Home

images

১.

বনলতা,

আমার প্রেমিকা,

আমি তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না তখন।

তুমি হয়ত অনেক কিছুই ভেবে বসে আছ।

এত কিছু কেন ভাবছ জানি না।

তোমার নাক দিয়ে পানি পড়ছিল বলেই

তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না তখন।

২.

তুমি আর আমি যখন ছাদে বসেছিলাম

শুনছিলাম রবীন্দ্রনাথ

আকাশের চন্দ্রপায়ূ দিয়ে তখন

ঝড়ে পড়ছিল জ্যোৎস্না

৩.

এইখানে আকাশ এসে

মিশে গেছে বস্তিতে।

এইখানে একজন পাগলি

উলঙ্গ ছাই-কালো শরীরে

রোদ মাখাচ্ছিল।

৪.

একদিন আমেরিকার সেনা ছাউনিতে জেগে ওঠবে চাঁদ

একদিন সেই চাঁদ থেকে জ্যোৎস্নার মত ঝড়ে পড়বে মার্কিন অপ্সরী

একদিন আমার মত ছেলেকবিকে ধর্ষণ করে চলে যাবে নারী

৫.

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের গায়ে আঘাত এলে আমরা ক্ষেপে ওঠি,

কারণ আমরা তা হতে চেয়েছিলাম।

কখনও হয়তবা হতেও পারি,

তাই চাই না এই পেশায় কারও আঘাত।

বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকের ওপর আঘাত এলে আমরা মেনে নেই,

কখনও বা হেসেও দেই।

কারণ আমরা তা হতে চাই না।

এই পেশা নিয়ে আমাদের কোনও চিন্তা নেই।

৬.

আমরা আমাদের নিজেদের গু নিজে পরিষ্কার করতে পারি।

কিন্তু একজন মেথরের সাথে বসে

ভাত খেতে পারি না।

মেথরের সাথে বসে ভাত খেতে ঘেন্না লাগে আমাদের।

মেথরের মুখের দিকে তাকালে

কেবল আমাদের নিজেদের গুয়ের কথাই মনে হয়।

৭.

গায়ের রং সাদা

তাই মেয়ে

তোমার এত দেমাগ

ইউরোপের লোকেরা কিন্তু

তোমায় দেখলে বলবে

ওই কালা যা

ভাগ ভাগ

৮.

কবিতা লিখতে গেলে কি কি জানি করতে হয়

কি কি জানি ভাবতে হয়

আকাশ থেকে নামিয়ে আনতে হয় চাঁদ

আর সমস্ত রাত নাকি গোসল করাতে হয় পুকুরে

আমার এই সব চিত্রকল্পে মন ভরে না

কেবলই বিরক্তিকর মনে হয়

বিরক্তিটা আরও বেড়েছে সেদিন থেকে

যেদিন তোমার শরীর চাঁদ ভেবে চাটতে শুরু করেছিলাম

মধু নয়

মুখের ভিতরে টের পেয়েছিলাম সেদিন

কেবলই তোমার দুর্গন্ধের ঘাম

৯.

আজ একটি দৃশ্য আমাকে সারাদিন ভাবাচ্ছে

আজ একটি দৃশ্য আমাকে সারাদিন চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে

এই দৃশ্যটি হয়ত কোনও ফটোগ্রাফার তুলে ধরলে

আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেতেন

হয়ত কোনও কবি এই দৃশ্যটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতেন

এত সুন্দর আর নমনীয়তায়

যে কবিতা পাঠক মাত্রই কেঁদে ফেলতেন

আমার এর কিছুই ভালো লাগছে না

দেখলাম একজন মধ্য বয়সী নারী

শাক-সব্জির মালের উপর বসে এক হাতে এই সব্জির মালগুলো ধরে আছে

আরেক হাতে আকাশমুখী ধরে আছে তার শিশু সন্তানকে

একহাতে তার বর্তমান

আরেক হাতে তার ভবিষ্যত

এই দৃশ্যকে

এই দৃশ্যটিকে ঠিক কোন রং

ঠিক কোন প্রলেপ দিলে আরও সুন্দর হত আমি জানি না

সে সব ভাবতেও পারছি না

কেবল চলন্ত রিক্সায় এক হাতে সব্জির মাল আর

আরেক হাতে শিশু সন্তানকে ধরে যেভাবে শক্তমুখে যাচ্ছিলেন

সেই মুখ

সেই শক্তমুখ

আমার বার বার মনে হচ্ছে

কোনও শব্দ বা দৃশ্য সৌন্দর্যের মত কিছুই আর মনে আসছে না আমার

কেবল মনে হচ্ছে এই নারী হয়ত একা নিজে নিজে সংগ্রাম করে

বেঁচে আছে

ওর স্বামী হয়ত নেই

হয়ত ওর স্বামী কাজ করে না।

এইসব কথা মনে হচ্ছে শুধু।

১০.

এইভাবে এত কিছু কেন বলছ আমায়

এত অলংকার

উপমা

এসব দিয়ে কি করব আমি

তুমি কেন রাজপুত্রের আলাপ কর আমার সঙ্গে

টিভিতে একজন মডেলকে যে শার্ট পড়তে দেখেছ

সেই শার্ট কেন পড়তে বল আমায়

সেই ভাবে কেন হাসতে বল

কথা বলতে বল

তুমি তো জান

আমি দরিদ্র ঘরের সন্তান

আমার নায়িকা হল ঘরের দেবী

ঘর থেকে বেরুবার সময় একবার তাকে প্রণাম করে বেরুব

ঘরে ফেরার পর আরেকবার তাকে প্রণাম করব

এইভাবে তোমাদের কোনও অলংকার

এইভাবে তোমাদের কোনও উপমা

একদিন বুঝবে

আমার সাথে এর কিছুই যায় না

কষ্টটা তোমার বেড়ে যাবে খুব তখন

এরচেয়ে বরং জান আমি দরিদ্র ঘরের সন্তান

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী

এখানে প্রেমিকা যে অলংকার দিয়ে গান গায়

সেই অলংকারে খাটি কষ্ট থাকে

কোনও ভান থাকে না

এইখানে প্রেমিকা যে উপমা দিয়ে গান করে

সেই উপমায় নিখুত ব্যথা থাকে

কোনও আড় থাকে না

যে ব্যথা

যে কষ্ট থাকে

পিছিয়ে পড়া মানুষ ছাড়া তা কেউ বুঝতে পারে না

এইভাবে এত কিছু বল না আমায়

এত অলংকার

এত উপমা

গরীবেরা এত বেশি অলংকার পড়ে না

অথবা গরীবের কোনও অলংকারই থাকে না

গরীবের শরীরটাই কেবল তার অলংকার

১১.

এইখানে

আমার হাতে হাত রাখ,

দেখ

তুলতুলে নয়।

ভেবেছিলে হয়ত নরম

তা কিন্তু নয়।

ভেবেছিলে সারাদিন কলমে লিখে

কম্পিউটারে কী বোর্ড চাপে

সেই হাত কি আর শক্ত হবে?

ব্যথায় ফোলা

খসখসে হাত হবে?

হবে,

হয়।

এই হাতও

ব্যথায় ফুলে যায়।

খসখসে,

অমসৃণ,

শক্ত হাত হয়।

এই হাতও

তোমার হাতে রাখবার নয়।

এই হাত ধরে পার্কের পর পার্ক হাঁটতে পারবে না তুমি।

এই হাত তোমার মুখ ছুঁয়ে বলতে পারবে না

তুমি সুন্দর।

কেবল যদি কখনও একা হয়ে যাও,

যদি কখনও তোমায়

বাস থেকে হঠাত পড়ে যেতে দেখি-

ভয় নেই,

জেনো কেবল তখনই এই হাত দেখতে পাবে

তোমার পাশে।

তখন বুঝবে

এই শক্ত হাত তোমাকে ভালবাসতে পারে না

কেবল বাঁচাতে পারে।

১২.

যে শিশুটি রেললাইনের ধারে বসে

ড্রাগ নিচ্ছে

তাকে তুমি কোন উপমা দেবে কবি

কোন উপমায় বলবে

এ দেবশিশু

শিশুস্বর্গ দেখলাম আজ

পারবে না

কোনও উপমা নেই তোমার কাছে জানি

এই কালো কুচকুচে

অজস্র বছরের ময়লা জমা শরীরের

এই শিশুকে কোনও ভাবেই

উপমিত করতে পারবে না তুমি

কিম্বা তুমি হয়ত বলতে পার

একটি শিশু ডুবে গেল অন্ধকারে

কিন্তু তোমার পবিত্র শুচিবায়ুগ্রস্ত মন

ছুঁতে পারবে না তাকে

শুধুই ঘেণ্ণা লাগবে

আর এড়িয়ে যাবে তুমি

কখনই জানতে পারবে না

এত কম বয়সেই

শিশুটি কেন ড্রাগ নেয়

কেন সে চুরি করে

পাগলের মত হন্যে হয়ে

ঘোড়াঘুড়ি করে

কেন সে বাবা বলে ডেকে ওঠার মত

চোখ তুলে তাকায় না

যে শিশুটি রেললাইনের ধারে বসে

ড্রাগ নিচ্ছে

তার জন্য কোনও উপমা নেই

তার জন্য আছে শুধু শহরের সমস্ত গালি

একটু খেয়াল করলে

তুমিও শিশুটির মুখে থেকেই

শুনতে পারবে তা

১৩.

