথা
তোমার কথা
আমাদের ছেলে-মেয়েদের কথা
কখনও কখনও সিগারেট খেতে খেতে তোমাকে ফোন করি
খোঁজ খবর নেই তোমার
খেয়েছ কিনা
এখন কি করছ

প্রতি মাসে
প্রতি বছরে
এইভাবে কতবার যে সিগারেট খাই
কিন্তু ঠিক কোন সিগারেট আমি সুখ ভরে টেনেছি
কিন্তু ঠিক কোন সময়ের সিগারেট আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিয়েছে
এই কথা ভাবছি আজ

মনে হচ্ছে
হয়ত বা এই মনে হওয়াই ঠিক
আমি যখন কিছু একটা লিখি
মানে কবিতা বা গল্প
বা উপন্যাস বা উপন্যাসের কোনোও একটা প্লট
আমার ধারনা
আমি এইসব লেখার সময় যেসব সিগারেট খাই
সেই সিগারেটগুলোই আমি সুখ ভরে টেনেছি
সেই সিগারেটগুলোই আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্ত করেছে

হয়ত কারণ এই
আমি কোনোকিছু লেখার সময়ে যখন সিগারেট পোড়াই
তখন শুধু সিগারেট নয়
নিজেকেও পোড়াই

কেননা আমার খেয়াল আছে
সেই সময়ে সিগারেট আমি বেশ জোরে জোরে টানি
সেই সময়ে আমি অনেক বেশি বেশি সিগারেট খাই।

৩০. বাঁশের সাঁকো দিয়ে আমি একদম চলতে পারি না
বাঁশের সাঁকো দিয়ে কোথাও পার হতে গেলেই
আমার শরীর কাঁপতে থাকে
এমনভাবে শরীর কাঁপতে থাকে
যেন মনে হয় এখনই পড়ে যাব আমি
এখনই পড়ে যাব আমি
পড়ে যাব সময়ের পঁচা-ডোবা নালায়।

শুধু বাঁশের সাঁকোতে নয়
বড় কোনও সেতুর সামনে গেলেও
আমার পা কাঁপতে থাকে
মনে হয় এই সেতুর উপরে উঠলেই
মনে হয় এই সেতুর মাঝামাঝিতে পৌঁছলেই
এটি ভেঙে পড়বে
আর আমি পড়ে যাব
সভ্যতার নষ্ট সময়ের গর্তে
সেখানে আমি মরে পড়ে থাকব

কত লোক এই সাঁকো দিয়ে যায়
কত বড় বড় ট্রাক, গাড়ি
এই সাঁকোর ওপর দিয়ে যায়
এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত
ও প্রান্ত থেকে এ প্রান্ত

শুধু আমারই মনে হয়
এই বুঝি ভেঙে গেল সাঁকো
এই বুঝি পড়ে গেলাম আমি

কেন যে মনে হয় এমন আমার
কেন যে ভয় হয় এমন আমার
আমাদের সেতুটি ভেঙে পড়েছিল বলেই কি
আমাদের সাঁকোটি আর গড়া হয় নি বলেই কি
আমি আর তুমি দীর্ঘকাল আলাদা হয়ে আছি বলেই কি
ভয়ে আমার হাত কাঁপে
কাঁপে পা
আর মনে হয়
এই বুঝি গেলাম পড়ে
আমাদের দীর্ঘ হতাশার পঁচা-নর্দমায়
আমাদের দীর্ঘ বিচ্ছেদের প্রেম আর মায়ায়

৩১. যা কিছু শিকার করে
তাই রাঙা হয়ে ওঠে
যেমন মাছরাঙা
কেমন সুন্দর আদ্ভুত একটা ভালবাসার চেহারা নিয়ে
সারাদিন বসে থাকে নদীঘাটে
সুযোগ পেলেই নদীতে ডুব দিয়ে ধরে নেয় মাছ
তারপর উড়াল
একা একা বসে বসে খায়
খাওয়া শেষ হলে আবারও সে এসে বসে নদীরঘাটে

তোমার নামও রাঙা
তুমিও মাছরাঙার মত সুন্দর
তুমি কি শিকার করবে আমাকে?