বিরহ ভাল লাগে না আর

তুমি ফিরে যাওয়ার কথা বলে

বারবার আসতে পার না আমার কাছে

কবিরা এক একটি বৃক্ষের মতন দাঁড়িয়ে থাকার কথা ভেবে

আপ্লুত হতে পারে

পেতে পারে নি:সঙ্গতার ভেতরে আনন্দ

বলতে পারে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষেরও

পরাগায়ন হয়

আমি পারি না

এরকম শখ আর আহ্লাদ আমার নেই

এরকম পুতুপুতু আবেগ আর আমার ভাল লাগে না

বরং দেখ

তোমার ক্লাসের সবচেয়ে অনুজ্জ্বল ছেলেই আজ সুখে আছে

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী বউ আজ তার ঘরে

সেরকম অনুজ্জ্বল হও

নিভে যাও

কোনও দৃশ্য কল্পনা নয়

সত্যিকারের দৃশ্য হও

কল্পনা চিরকালই কল্পনা

সেখানে সত্য নেই

সত্য থাকতে পারে না

চিত্রকল্প চিরকালই চিত্রকল্প

সেখানে সত্য নেই

সত্য থাকতে পারে না

ওটা মিথ্যার জগত

কবিতা মিথ্যার জগত নয়

রক্তের মত কবিতায় ফিনকি দিয়ে ওঠবে সত্য

রক্তের মত ফিনকি দিয়ে ওঠবে বিরহ তোমার

এইভাবে ভাব

এরকম বিরহ ভাল

১৪.

খুব ভোরে রাস্তায় হাঁটলেই দেখা যায়

মাটিকাটা মানুষদের।

মাটিকাটা মানুষেরা খুব ভোরে ওঠেই চলে যান মাটি কাটতে।

মাটিকেটে যা পান

তা দিয়ে আজকের দিনের খাবার যোগান।

একদিন মাটিকাটা নেই

তো একদিন খাবারও নেই।

মাটিকাটা আর নিজেদের খাবার

একে অপরের কাছে এত বেশি নির্ভরশীল যে,

মাটিকাটা মানুষের চেহারা মাটির মত।

চোখগুলো কেমন স্যাঁতস্যাঁতে,

ভেজা।

চামড়াগুলো বালুর চরের মত

ছুঁলেই যেন ঝুড়ঝুড় করে ভেঙে পড়বে।

মাটিকাটা মানুষেরা মাটির মত।

অথবা মাটির মত মাটিকাটা মানুষেরা।

জানি না মাটিকাটা মানুষদের মাটি উপমা দেওয়া ঠিক হল কিনা।

মানুষ তো মানুষই।

মানুষ কি আর মাটির মত হয়?

তবে মাটিকাটা মানুষেরা অন্যরকম মানুষ।

যে মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে সমস্ত জগত-সংসার,

সেই মাটি যারা কেটে বেড়ান,

সেই মাটি কাটাই যাদের পেশা;

তাদের আমার অন্যরকম মানুষই মনে হয়।

অনকগুলো মানুষ একসাথে বের হন মাটি কাটতে।

নারী-পুরুষ মিলে সারাদিন ধরে তারা মাটি কাটেন।

একদিন তাদের আর দেখা মিলে না।

কোথাও যেন হারিয়ে যায় তারা।

আমি মাটিকাটা হচ্ছে এরকম একটি জায়গায় ভেবেছিলাম

আজ কেউ মাটি কাটছে না তারা।

পরে গিয়ে দেখি গর্ত করে মাটি কাটতে কাটতে

নিচে চলে গেছেন তারা।

সমতল থেকে দেখা যাচ্ছিল না তাদের।

আরেকদিন গিয়ে অবশ্য দেখেছি

সত্যি সত্যি কেউ নেই তারা।

এরপর একদিন

দুইদিন

অনেকদিন তাদের দেখি না।

মানে হারিয়ে গেছে কোথাও,

অথবা দেবে গেছে।

মাটিকাটা মানুষেরা কি মাটি কাটতে কাটতে মাটির নিচে দেবে যায়?

১৫.

গাছকাটা মানুষেরা নাকি গাছের মত?

গাছের ডালে বসে থাকে,

শুয়ে থাকে,

কেউ কেউ নাকি গাছের ডালে বানিয়ে রাখে ঘর।

গাছের সাথে মিশে যায় ওরা।

গাছকাটা মানুষেরা আসলে নাকি মানুষ না,

গাছকাটা মানুষেরা নাকি এক একটি গাছ?

আমি তো দেখি,

গাছকাটা মানুষেরা দিব্যি এক এক মানুষ।

গাছ কাটে,

বিক্রি করে,

খায়-দায়-ঘুমায়।

কেউ কেউ খুবই চরা দরে বিক্রি করে এক একটি গাছ।

এরা অনেক ধনী লোক হয়।

কেউ কেউ অনেক রাতে চুরি করে গাছ কাটে।

কেউ কেউ বনের ভিতরে গাছ কাটতে গিয়ে

মারা পড়ে পুলিশের গুলিতে।

গাছকাটা মানুষেরা নাকি গাছের মত?

চুপচাপ বসে থাকে ঝোপঝাড়ে,

ফিসফিস করে কথা বলে,

আস্তে-ধীরে হাওয়া ছাড়ে নাকের।

আমি তো দেখি গাছকাটা মানুষেরা

ধপাস ধপাস শব্দ করে

ডাল ফেলে গাছের।

চুলের মত প্রথমে ছাটাই করে নেয় ডালপালা।

তারপর গুড়িটা কেটে দেয় গাছের।

কখনও কখনও কেমন ভয় লাগে,

যে গাছে চরে আছে গাছকাটা মানুষ,

সেই গাছই কেটে ফেলছে সে ঠাণ্ডা মাথায়

ধীরে ধীরে

একটু পরে।

তারপরও অনেকে বলেন,

গাছকাটা মানুষ নাকি আসলে গাছ।

মৃত্যুর পর ওরা নাকি গাছ হয়ে জন্মায়।

কেউ কেউ নাকি দেখেওছেন,

দু’ হাত ওপরে ডালের মত সাজিয়ে

দু’ পা মাটির নিচে পুতে রেখে

কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন গাছ।

১৬.

আমরা ধর্ষণ ধর্ষণ বলে চিতকার করতে পারি

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কাঁপিয়ে দিতে পারি রাজপথ,

কিন্তু সেক্স ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করতে পারি না।

কারণ সেক্স ইন্ডাস্ট্রির নায়িকারা অনেক সেক্সি থাকে

এটা ছাড়া চোখ পূর্ণতা পায় না।

বাংলাদেশে দারিদ্র্যতাও এক ধরণের বাণিজ্য বলে

বিপ্লবে ঝাপিয়ে পড়তে পারি,

কিন্তু বিপ্লবও বাণিজ্য

এটা মেনে নিতে পারি না।

বস্তির ঘর-বাড়ি

ছেড়া ময়লা কাপড় পড়া

অভুক্ত মানুষের ছবি রঙিন টিভিতে বেশ রঙিন দেখায়

কষ্ট খুঁজে পাই না।

পৃথিবীর রাজারা আসবে বলে রাস্তার দু’ধারে

ফুলের গাছ লাগিয়ে রাখি

যেন এই দারিদ্রতা তোমার চোখে না বিধে।

আমরা কত কিছু পারি না,

কতকিছু হয় না আমাদের।

তোমাদের সব হয় বলে

আমাদের ঘরের মেয়েরা এখন

গভীর রাতে মোবাইলে কথা বলে চলে যায়।

সকালে পুলিশ এসে ঘর থেকে বের করে বাবার লাশ।

তোমাদের সব হয় বলে

গভীর রাতে তোমাদের কেউ এসে ডেকে নিয়ে যায়

আমাদের ঘরের ছেলেকে।

সে আর বাড়ি ফেরে না।

আমরা কিছুই পারি না,

রাতে উঠোনে বসে

আকাশের তারা খসে পড়া দেখা ছাড়া।

কেননা এই তারারা এখানকার পিতৃপুরুষ।

আমাদের ব্যর্থতাকে আর দেখতে চান না বলে

তারা হয়েও জ্বলতে চান না নাকি পিতৃপুরুষেরা।

১৭.

কই

কেউ তো আসল না

কেউ তো বলল না

খেয়েছেন?

বলবে না

কেউ বলবে না

বলার কথাও না আসলে।

বলার কথা কি?

এইভাবে অপেক্ষা করো না আর।

এই অপেক্ষার এখন আর অর্থ নেই কোনও।

এই অপেক্ষাকে এখন লোকজন পাগলামি বলে।

মোবাইল আছে

ইন্টারনেট আছে

সেখানে কথা বলে নাও।

ঠিক কখন এসে কে পৌছবে

তারপর এসে রোবটের মত কথা বলে চলে যাবে কেউ।

রোবটের মত?

না রোবটের মত কেউ কি হয়?

বল যে মানুষ তার বেচে থাকার ধরণ পাল্টিয়েছে।

পাল্টিয়েছে ভালবাসা-প্রেম সবকিছু।

কেউ বিদ্যুতের মত এসে

চলে যাবে বিদ্যুতের মত।

বিদ্যুত নয় ঠিক।

মানে একটা উদাহরণ দিলাম।

কাজেই বসে থেকো না।

এইভাবে বসে থাকা ঠিক না

কারও অপেক্ষায়।

এখন আর কেউ বসে থাকে না।

এসব দেখলে লোকজন পাগল বলবে।

এসব দেখলে লোকজন বলবে ফালতু সব মানুষে আজকাল ভরে গেছে।

দেখো না

মেয়েরা আজকাল মেঘের জলে স্নান করে না।

বলে না

ও মেঘ আসো

ভাসিয়ে নিয়ে যাও আমায়।

সে সরাসরি পাম্পে চলে যায়

স্নান সেরে ফিরে আসে একাকী।

তুমি তার মত হও।

অপেক্ষার মত রোমান্টিকতা নিয়ে ভাবছ আর যাই হোক

কবিতা লেখা যায়।

সেও ভুল

পাগলের প্রলাপ ছাড়া

ওসব আজকাল আর কিছু না।

১৮.

এভাবে নয় সেভাবে,

সেভাবে নয় ওভাবে,

ওভাবে নয় ওইভাবে,

করতে করতে

কেমন জানি হয়ে গেল চকমকি জীবন।

কত কত রঙ দেখালে,

বললে এই রঙে ভেসে ওঠে আকাশ।

কত শত স্বপ্ন দেখালে,

বললে এই স্বপ্নে ভেসে ওঠে আশা।

আমি হাত পেতে দিলাম,

শরীর পেতে দিলাম,

শরীর ভাসতে ভাসতে

এ নদী থেকে ও নদীতে,

এ সমুদ্র থেকে ও সমুদ্রে,

যেতে যেতে কত কিছুই তো দেখল।

কি দেখল,

কি দেখে ক্ষেপে গেল,

কি দেখে হেসে ওঠল,

ব্যথায় কুকড়ে গেল সমস্ত জীবন।

আহা

কি ব্যথা চারদিকে

ব্যথায় ব্যথাময় পুরোটা নাকি আকাশ।

ব্যথাও বিক্রি হয়

আকাশে-বাতাসে।

বিক্রি হয়ে হয়ে

কোথায় যেন যায়।

মানুষেরা সেসব ব্যথাও নাকি কিনে,

কিনে কিনে

নিয়ে যায় ঘরে

আর আড়ালে আবডালে সেসব নিয়ে নাকি

নিজেরাও কান্নাকাটি করে।

আহা হাস্যকর ব্যথা আমাদের,

ব্যথাও হাস্যকর হয়।

সারাদিন কেটে যায় চাকরিতে,

সারারাত কেটে যায় চাকরিতে,

ঘরে এসে শুনতে পাও

তোমার বউ নেই ঘরে।

সারাদিন কেটে যায় একা একা ঘরে,

সারারাত কেটে যায় একা একা ঘরে,

একদিন জানতে পার

তোমার স্বামী নাকি চলে গেছে

হাওয়া হয়ে ওড়ে।

এই সব ব্যথা নাকি ছাইপাস,

হরদম বিক্রি হয় আজ।

আর তুমি আড়ালে-আবডালে কাঁদো,

কেঁদে কেঁদে কার কথা ভাব।

ঘাসফুল আঁক নাকি ছেলের ড্রয়িং খাতায়?

ঘাসফুল কেন আঁক,

তোমাকে আঁকাও।

এভাবে নয় ওভাবে

সেভাবে নয় ওভাবে

ওভাবে নয় ওইভাবে

আঁকতে আঁকতে হেরে যাও।

হেরে যাও না ঠিক

কেউ তোমাকে ঠকায়।

খেলা শেষে মাঠে থাকে কেবল মাঠ আর পরাজিতরা

আর সব চলে যায় বিজিতের সাথে।

তুমি বরং মাঠ হও

মাঠ তো হওয়া যায় না,

মাঠের মত হও

মাঠের মতও হওয়া যায় না

তোমার মত হও।

চল আমরা আমাদের মত হই

কোন রঙে আর ভাসব না বিজ্ঞাপনের কথায়।

একা একা চলে যাব

একা একা থেকে যাব।

আহা

একা একা থাকাতেও কেমন সুখ সুখ থাকে।

কেমন নাকি কষ্ট কষ্ট সুখ।

এইসব বাদ দিই

এই সব বাদ দিয়ে চল যাই অন্য কোথাও,

আরেকটি দল চাই পরাজিতের।

১৯.

রাতে ফোটা যে কোনও ফুলই সাদা রঙের হয়

এর সাথে কি সম্পর্ক আমাদের সমাজ জীবনের

এই বাক্যের সাথে আমার আর তোমার কোন বিষয়গুলো মেলে

এর মানে কি এই যে

রাতের বেলাতেই প্রেমিকা আমার

খুঁজে পাব তোমাকে

এইসব

হয়ত একটু মজা লাগে শুনতে

মনে হয়

কি যেন বলে গেল

কি যেন জানিয়ে গেল গোপনে

কিন্তু কিছু কি জানাল

কিছু কি জানানো যায় এভাবে

হয়ত কিছুটা সময় বিভোর থাকা যায় স্বপ্নে

হয়ত কিছুটা সময় আরাম পাওয়া যায়

তারপর হারিয়ে যায়

হারিয়ে হারিয়ে নাই হয়ে যায়

হাওয়া এসে যদিও জানিয়ে যায় সুঘ্রাণ

রাতে ফোটা ফুলেদের ঘ্রাণও নাকি তীব্র হয়

হয়

সেটা হয় তাদের প্রয়োজনে

আমাদের কি হয়

বা এই শব্দে-বাক্যে ইঙ্গিত আছে কি কিছু

এইভাবে ইঙ্গিত হয়

এইভাবে ইঙ্গিতে কি বলা থাকে

হয়ত বলা থাকে কিছু

আমরা তা জানি না

এরকম অনেকেই জানে না কিছু

হারিয়ে যায় মানে

মানে হারানো শব্দেরা ঠিক কতদিন বাঁচে

মানে হারানো বাক্যেরা আদৌ কি বাঁচে

এর চেয়ে বরং দেখি

অন্ধকারে বাঁদুরেরা পেয়ারা খেয়ে যায়

সকালে পেয়ারা গাছের নিচে পড়ে থাকে পেয়ারা বিচি

রাতে বাঁদুরগুলো তাড়াতে পারলে

সকালেই খাওয়া যেত পাকা পেয়ারা

এসব বলা নিষেধ আছে

বারবার কানে এসে বলে যায় হাওয়ারা

হাওয়ারা তো বলে না

হাওয়াদের কথা হয় না কোনও

হাওয়া এসে কানে বাজতেই

মনে এল এমন কথা

২০.

আমার তো আবেগী মন

আবেগে কাঁপে শরীর

থরথর

যে কোন সময়ই কেঁদে ফেলি

তাই পকেটে টিস্যু ভরে রাখি

কখন যে কান্না চলে আসে কে জানে

আমার গাড়ির গুতো খেয়ে

কেউ যদি মরে যায়

এই ভয়ে কেঁদে ফেলি হঠাত

শ্রমিক শ্রমিক বলে

কতবার কেঁদেছি

এখানে সেখানে

দু:খজনক যে

শ্রমিকরা আজও আমাকে চিনলই না

বুদ্ধিজীবীরা ছাড়া কেউ জানলই না

আমিও শ্রমিকের পক্ষে

ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠি

ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে

কখনো শরীর

আমার তো আবেগী মন

যে কোন সময়ই কেঁদে ফেলি

তাই পকেটে টিস্যু ভরে রাখি

যদি দেখি ধর্ষিতার লাশ হঠাত

অথবা পত্রিকায় কোনও খবর

চোখের জল পারি না আটকে রাখতে

কিন্তু কোনও তরুণী জানলই না

আমিই সেই পুরুষ

যে একা একা কেঁদে চলি

তাদের জন্য

একা একা একা হয়ে যাই

তরুণীদের কথা ভেবে

প্রচণ্ড আবেগে ঘুম আসে না চোখে

কেউ তবু জানলই না

কেউ তবু জানেই না

শহরে শহরে কত পুরুষ ভরে গেছে

আমারই মতন

কত পুরুষ

কত শত পুরুষ

আবেগে হয়ে যায় জড়সড়

শ্রমিক শ্রমিক বলে

তরুনী তরুনী বলে

নাম জপ করে আর কাঁদে

আর পকেটে টিস্যু নিয়ে ঘুরে

কখনও যদি কান্না চলে আসে

রাস্তায়,

বাড়িতে।

পত্রিকা পড়তে পড়তে

গল্প করতে করতে

টিভি দেখতে দেখতে

যদি কোনও শ্রমিক মৃত্যুর কথা শোনা যায়

যদি কোনও ধর্ষিতার লাশের কথা জানা যায়

হু হু করে ওঠে সেই সব পুরুষের হৃদয়

কিন্তু কোনও শ্রমিক জানে না তাদের নাম

কিন্তু কোনও তরুণী জানে না তাদের নাম

জানবে কি করে

তারা নাকি শ্রমিকের কাছে জান না কখনও

তারা নাকি ধর্ষতাদের বাড়িতে জান না কখনও

শুধু যদি শ্রমিক মরে গেছে শোনা যায়

শুধু যদি ধর্ষতা মরে গেছে জানা যায়

তাহলে সেই সব পুরুষের কান্নায়

কেঁপে ওঠে সমস্ত শহর

রেডিও টিভি ইন্টারনেট

কান্নায় ভেসে যায়

তাদের চোখের জলে

২১.