৩২. তোমার পাশে যে চাঁদ বসে আছে
তুমি কি ভাবছ
এটা সেই একই চাঁদ

ছোটবেলায় যে চাঁদ ছিল তোমার পাশে
সে চাঁদকে তুমি বলতে চাঁদমামা
তুমি যখন সেই চাঁদমামার কথা ভাবতে
তোমার মামা চলে আসত তখন তোমাদের বাসায়

এখন যখন তুমি তরুণ
পাশে বসা থাকা সেই চাঁদটিই
এখন তোমার প্রেমিকার মত দেখাচ্ছে
যেন চন্দ্রমুখী হাত ধরে বসে আছে তোমার

যখন তোমার অনেক বয়স হবে
তখন এই চাঁদকেই মনে হবে তোমার বুড়ি।

৩৩. এই যে অজস্র পাথর
থরে থরে সাজানো এক একটি পাথর
ছোট
বড়
মাঝারি
রকমের পাথর
কতদিন ধরে
কত অজস্র বছর ধরে
পৃথিবীর পিঠের ওপর
শুয়ে আছে
বসে আছে
ঘুমিয়ে আছে
অথচ কোনও সাড়া নেই
অথচ কোনও শব্দ নেই

এক একটি পাথর
নিজের মত করে
একা একা
পৃথিবীর ওপর
এত এত সময়
এত এত বছর
সাড়া-শব্দহীনভাবে
কিভাবে কাটায় সে

এই জন্যেই কি সে পাথর?
এই জন্যেই কি মানুষ শোকে পাথর হয়ে যায়?

৩৪. মাঝে মাঝে ঘুম হয় না আমার
মাঝে মাঝে এত ঘুম হয় যে
পুরোরাতটাকে একবারও মনে করতে পারি না

মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি না
মাঝে মাঝে না
ইদানিং স্বপ্নই দেখি না
আবার হঠাত আমি স্বপ্ন দেখি
বেশ ভাল একটা স্বপ্ন
সেই স্বপ্ন মনে থাকে অনেকদিন

তবে সচরাচর যেসব জায়গায় ঘুমাই
সেসব জায়গায় আমার ঘুম যেমন আসে না
তেমনি স্বপ্ন দেখার প্রশ্নই উঠে না

আবার যেসব জায়গায় শুয়ে থাকলে
আমার ভাল ঘুম হয়
সে সব জায়গায় আমার স্বপ্নও বেশ ভাল দেখা হয়

ভাল জায়গার সাথে ভাল স্বপ্নের একটা সম্পর্ক আছে বোধহয়।

৩৫. কিছু কিছু ঘাস থাকে অনেক সবুজ আর সুন্দর
সেখানে নীল নীল ছোট ছোট ফুল ফোটে
ফুলগুলো এত ছোট
অথবা ছোট বলেই অনেক সুন্দর
আর ছোট বলেই
কেমন মায়া মায়া মুখ

কিছু কিছু ঘাস
শুষ্ক মরা রং নিয়ে বেঁচে থাকে
এই ঘাসগুলো চোখেই পড়ে না আমাদের

আর কিছু ঘাস ইট বা পাথরের চাপায় হলুদ হয়ে যায়
এই বুঝি মরে গেল তারা

আর কিছু ঘাস আমরা কেউ কেউ মাড়িয়ে যাই
পেছনে তাকালে বোঝা যায়
মারিয়ে যাওয়া ঘাসগুলো কত কষ্ট করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

৩৬. আমি জানি
তোমার মুখ তুমি অনেকবার করে ধোয়
সাবান দিয়ে পরিস্কার কর
ফেসিয়াল লাগাও
যেন তোমার এই মুখ দেখে
লোকজন হেসে ওঠে
ভাললাগে মানুষের
মানুষ তোমার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে
কথা বলতে চায়
এটা তোমার ভাললাগে
তাই তুমি তোমার মুখ
অনেক পরিস্কার করে রাখ

কিন্তু তোমার যখন খুব খারাপ লাগে
যখন তোমার ব্যর্থতার কথাগুলো মনে পড়ে
তখন তোমার মুখ কালো হয়ে যায়

তুমি কি তোমার এই কালো মুখ সাবান দিয়ে পরিস্কার করতে পার?