তুমিই নাকি সব

তোমাতেই নাকি পরিভ্রমণ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের

তোমাকে না পেয়ে

হাজার হাজার ছেলেরা

মরে ইঁদুরে বিষ খেয়ে

তুমি কত কী যে করে গেলে

কত কী যে দেখালে

চুলে বেয়ে নামল তোমার

রজনীগন্ধার ঘ্রাণ

ছেলেদের যায় নাকি প্রাণ

তুমিই তো পার তাহলে কত কী যে

শত শত রাজপুত্রদের নিয়ে

দেশ থেকে দেশান্তরে

পার তুমি ছুটতে

এক এক দেশে জিরিয়ে নেবে তুমি

আর এক একটি দেশ হয়ে ওঠবে তোমার

তুমিই পার

কারণ

তোমার পেছনেই ছুটেছে হাজার ছেলে

না পেয়ে মরে যাচ্ছে ইঁদুরের বিষ খেয়ে

তোমাকে ছাড়া

পুরো পৃথিবীটা নাকি অন্ধকার তার

আর সে নাকি একা

ভীষণ একা

ভুলে গেছে মাকে তার

ভুলে গেছে

বাবা তার আজও বসে থাকে খাবার নিয়ে

এই সব ছেলেরা

কতকিছু করতে রাজি

শুধু নাকি তোমার জন্য

তাকে তুমি বুকে নাও

তার হাতে হাত

রাখবে নাকি তুমি

ও মেয়ে তাকে তুমি

আদর দেবে নাকি

নাকি খেলা খেলা ভেবে

চলে যাবে দূরে

নাকি খেলা খেলা খেলবে

দিন-রাত-মাস-বছর

এইসব ছেলেরা

সবকিছু ছেড়েছুড়ে নাকি তোমার কাছেই আসে

বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে

সে পথ থেমে গেলে নামে

রাস্তায়

পকেটে পকেটে নাকি তখন অনেক টাকা ওড়ে

হৃদয়ের ছিনতাই করতে গিয়ে নেমে যায় টাকা ছিনতাইয়ে

আরও নাকি কত কিছু করে

শেষমেষ তোমাকে না পেয়ে

নিজেকেই খেয়ে ফেলে

নিজেকে তো খেতে পারে না

কাউকে দিয়ে খাওয়ায়

অন্য কোনও নেশায় দিয়ে দেয় তাকে

ভুলে যায়

মা তার আজও বসে আছে টেবিলে খাবার নিয়ে

ভুলে যায় বাবা তার কান পেতে বসে আছে

বকাঝকা করে

কই ছেলে তো আসে না

ছেলে তো আসে না

এইসব ছেলে

তোমাকে ছাড়া নাকি ওরা মরে যায়

ইঁদুরের বিষ খেয়ে

রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে

সারারাত রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়

তোমাকে না পেয়ে

তাহলে তো তুমিই তো সব

তুমিই তো পার তবে কত কিছু করতে

এইসব রাজপুত্রদের তো কতজনই চায়

কতভাবে চায়

ভিনদেশ থেকে লোক আসে

নিয়ে যায় প্লেনে করে

তার হাতে রাখবে না হাত

তাকে তুমি দেবে না তোমার হৃদয়

তুমিই তো সব

তুমই নাকি সব

২২.

এত কেন রহস্য করো

কি জানি বলে কেন

শ্বাস ফেল দীর্ঘ দীর্ঘ

এই দীর্ঘ শ্বাসে আশা এসে মিশে নাকি

ভেবেছ কেউ এসে নিয়ে যাবে তোমায়

এই শহরে তুমি আছ কত দিন হলো

কেউ কি নেই এমন কেউ

এখনও কি নেই

সত্য এই-ই

কোনও দিন কারও কেউ হয় নি এ শহরে

ভেবো ধীরে ধীরে

যে রাস্তায় হাঁট তুমি

একা একা প্রায়ই

যে রাস্তার দোকানগুলো খুব চেনা তোমার

আজ তারা চিনল না তোমায়

মাঝ রাস্তায় শুয়ে আছো এই ভেবে

মাঝ রাস্তায় শুয়ে কেউ ভাবে না তো

আজ মরেছিলে প্রায়

কত জনকে ডেকেছ

কত জনকে বলেছ

বিপদে পড়েছ তুমি

কেউ এসে নিয়ে যাক

কেউ তো আসে নি

আসবে না তো কেউ

এ শহর এমনই

এমন ছিল আগেও

বাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে গেছে তোমায়

এত রাতে একা একা মাঝ রাস্তায়

ব্যথায় মরে যাচ্ছ

চিতকার করছ

কেউ তো আসছে না আর

কেউ তো আসবে না আর

এই শহরে এত রাতে তুমি একা

আগেও একা ছিলে

চিরকালই ছিলে একা

বুঝনি কখনও

এ শহরে যে আসে সে এরকমই ভাবে

ভাবে এত এত মানুষ

চারপাশ কত রঙিন-ঝলমল

তারপর ঢুকে যায় একটি ম্যানহোলে

দেখে মনে হয় এইতো আছি বেশ

কোনও দিন বুঝতে পারে

এই যেমন আজকে বুঝলে তুমি

অনেক কিছুই তোমার হয়ে গেছে শেষ

বুঝ নি কি আজ

বুঝছ তো ঠিক

কে এনে দিয়ে গেল তোমাকে বাসায়

এইই সেই লোক অফিস তাড়ার ভেতর

যার সাথে কখনই কথা হয় না তোমার

যাকে তুমি কতবার কতশত বার

কম টাকায় ঠকিয়ে গিয়েছ অবলীলায়

এই সেই রিক্সা ওয়ালা

মনে কি পড়ছে তোমার ঠিক

কাল ঠিকই ভুলে যাবে তুমি তাকে

ম্যানহোলে ঢুকে যাবে নিশ্চিত

২৩.

একটি ঘরের ভেতর কত কিছু থাকে

একটি ঘরের ভেতর কতকিছু লাগে

দক্ষিণ পাশে লাগে খোলা জানালা

আর বিশাল বড় দরজা লাগে তাতে

সেই দরজাতে থাকা দরকার অনেক দামী কাঠ

জানালায় থাকে লাগা নকশা করা রেলিং

ঘরের ভেতর থাকতে হয় আরও কত ঘর

এক ঘরে করতে হয় রান্না

আরেক ঘরে থাকতে হয় মেহমানখানা

এক ঘরে রাখতে হয় ঘুম

আরেক ঘরে করতে হয় গোসলখানা

তারপর এক ঘর থেকে যেতে হয় আরেক ঘরে

যখন যা দরকার করে নিতে হয় যেয়ে

ঝড়-বৃষ্টি এলে ঘরের ভেতর থাকতে হয় আমাদের

ঘরের ভেতর এক অপরকে জড়িয়ে থাকি

ঝড় আসে

বৃষ্টি আসে

ধাক্কা দিয়ে চলে যায় ওরা

আমাদের পায় না খুঁজে

তাই আমাদের মত করে ঘর বানিয়ে রাখি

আমাদের মত করে সাজিয়ে রাখি ঘর

ড্রয়িং ঘর বানাই

সেখানে লাগিয়ে রাখি বাহারি গাছ

বাহারি গাছে গাছে ভরে ওঠে টব

সেখানে ফুল ফোটে

ঘরে ফোটে ফুল

তাই সুভাস ছড়ায়

আর আমরা নাচি-গাই

ঘরের ভেতরের গাছে ফুটেছে ফুল

যেন আমরাই ফুটে ওঠলাম সহসাই

কখনও সুগন্ধি কিনে আনি

ঘরের কোণে কোণে ছড়িয়ে রাখি তা

সুগন্ধে সুগন্ধে ভরে ওঠে ঘর

আমাদের নতুন বাসর

আমি আর আমার বউ শুয়ে থাকি ঘরে

চুপচাপ চেয়ে দেখে ঘর

চোখ বন্ধ করে

সারাদিন সারারাত ঘরের বাইরে যা পাই

একসময় ঘরে তা নিয়ে এসে জমাই

একসময় টাকা-পয়সাও রাখা হত ঘরে

চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায়

ব্যাংকেই রাখে এখন সবাই

এইভাবে জমাতে জমাতে

এইভাবে দিন যেতে যেতে

আমাদের ঘরে কতকিছু আসে

খাঁচায় খাঁচায় ভরে পাখিও নিয়ে আসি

পাখিরা মরে যায় খাঁচার ভেতরে

কারণ ওটা নাকি ঘর নয়

ওদের ঘর নয়

আমাদের বানানো ঘর

আমরাও তো ঘরে থাকি

এমনই খাঁচার পাখি

খাঁচার মত ঘরের কারণে আমারও কি মরে যাই

কে বানিয়েছে তবে আমাদের ঘর

আমাদের ঘর তবে আমাদের নয়?

২৪.

মানুষ কেন ফুল পাশে রেখে ছবি তোলে

মানুষ কি ফুল হতে চায়

নাকি থাকতে চায় ফুলের মত

নাকি ফুলের মত হেসে হেসে

মরে যেতে চায় দ্রুত

ফুল কখনও নাকি কাঁদে না

জন্ম থেকেই যে হাসি নিয়ে জেগে ওঠে

মৃত্যুর সময় শুধু খানিকটা ম্লান হয়

বয়সে ম্লান হয়

আর কিছু নয়

মানুষও কি এরকম কিছু চায়

তাই ফুল পাশে রেখে ছবি তোলে

তাহলে ফুল কেন কিনে নিয়ে আসে

তুলে দেয় প্রেমিকার হাতে

তারপর একটি একটি করে পাপড়ি তার ঝড়ে যায়

প্রেমিকার হৃদয়ে

প্রেমিকা কি খুশি হয় ম্লান ফুল দেখে

খুশিই তো হয়

খুশি হয় বলেই ফুল দেখে জড়িয়ে ধরে তার প্রেমিককে

এমন তো হওয়ার কথা নয়

এমন তো হওয়া উচিতও নয়

মনে হয় বোঝে না সে

মনে হয় জানে না সে

ছেঁড়া ফুলের হাসি

ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে

মানুষ তো ফুলের দোকানও দেয়

জন্মদিন-বিয়ে-শ্রদ্ধায়

সে সব মরা ফুল কিনে নিয়ে যায়

মরা ফুল দিয়ে আসে শিশুর হাতে

মরা ফুল দিয়ে আসে বিবাহিতের কাছে

মরা ফুল দিয়ে আসে শ্রদ্ধায়

মৃত মানুষকে

এমন মরা মরা ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া

ফুলগুলো কেন দেয় তাদের হাতে

হয় তারা বুঝে না

হয় তারা জানে না

ছেঁড়া ফুলের হাসি ক্রমশ: ম্লান হয়ে আসে

এই অভিশাপে

মানুষের হাসিও কি মরে যেতে থাকে

মানুষের হাসি কেমন কষ্ট কষ্ট

মরা মরা ইদানিং

মানুষ যেন ভুলে গেছে কাকে বলে হাসিমুখ

হাসলেও মনে হয় কষ্ট করে হাসে

হাসলেও মনে হয় আসলে হাসতে চায়নি সে

না হাসলেই নয় তাই হাসে মাঝে মাঝে

মানুষ তবুও ফুলের কাছে যায়

গাছে ফোটা হাসিমাখা ফুলের সাথে ছবি তোলে

মানুষ হয়ত ফুলের কাছে যায়

নিজের হাসি মরে গেছে বলে

২৫.

স্কুলগুলো যেন মায়ের মতোন

মায়ের মতন কি আসলে যেন মা

এখনও দাঁড়িয়ে ডাকে

এখনও নিতে চায় কুলে

আর যেন বলে

তুই কিন্তু বড় হলি না

সেই কবে ছেড়েছি স্কুল

স্কুলটা যেন আজও তেমনি আছে

সকাল সকাল ঘুম ভাঙলেই

চলে যেতাম তার কাছে

কত কিছু শেখাত

কত কী যে বলত

কত কী যে খেলতাম

দৌঁড়ে দৌঁড়ে পালাতাম

স্কুল ঠিক স্নেহ নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকত

এখনও দাঁড়িয়ে আছে

মনে হয় বারবার ডাকে

আর ফিসফিস করে বলে

কেন আমি এখন আর আসি না তার কাছে

কতদিন হয়ে গেল

যাই না তো স্কুলে

স্কুল তবু ভুলে নাই

স্কুল কি কখনও ভুলে

আমরা ভুলে যাই

স্কুল ঠিকই তার মত

সবকিছু মনে রাখে

আসলেই তো পার হলো কতশত দিন

কখনও কি ভেবেছি স্কুলের কথা

স্কুল কি আছে কি না আগের মতন

আজ ঠিক কেন যেন

স্কুলের সামনে বসে

চোখে জল চলে এল

জল কেন চলে এলো চোখে

আমি তো হয়েছি বড়

আমি কি হইনি বড়

বড় হলে কেউ কি কাঁদে

তবু যে কান্না আসে

কি জানি কি ভেবে

স্কুল কি ঠিক বুঝতে পারে আমার কথা

স্কুল তো মায়ের মতোন

মায়ের মতন কি আসলে যেন মা

ঠিক ঠিক বুঝে আমাদের কথা

এখনও দাঁড়িয়ে আছে

মনে হয় বারবার ডাকে

আর ফিসফিস করে বলে

তুই তো ঠিক রয়ে গেছিস আগেরই মতোন

আমার যে কান্না আসে

কীসব বলে ফেলি শেষে

আর তাই চুপচাপ বসে থাকি পাশে

স্কুলের আঁচল ধরে

হেঁটে হেঁটে হেঁটে

কই যেন যাই আমি

এখনও কোথায় যাই

স্কুলের দিকে নয়

যেন মায়ের দিকেই তাকাই

অনেক অনেক দিন পর

মা যেন হেসে ওঠলেন সহসাই

২৬. আমার বিপ্লবী বন্ধু দুইজন
আরও বিপ্লবী বন্ধু আছে
তবে ঘনিষ্ঠ এই দুই
একজন ছেলে আর আরেকজন মেয়ে
একজন এখন ব্যাংকার আর আরেকজন এখন এড ফার্মে
একজন থাকেন টাকার পাহাড়ে আরেকজন তা দিয়ে বানান বিজ্ঞাপন
এখন তাই শহরের দেয়ালে দেয়ালে হাজার হাজার চার রঙা বিজ্ঞাপন

বিপ্লবের রঙিন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে যায় ঢাকা শহর
আমাদের ভেতর কেমন কেঁপে ওঠে
এই বুঝি এল ভাই সত্যিকারের দেশ
এই বুঝি এল ভাই সত্যিকারের স্বদেশ

ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠে হেসে ওঠে ঢাকা
আমাদের হৃদয় তো বিপ্লবেই আঁকা
কেমন রঙিন করে হেসে ওঠেন মার্কস
হেসে ওঠেন আরও কতজন
আমাদের রাষ্ট্র হাসে কেবল কাঁদে মানুষের মন

কই এল না তো কিছু আসে না তো কিছু
এত কেন দেরি ভাই বিপ্লবের
রঙিন কান্না দেখে ভিখারিও হাসে
ভাবে বুঝি আহারে
বড় বড় লোকেরা কাঁদতেও পারে না
তাই বুঝি চোখ দিয়ে জলের বদলে ঝড়ে
চোখের জলের বদলে কতশত রঙ

এমনই তো বিপ্লব এমন কি বিপ্লব
মানুষের কেন হুঁশ আসে না
মানুষ কেন এত বেশি বেঁহুশ
মানুষের কি কোনওদিন ঘুম ভাঙবে না

আসবে না মিছিলে, বলবে না তাদের কথা
খেতে পায় না দু’বেলা
খেতে তো চায় দু’ বেলা
এই কথা কেউ কি বলবে না

বলে না কেন কথা, আসে না কেন মিছিলে
কতশত রঙিন পোস্টার
নজরে কি পড়ে না তাদের
নজরে ঠিকই পড়ে
নজরে ঠিকই পড়ে
আমাদের থেকে হয়ত বেশিই জানে
আসে না হয় না তাই তাদের মিছিলে
ভাবে বুঝি এসব বড়লোকের কাম-কাজ
কি করব আমরা এসে
আমাদের কথা ওরা ঢং করে বলে বলুক
আমরা ঘুমাতে চাই দুবেলা ভাত যদি
আমাদের পেটে ঢুকে।

আমার বন্ধু আর কত টাকা খোয়াবে বল
আমার বান্ধবী আর কত বিজ্ঞাপন দেবে
কেউ যদি না চায় নিজেদের মিছিলে আসতে
তাকে কি জোর করে নিয়ে আসা যাবে?

২৭. এখনও আমি বড়লোকদের ঘরে ঢুকতে ভয় পাই
বড়লোকদের ঘরের সামনে থাকে বিশাল গেইট
সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মুছওয়ালা বিশালদেহী দাঁড়োয়ান
তাকে জিজ্ঞেস করতে হয়
অমুক সাহেব কি আছেন বাসায়
দাঁড়োয়ান মুখ বের করে কেমন মুচকি হাসে
গেইটের বাইরে আমি দাঁড়িয়ে আছি টের পেয়ে
ঘেউ ঘেউ করে ওঠে কুকুর
আড়ালে তাকিয়ে দেখি বিশাল পুকুর
বড়লোকদের বড় বাড়ির এক পাশে থাকে বড় পুকুর
সেখানে তারা নাকি মাছ ধরে
সেই মাছ নিজে ধরে খায়
কখনও ছেড়ে দেয়
এই পুকুরে কাউকে তারা নামতে দেন না

আর কুকুরগুলোও হয় বিশালদেহী
তাদের খাওয়ানোর জন্য অনেক খরচা আছে তাদের
সেগুলো বিদেশি কুকুর
বিদেশি কুকুর কামড়ালে কি মানুষ মরে
কেমন হাসি আসে আমার
আবার ভয়ও লাগে
বড়লোকদের বাড়িতে ঢুকতে কত কিছু করতে হয়
কত বাধা পেরুতে হয়

আর বিশাল বাড়িটাও নাকি একা একা থাকে
এত বড় বাড়িতে কত মানুষ থাকতে পারত
এত মানুষ কি আসলে থাকে
তিন-চারজন নাকি থাকে

আমার তো ভয় তবু যায় না আর
আমার তো কেমন খালি খালি লাগে
ধরফর করে বুক আর হাঁপিয়ে ওঠি
অমুক সাহেব যে আসবেন কখন
অমুক সাহেবকে বলা হবে যে কখন
কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে
আমার তো ভয় লাগে
কিছু বলে যদি

যদি বলে তুমি কে চিনলাম না তো
তখন কি করব আমি ভাবি নাই আগে
আশা করি বলবে না তাই বসে আছি চুপচাপ
ভয় তবু যায় না চোখ কেমন টলমল
বড় লোকের বাড়ি থাকে কেমন ঝলমল
বড় বড় ছবি থাকে ড্রয়িং রুমে
অনেক দামে কেনা বোধহয় সেইসব ছবি
কত কিছু থাকে সেইসব ছবিতে
কত কিছু থাকে আমাদেরই মত মানুষ
ময়লা জামা-কাপড়
সেই সব ছবি বড় লোকেরা টানিয়ে রাখে
আমার তো হাসি পায় আর কোনও ছবি নাই
এত বড় বড় গরীব মানুষের ছবি তারা কেন টানিয়ে রাখে