৩৭. আমি যখন বড়শি ফেলে মাছ ধরি
আমার ছেলে আমার পাশে বসে থাকে
ছেলের চোখ তখন কেমন জ্বল জ্বল করে
এই বুঝি ধরা পড়বে একটি মাছ
আর সেই মাছ লাফিয়ে উঠবে
সেই মাছের সাথে সাথে লাফিয়ে উঠবে আমার ছেলেও

আমি যখন পুকুরে মাছ ধরি
বড়শিতে মাছ যখন লাফাতে থাকে
তখন মাছটির বাচ্চারা
জলের নিচ থেকে দেখে
তাদের মা হারানোর দৃশ্য।

৩৮. আমি প্রতিবার যখন নিজের বাড়ি থেকে নগরের দিকে আসি
বাসে চড়ে
বাসে ওঠার পর
বাস যখন চলা শুরু করে
তখন একটি গাছ পেছনে ফেলে চলে বাস
একটি গাছের ডাল পেছনে ফেলে চলে বাস
একটি গ্রাম পেছনে ফেলে চলে বাস
একটি শহর পেছনে ফেলে চলে বাস

এইভাবে পেছনে ফেলে ফেলে বাসটি যখন নগরে চলে আসে
তখন আমার মা-বাবার কথা মনে পড়ে
আমার পুরো শরীর কান্নায় ভেঙে পড়ে
মনে পড়ে বাসটি আমার মা-বাবাকেও পেছনে ফেলে চলে এসেছে

তখন আবার আমি বাসে চড়ে নিজের বাড়িতে চলে আসি।

৩৯. যখন বড় বড় ঢেউ নিয়ে সমুদ্র তোমাকে ডাকছে
যখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছ সমুদ্র কত বিশাল
যখন তুমি তোমার প্রেমিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছ
আর ভাবছ দু’জনে মিলে আজ যদি ডুবে যাওয়া যেত সমুদ্রে
যখন এক পা দু পা করে তুমি সমুদ্রের কাছা কাছি যাচ্ছ
আর ছুঁয়ে দেখছ
বিশাল এই সমুদ্রটি আসলেই কেমন
তখন
প্রকাণ্ড সূর্যটাও ডুবে যাচ্ছিল সমুদ্রে
৪০. সেদিন আমার বন্ধু বলল-
আমাকে অমুক জায়গায় সে দেখেছে
অথচ সেদিন আমি যাই নি সেখানে
তারপর সে বলল
তাহলে হয়ত তোমার মত জামা পড়া কাউকে দেখেছি।

রাতে বাসায় এসে জামাগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম-
আমার জামা ক্রমশ আমি হয়ে উঠছে।

তারপর আমি আমার সমস্ত জামা আগুনে পুড়িয়ে ফেললাম।
আর এরপর থেকে প্রতিদিন একটি করে নতুন জামা পড়া শুরু করলাম।
এবং পুরুনো জামাগুলো পুড়িয়ে ফেললাম।