২৮. যুগে যুগে প্রেমই নাকি ভেঙেছে হৃদয়
আর কিছু নয়
তাই নাকি চুপ করে থাকে ইতিহাস
প্রেম নিয়ে যদি কেউ করে পরিহাস

এও কি ঠিক এও কি মেনে নিতে হবে আমায়
সারারাত ঘরের পাশে কে এত পাখা ঝাপটায়
কোন পাখা ঝাপটায় কেন সে ঝাপটায়
নাকি কারও প্রেম এসে আমাকে বুঝাতে চায়
কি বুঝাতে চায় সে এমন কি কিছু
প্রেম নয় হৃদয় ভাঙে আরও নাকি কিছু

নাকি অন্য কিছু যা আমরা জানি না কিন্তু মনে হয় প্রেম
প্রেমের রূপ নিয়ে বিষিয়ে যায় হাজারও হৃদয়
এও তো হয় হতেও তো পারে
আসলেই কি পারে
এমন কিছু হিংসা কি রূপ নিতে পারে প্রেমে
কিছু রাগ কি রূপ নিতে পারে প্রেমে
পারে হয়ত পারতেও তো পারে
কিন্তু সেটা তো প্রেম
যাই বলি না কেন প্রেম রূপে যা আসে একবার
যা এসে গান করে ওঠে
সে কি পারে ভাঙতে হৃদয় কারও

আর শুধু ভাঙ্গা নয় প্রেমের কাজই এই
হৃদয়ে শিকরে গেড়ে হৃদয় ভেঙে ফেলা
এও যদি বল এও যদি কেউ বলে
সেখানও ইতিহাস হাসতে থাকে হেলে
কেন সে হাসে কি সে বলতে চায়
সেই কথা কি সেই এক কথা
যুগে যুগে প্রেমই নাকি ভেঙেছে হৃদয়
আর কিছু নয়

তাহলে এত কিছু কেন এত যুগ যুগ ধরে
কার নাম ধরে কে পাগল হয়ে ঘুরে
প্রেমই তো নাকি প্রেমই তো সে চায়
পাই নি বলে আজ নিজেকে রাখে অবহেলায়
প্রেম কি কেউ পায় নি জোড়া লাগেনি কি হৃদয়
নাকি জোড়া লেগেও হতে থাকে হৃদয়ের ক্ষয়
কে কাকে দুষে বল প্রেম নাকি অন্য কিছু
নাকি তুমি দর্শন রয়েছ পিছু পিছু
এ কোন দর্শন কার দর্শন হেসে ওঠে শেষে
আমিও তো এসেছি এতদূর আসলাম প্রেমগাঙে ভেসে
আমার কি ভেঙেছে ভেঙেছে হৃদয় আমার কি ভাঙবে ভাঙবে হৃদয়
হয়ত ভাঙবে ভাঙবেই বোধহয় যে যাই বলি এটাই নাকি পরিণাম যাবতীয় ক্ষয়

এই ক্ষয় বয়ে যাব যেতেই তো হবে
ইতিহাসের এত কথা কে খণ্ডাবে
এই যে অযুত কথা কাহিনী আর গান
এই যে প্রেম প্রেম মান অভিমান
গড়েছে গড়ছে সব হৃদয়ের ক্ষয়
এভাবেই ভাঙে ভেঙে যায়
হৃদয় ভাঙলেই নাকি হয় হৃদয়ের জয়

২৯. তুমি মুক্ত তুমি স্বাধীন
এটা গণতান্ত্রিক দেশ
গণতন্ত্রের চর্চাই স্বাধীনতার চর্চা
তবে তুমি কখনোই গাড়ি চালানোর সময় ডান দিকে যেও না
তবে তুমি কখনোই হাঁটতে হাঁটতে হঠাত ডান দিকের রাস্তায় চলে যেও না
রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে তোমাকে প্রথম নিয়ম জানতে হবে
হাঁটতে হলে জানা চাই নিয়ম
নিয়মের বাইরে গেলে তুমি নিজেই ডেকে আনবে তোমার বিপদ
কোনও দুর্ঘটনায় হয়ত পড়ে থাকতে হবে তোমাকে

তুমি মুক্ত তুমি স্বাধীন
এটা গণতান্ত্রিক দেশ
তাই বলে রাস্তার ছেলে-মেয়েদের রুটি বানানোর হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে
ভাবতে পারো না কয়েকটি রুটি তো থাকতে পারে দাম ছাড়া
কয়েকটা রুটি তো কেউ আশা করতে পারে বিনামূল্যে
এটা তুমি পারো না
নিউমার্কেটে হাঁটতে হাঁটতে এত এত পছন্দের জিনিস দেখে দেখে আর
দাম করে করে তুমি যখন ক্লান্ত আর ভাবছ কোনও কিছুই কেনা হবে না তোমার
এত টাকা তো নেই তোমার
তোমাকেও কিন্তু একজন দোকানদার বলেছিল
এই পৃথিবীতে কোনও কিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না
তুমি চাইলেও আশা করতে পার না তা

তুমি মুক্ত তুমি স্বাধীন
এটা গণতান্ত্রিক দেশ
গণতন্ত্রের চর্চাই স্বাধীনতার চর্চা
তাই বলে তুমি পুলিশকে ঘুষ খেতে দেখে কিছু বলতে যেও না
ওরা নিয়মের পাহাড়াদার
যারা নিয়মের পাহাড়া দেয়
তাদের কাছে সবই নিয়ম
ঘুষ খাওয়াও নিয়ম
কিন্তু তুমি তো আর নিয়মের পাহাড়াদার নও
তোমার জন্য অনেক নিয়ম করে দেওয়া আছে
তা পালন করো
কারণ পালন করাই তোমার নিয়ম
নিয়মের পাহাড়াদারকে নিয়ম শেখানো নিয়ম নয় তোমার

স্বাধীনতার চর্চা মানে গণতন্ত্রের চর্চা
এই গণতন্ত্রের কিছু নিয়ম থাকে
এই গণতন্ত্রের কিছু পাহাড়াদার থাকে
পাহাড়াদার পাহাড়াদার মিলে অনেক কিছু করে
অনেক কিছুই তারা করতে পারে
কিন্তু তুমি তা পারো না
গণতন্ত্রও একটি তন্ত্র
সেই তন্ত্রেও কিছু তান্ত্রিক থাকে
তুমি তো তান্ত্রিক নও
তাই তোমার তান্ত্রিকের মত আচরণ করতে মানা

৩০. তারা জানে না যে আমি যখন চিন্তা ছুঁড়ে দেই
তখন শুধু চিন্তাই ছুঁড়ে দেই
কোনও বন্দুকের গুলি বা
কোনও ষন্ডা-পান্ডা নিয়ে কারও দিকে এগোই না
বা সবাই আসলে আমাকে বুঝতে পারে না
অথবা বুঝতে পারে বলে চায় মেরে ফেলতে
বা আমাকে আঘাত করতে যেন আমি উবে যাই
চলে যাই চুপ হয়ে যাই কথা বন্ধ করে দেই

কিন্তু তারা কেউই বুঝতে পারে না
আমার কোনও শত্রু নেই
আমি পৃথিবীর কাউকে শত্রু মনে করি না
আমার শত্রু শুধু চিন্তা
সেই চিন্তা বা সেই ভাবনা যা মানুষকে চালায়
মানুষ জানে না বা অনেক মানুষই বুঝতে পারে না
তার পছন্দ-অপছন্দ, ভাল লাগা-মন্দ লাগা
তার হাতে নেই বা তার মনে হচ্ছে এটাই আমার ভালোলাগা
এটাই আমার পছন্দ কিন্তু আসলে তা না
সে একটি চিন্তা বা ভাবনা দ্বারা পরিচালিত
সেই চিন্তাই তার নিয়তি বা সেই চিন্তার চালিত যন্ত্রে তার অবস্থান নির্ধারিত

কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারে না
বা তারা এটা বুঝতে চায় না
বা তাদেরকে এটা বিশ্বাস করানোই কেন যেন সম্ভব না
আমি ক্ষেপে ওঠি একটি চিন্তার বিরুদ্ধে
আমি ক্ষেপে ওঠি একটি দর্শনের বিরুদ্ধে
আমি ক্ষেপে ওঠি কারণ আমার মনে হয় তখন ক্ষেপে ওঠাই উচিত
আমি সেই চিন্তা আর দর্শনের বিরুদ্ধে বলি
কারণ আমার মনে হয় আমার এভাবেই বলা উচিত

কিন্তু তারা মনে করে আমি তাদের মত না
তারা মনে করে সে ক্ষতিকর
তারা মনে করে আমার উদ্দেশ্য খারাপ
তারা মনে করে আমি তাদের ক্ষতি করছি
তাই আমাকে তাদের মেরে ফেলতে হবে
তাই আমাকে তাদের চুপ করিয়ে দিতে হবে
অথচ আমার সেই কথা বলার সাথে কোনও বন্দুকের গুলি থাকে না
সেই কথা বলা সাথে সেই শব্দের সাথে কোনও ষন্ডা-পান্ডা থাকে না
সেখানে কেবল একটি শব্দের বিরুদ্ধে থাকে আরেকটি শব্দ
একটি বাক্যের বিরুদ্ধে থাকে আরেকটি বাক্য
একটি চিন্তার বিরুদ্ধে থাকে আরেকটি চিন্তা
একটি দর্শনের বিরুদ্ধে থাকে আরেকটি দর্শন
আমি তো কাউকে মেরে ফেলতে চাই না
আমি তো কাউকে আঘাত করতে চাই না
আমি তো কারো বিরুদ্ধে ষন্ডা-পান্ডা ভাড়া করি না
আমি কেবল একটু চিন্তা করি
আমি কেবল একটি শব্দ উচ্চারণ করি
আমি কেবল একটি বাক্য উচ্চারণ করি
তবু আমিই তাদের প্রতিপক্ষ
তবু আমিই তাদের শত্রু
তবু আমকেই তাদের মেরে ফেলতে হবে
অথবা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করতে হবে
যাতে আমি থেমে যাই চুপ হয়ে যাই
যাতে আমি আর আমি থাকি না
তাদের মত হয়ে যাই

৩১. এগুলোতো খালি চোখে দেখা
খালি চোখে দেখা কোনও বিষয় এত সুন্দর হয় না
মোহনীয়, মারাত্মক, আহা বলে ওঠার মত কিছু হয় না
এইসব চোখে কত ময়লা জমা থাকে
কত ধূলাবালি এসে জমে থাকে চোখে
এই চোখ দিয়ে কি সুন্দরের ছবি সম্ভব
এই চোখ দিয়ে কি এমন কিছু দেখানো সম্ভব
যা আপনারা চেয়ে থাকেন হরহামেশা
কিছুটা শান্তি কিছুটা নয়ন জুড়ানো এসব আর কি
এসব না হয় বাদ দিলাম
এমন কিছু কি সম্ভব
যা আগে কখনো দেখেন নি এমন কিছু দেখিয়ে চমকিয়ে দেওয়া

কি করে সম্ভব বলো
আসলেই কি সম্ভব?
কত কত ক্যামেরার চোখ এখন ঘুরে ফেরে
আমার চারদিকে প্রতিনিয়ত তাক করা থাকে ক্যামেরা
এই সব ক্যামেরার চোখে যা ভেসে আসে
তার সাথে কার চোখ তুলনা দেবে তুমি
তার সাথে কার দেখা তুলনা দেব আমি

শুধু ক্যামেরা কেন, আরও কত চোখ আছে আশেপাশে আছে
যেন ওত পেতে থাকে হঠাত কোনও সৌন্দর্য্য এসে গেলেও ওঠিয়ে নেবে তাকে
বা হঠাত কোনও ঘটনা বা বিষয়
এই খালি চোখে তা সম্ভব নয়
কতশত টিভি ক্যামেরা আশেপাশে
কতশত পত্রিকা আর কতশত মিডিয়া
তোমার আমার পিছে
তার সাথে এই চোখ এই খালি চোখের কি দেবে তুলনা

এই চোখে আসে না কিছুই
এই চোখ কিছুই দেখে না
চোখ সব নিয়ে গেছে অন্যজনে
চোখ সব চলে গেছে কার অভিমানে
চোখ সব চলে গেছে তোমার ধ্যানে
আহা তুমি
কত কিছু চলে গেল কত কিছু হয়ে গেল অন্যরকম
কতকিছু হয়ে গেল আশ্চর্য্য সুন্দরম

কেবল এই চোখ রয়ে গেল খালি
এই চোখে কেবল ধূলাবালি
এই চোখে হয় না তো দেখা কিছু
চোখ সব চলে গেছে অন্য কারও কাছে
মিছেমিছি দেখ না আর এই চোখে কিছু
মিছেমিছি বলো না আর আমিও তো দেখি
আমার চোখেও তো হেসে ওঠে সূর্য
আমার চোখেও তো দেখেছি হারানো তুর্য
আমিও তো দেখিছি গোধূলি হলে পড়ে
কেউ কেউ নিয়ে যায় আলো চুরি করে

আলো চুরি করা তুমি দেখেছ কি করে
আলো চুরি করা তুমি কেন দেখলে
তোমার এই চোখ আসলে কিছুই দেখেনি
কিছু যদি দেখা যায় এরকম কিছু
তাহলে তো অন্য চোখেরাও দেখতে পেত
তোমার দেখা মিথ্যা তবে
মিছেমিছি কেন দেখতে গেলে সত্য
কেউ তো চুরি করে নাই আলো
কেউ তো চুরি করে না আলো
চোখ বন্ধ করে তবে টিভিটাই দেখো

৩২. দেখতে দেখতে মেয়েটা বড় হয়ে গেল
ও মেয়ে একটু ঢেকে ঢুকে চলিস
দিন কাল যা পড়েছে
মেয়েটা শুনল আর ব্যথায় কুঁকড়ে গেল

মেয়েটা কলেজে ওঠেছে
একদিন কলেজের টিচার বললেন
সবসময় কলেজের ড্রেস পড়েই আসলেই হবে
মাঝে মাঝে অন্য ড্রেসও পড়ে এসো
মেয়েটা শুনল আর ব্যথায় কুঁকড়ে গেল

মেয়েটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকেছে
একদিন বস বললেন
শুধু কাজ করলেই হবে
মাঝে মাঝে হাসতে হবে
সুন্দর করে আসতে হবে শাড়ি পড়ে
তা না হলে অফিস কি আর অফিস থাকে
অফিসেও ভাল লাগা না লাগা থাকে না
মেয়েটা শুনল আর ব্যথায় কুঁকড়ে গেল

তাহলে কাজ করে কি হবে
যদি শরীরই লাগে
যদি শরীরই লাগে সব জায়গায়
নানাভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে
নানাভাবে দরকারি হয়ে ওঠে সবার স্বার্থে
তাহলে এত ভাল রেজাল্ট
পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে কি হবে
খাব মুড়ি ভেজে ভেজে

শরীরই তো লাগে
কাজও করতে হবে আবার হেসে হেসে দেখাতে হবে শরীরও
মেধাও লাগে আবার সেজেগুজে দেখাতে হবে শরীরও
তবে মেধা আর কাজ দিয়ে কি হবে
আহা শরীরই তো সব
তবে মা কেন এত ভুল শাসন করে
বাবা কেন রাতে ঘুমান না ভয়ে
সবই তো এমন এমন করে সাজানো
মুখে মুখে বলবে সবাই কাজ করো ভাই করো কাজ
মেধাটাই আসল
আসলে ওসব সব দেখানো বুলি
আওড়াতে হয় তাই আওড়ায় সবাই
ভেতরে ভেতরে ঠিক জানে
শরীরও তো চাই
আসলে তো মেয়েদের শরীরটাই আসল
আর কিছু নয়
মেয়েদের কি তবে শরীরটাই আসল
আর কিছু নয়
এইসব ভেবে ভেবে কার কাছে যায় মেয়ে
যায় না তো কোথাও
কেমন একা একা লাগে তার
দিন-মাস-বছর যায়
আর কত ক্ষণ
ঘরে সে এখন শুয়ে বসে কাটায়
কি ভাবে মনে মনে
আসলে কি এটাই মেয়েদের জীবন

৩৩. রাস্তার ধারে কিভাবে শুয়ে থাকে মানুষ
রাস্তার ধারে শুয়ে কিভাবে ঘুমিয়ে পড়ে মানুষ
ঘুম কি আসে
আসে না কি ঘুম
ঘুম আসে বলেই তো শুয়ে থাকে এভাবে
কিভাবে শুয়ে থাকে রাস্তার মানুষ
হাজার বছরের ধুলো বালি আর ময়লা জমা একটি কাথা
সে কিভাবে মুড়িয়ে থাকে
এভাবে মুড়িয়ে থাকে
একেবারে মাথা ঢেকে
বাইরে থেকে বোঝা যায়
এমনভাবে সে নিজেকে মুড়িয়ে নেয়
কানটাকেও বন্ধ রাখে
যেন কোনও শব্দও না যায় তার মাথায়
যেন কোনও মশা মাছি নাগাল না পায় তারে
এমনভাবে এমনভাবে শুয়ে শুয়ে থেকে কার কথা মনে করে সে
এমনভাবে শুয়ে আছে
যেন জগতের সবকিছু থেকেই যেন আলাদা সে
অথচ সে শুয়ে আছে রাস্তার ধারে
কত মানুষের চলাফেরা
কতশত শব্দ গাড়ির
তবু কোনও কিছুই যাচ্ছে না তার কানে
এইভাবে শুয়ে আছে
এইভাবেও শুয়ে থাকা যায়
এইভাবেও শুয়ে থেকে আলাদা হয়ে থাকা যায়
সবকিছুর
তাহলে আলাদা হয়ে হয়ে এই শুয়ে থাকা চোখের ভুবনে কে আসে বাজে
কেউ কি আসে না চোখের কোণে তার
রাস্তার মানুষের কি থাকে না কেউ আপন
কেউ তো আছে
কেউ তো থাকে
অবশ্যই কেউ
কে আসে বাজে তার চোখের কোণে
কে এসে নাচে তার চোখের কোণে
কোনও স্বপ্ন কি থাকে
কোনও আশা কি থাকে
রাস্তার মানুষের হারিয়ে যাওয়া মানুষেরও কি কোনও স্বপ্ন থাকে
নাকি অপেক্ষা করে
খুব করে অপেক্ষা করে
মৃত্যু এসে বরং আজ নিয়ে যাক তাকে
যার ঘর থাকে না
সংসার হয়ত বা ছিল আজ আর নেই কিছু
এমন এমন মানুষের চোখে কি স্বপ্ন থাকতে পারে
হয়ত থাকে
মরতে পারছে না বলে কাল ঘুম থেকে ওঠে কিভাবে খাবার পাবে
এইকথা ভাবে
এও তো ভাবনা
এও তো স্বপ্ন
কাল জুটবে খাবার তবে
এইকথা কি তবে চোখ বুজে ভাবে
নাকি অন্যকিছু
এইসব বেঁচে থাকা আর ভাল লাগে না তার
এইসব ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া
মরে যাবার কথাই সে ভাবে নাকি
মৃত্যুই কি তার এখন একমাত্র চাওয়া