যাতে কেউ আমার জামা পড়ে আমাকে চুরি করে নিয়ে না যায়।

৪১. শহরের গাছগুলো বড় হয় না
বা বড় হতে দেওয়া হয় না
ডাল ছেটে ফেলা হয়
কখনও বেশি বড় মনে হলে কেটে ফেলা হয়
শহরে বড় গাছ থাকে না
রাস্তার দুই পাশ সাজিয়ে রাখার জন্য গাছ লাগানো হয়
এই গাছগুলো খুব বেশি বড় হয় না
বাসা-বাড়িতে টবে গাছ লাগানো হয়
এইগাছগুলোও ছোট ছোট গাছ
শুধুমাত্র কিছু পার্কে বড় বড় গাছ থাকে।
সেখানে গাছের ছায়ার নিচে মানুষ বসতে পারে।

শহরে তাই তেমন বড় গাছ নেই বলে
গাছের নিচে তেমন ছায়াও থাকে না।

তাই শহরের মানুষের কাছে গাছ মায়ের মতন নয়।

৪২. বাগানে হরেক রকম ফুল
নানা রঙের
নানা আকৃতির
অসংখ্য ফুল
বাতাসে হেলেদুলে হাসে
প্রজাপতিরা এই ফুল থেকে অন্য ফুলে
এই পাতা থেকে অন্য পাতায়
এই শাখা থেকে অন্য শাখায় উড়ে উড়ে বেড়ায়
তারাও নানা রঙের
নানা আকৃতির
মাঝে মাঝে মনে হয়
ফুলগুলোই প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ায়
উড়তে উড়তে যখন ওরা আমার হাতে বসে
উড়তে উড়তে একটি প্রজাপতি যখন আমার হাতে স্থির হয়ে বসে থাকে
তখন নিজেকে আমার ফুল মনে হয়
৪৩. বাগানি যখন চলে যায়
তখন একটি পাতা আরেকটি পাতার সাথে কানাকানি শুরু করে
একটি ফুল আরেকটি ফুলের সাথে কানাকানি শুরু করে
শো শো শব্দ শুরু হয়ে যায় চারপাশে
একটি গাছ হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় অন্য প্রান্তে
একটি পাতা হাসতে হাসতে চলে যায় গাছের সাথে
একটি ফুল দুলতে দুলতে চলে যায় গাছের সাথে

বাগানি যখন চলে যায়
তখন গাছগুলো সারা বাগান জুড়ে হাঁটে, দৌঁড়ায়

কেবল গাছগুলো দৌঁড়িয়ে বাগানের বাইরে যেতে পারে না।

৪৪. রাস্তার ধারে যেমন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে
বিদ্যুতের খুঁটিও দাঁড়িয়ে থাকে তেমন
এক একটি বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে চলে যায় বিদ্যুতের তার
সেই তার দিয়ে আমাদের ঘরে চলে আসে বিদ্যুত

সেই বিদ্যুতে আমাদের ঘর আলোকিত হয়
লাল-নীল-সবুজ
কত রঙের আলো জ্বেলে উঠে আমাদের ঘরে

রাতে আমাদের ঘর আলোকিত করে রাখে বিদ্যুতের তার
সেই তারে মরে মরে ঝুলে থাকে শত শত বাদুর।

৪৫. এই যে এত মানুষ
দিনের বেলা কেউ হাসছে
কেউ কথা বলছে
কেউ দৌঁড়াচ্ছে
কেউ কাঁদছে
কেউ হাঁটছে
কেউ কাজ করছে
কেউ অকাজ করছে
কেউ মুখোশ পড়ছে
কেউ পড়ছে না
কেউ না কেউ
কোনও না কোনও মানুষ
কিছু না কিছু করছে

আর রাতের বেলায়
এই মানুষগুলোই
নিশ্চুপ হয়ে যায়
ঘুমিয়ে পড়ে

আর যখন ঘুমিয়ে পড়ে
তখন সবাইকে একা মনে হয়
পাশাপাশি শুয়ে থেকেও নিজেরা নিজেদের ঘুমের জগতে থাকে
আলাদা আলাদা থাকে

মনে হয়
এই একা একা
নিশ্চুপ
ঘুমিয়ে পড়ার জন্যই
মানুষ দিনের বেলায়
এতশত কাজ করে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s