৩৪. হঠাত পথে কোনও নারীর সুন্দর হাসি যেভাবে আমাদের মোহিত করে
যেভাবে কখনও কখনও একটি নারীর জন্য মনে হয় পুরো জীবনটাই দিয়ে দেব
যেভাবে কোনও নারীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে অভিমানে নীল হয়ে ওঠে জীবন
যেভাবে কোনও নারীর হাত ধরে ভাবা যায় এই বিশাল সমুদ্রও আজ আমাদের সাথে

সেভাবে কোনও দেশের প্রেমে কি পড়া যায়
সেভাবে কোনও দেশকে হাসতে পারে মোহিত করতে পারে আমাদের
সেভাবে কোনও দেশকে না পেয়ে কি অভিমানে নীল হয়ে ওঠে জীবন
সেভাবে দেশের হাত ধরে কি ভাবা যায় এই বিশাল সমুদ্রও আজ সাথে রয়েছে আমাদের

ভাবা কি যায়
এই ভুখা নাঙ্গার দেশে
এই দারিদ্র হতাশ যুবক নেশা আর বেকারত্বের দেশে
এই হত্যা,গুম,ধর্ষনের দেশে

এই দেশ কি হাসতে পারে প্রেমিকার মতো
যা দেখে মনে হয় না জীবনের একটা মানে আছে
মানে আছে বেঁচে থাকার
এই দেশ কি আবার ফিরে আসতে পারে
যেভাবে প্রেমিকা আসে
অভিমানে নীল হয়ে ওঠা জীবনে
এই দেশের কি হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় সমুদ্রের পারে
যেভাবে প্রেমিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যায়

জানি না
মাঝে মাঝে ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি
ভেবেছি দেশের আঁচল কে প্রেমিকার আঁচল ভাবা যায় না
খুব ভোরে শিউলি ফুল কুড়িয়ে রাখা যায় কিনা তার আঁচলে
ভেবে ভেবে মেলাবার চেষ্টা করেছি
এই দেশ কি আমাকে সেরকম আবেগী করে তোলে
এই দেশ কি আমাকে সেরকম স্বপ্নের নেশায় ফেলে
এই দেশ কি আমাকে উদ্যমী করে তোলে
উতফুল্ল করে তুলে
উদ্বেলিত করে তুলে
জানি না
একবার আমার প্রেমিকাকে বলেছিলাম
চল পালিয়ে যাই
যত কষ্টই হোক
যত পরিশ্রমই করার দরকার পড়ুক না কেন
তোমাকে নিয়েই আমি ঘর বাধব
চল যাই পালিয়ে যাই
ভাবছি প্রেমিকা তোমাকে নিয়ে আমি যেভাবে ভেবেছি
সাহস করেছি
সিদ্ধান্ত নিয়েছে
দেশকে নিয়ে আমার ভেতরে তেমন কিছু কাজ করে কিনা
তেমন কিছু কাজ করে কি
কি জানি
কেবল কিছু গান আমার ভেতরে দেখেছি রক্ত দুলিয়ে যায়
কেবল কিছু গান আমার ভেতরে দেখেছি তোলপাড় শুরু করে দেয়
মনে হয় না দেশ বলে কিছু একটা আছে
দেশ বলে ভালবাসার স্বপ্ন দেখার কিছু আছে
দেশ বলে এমন কিছু আছে যা এখনও আমাকে আবেগী করে তুলে
আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে ওঠি
খালি পায়ে হাঁটতে থাকি
কি একটা গান মনে পড়ে
সম্ভবত দেশকে ভালবাসার দেশ প্রেমের সেই গান
এই হত্যা-ধর্ষণ-জ্যাম-বাজে রাজনীতি-বিস্ফোরণ-চাঁদাবাজি-হঠকারিতা-বেকারত্ব-অভুক্ত মানুষ-ধাপ্পাবাজ-মুখোশ পড়া মানুষ- আদর্শহীন- মানুষের দেশে
সেই গানে এখনও কি এমন প্রাণ আছে
যা আমাকে ভালবাসতে বাধ্য করে
প্রেমে পড়তে বাধ্য করে
হাত ধরে সমুদ্রের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য করে
একটি দেশের

৩৫. কতবার যে বললাম
কতবার যে জানালাম
কতবার যে ফোনে কথা হলো
চলো একবার শাহবাগে দেখা করি
আসবে আসবে বলে কতদিন কেটে গেলো
আজকাল খেয়ালও বোধহয় করো না তুমি

এতটা অখেয়ালে থেকে থেকে
ভুলেই তো গিয়েছিলে সব
মনে কি আছে আমায়
মনে কি ছিল তোমার
এই আমিই তোমাকে কতবার বলেছি
চলো একবার চলো শাহবাগ চলো
একবার অন্তত দেখা করি
দেখা হয় নি আর
দেখা হতেও পারত
কতবার কত শত বার
দেখা হয় নি আর
দেখা না হলে কি এতকিছু পাল্টে যায়
দেখা না হলে কি পাল্টে যাওয়াটা সহজ
দেখা না হলে কি ইতিহাসও পাল্টায়
পাল্টালোই তো
এভাবেই পাল্টে যায় তাহলে সব
তোমার-আমার মত কতশত জীবন
এভাবেই তাহলে পাল্টে গেলে তুমি

তবে সেই শাহবাগ কিন্তু পাল্টায়নি একদম
তোমাকে ঠিক যে উত্তাল সময়ে ডেকেছিলাম
আজ অনেকদিন পর
এখনও সেই উত্তাল সময়
এত এত উত্তেজনা এখনও আমার
তোমাকেও তো দেখলাম বেশ স্লোগান দিচ্ছ
গলা ভাঙেনি একদম
সেই টগবগে কণ্ঠ এখনও তোমার
তুমি পাল তুলেছ
আমি সুর মেলে দিয়েছি
শাহবাগ কেমন হেসে ওঠেছে
দেখনি হয়ত
শাহবাগ
এইসব রাগ-অনুরাগ-ব্যথা-হতাশা-ভালবাসার কথা
সবই জানে কিন্তু
সেও জমিয়েছে আবেগ বিন্দু বিন্দু
শুধু আমার আর তোমার কথা নয়
এখানে দাঁড়ানো
দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া সব মানুষকেই চেনে শাহবাগ

অনেক দিন পর
আবার ধরেছ স্লোগান
তুমি পাল তুলেছ
আমি সুর মেলে দিয়েছি
দেখা কিন্তু হয়েই গেলো
না হয় হলো অনেকদিন পর
তোমার কণ্ঠে মিলেছে আমার কণ্ঠ
এও এক প্রেম
আমাদের শাহবাগ
আমাদের বেদনা আর দ্রোহের ঘর।

৩৬. তুমি যখন কথা বল
কখনও কখনও ঠিক নয় প্রায় সব সময়েই
আমি কেবল শুনেই যাই
শুনেই যাই
তার মানে এই নয় যে আমার তোমার কথায় মনোযোগ নেই
মনোযোগ অবশ্যই থাকে
এবং সেসব আমি বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারি
বা পরে কখনো স্মরণও করতে পারি
কিন্তু তোমার সেসব কথার আমি কোনও বিচার-বিবেচনা করি না
তোমার সেসব কথার আমার কোনও পূর্বধারণা থাকে না
তোমার সেসব কথা নিয়ে আমার কোনও হতাশাও কাজ করে না
কিন্তু আমি সে সব শুনি
তোমাকে কোনও ধরণের প্রশ্ন না করেই শুনি
তোমাকে কোনও ধরণের বিরক্তি না করেই শুনি
তোমাকে আমার এইসব বিষয়ে বুঝতে না দিয়েই শুনি
এবং সেসব শুনতে আমার বরং ভালই লাগে
একেবারে একটার পর একটা গল্প
একটার পর একটা কাহিনী
একটার পর একটা ঘটনা
সেসব আমাকে বেশ মজা দেয়
এটা তুমি আমার বন্ধু বা প্রেমিকা বলেই নয়
আমি যে কারও কথাই শুনি
বলা যায় একেবারে মনোযোগ দিয়েই শুনি
এবং সেসব কথা শুনতে আমার খুব ভাল লাগে
এসব কথার ভেতরে প্রায় সময়েই আমাদের ইচ্ছেগুলো এক মনে হয়
কখনও আমাদের স্বপ্নগুলো
কখনও আমাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো
কখনও আমাদের দাবি-দাওয়াগুলো
সত্যিকার অর্থে মিলেই যায়
মনে হয় আমার কথাগুলিই তুমি অনর্গল বলে যাচ্ছে
মনে হয় আমার ভাবনাগুলিই তুমি অনর্গল বলে যাচ্ছ
মনে হয় আমার স্বপ্নগুলিই তুমি অনর্গল বলে যাচ্ছ
আর সে কারণে আমার সেসব কথা শুনতে খুবই ভাল লাগে
এটা একেবারেই তুমি আমার বন্ধু বা প্রেমিকা বলে নয়
যে কারও কথার ক্ষেত্রেই আমার এরকম হয়
বলতে পার আমি একদম একেবারে ভালো একজন শ্রোতা
বেশ মনোযোগী শ্রোতা
কোনও বিচার বিবেচনা ছাড়া
কোনও পূর্ব ধারণা ছাড়া
কোনও ধরণের হতাশা ছাড়া
আমি কথা শুনে যাচ্ছি
আর তুমি বলে যাচ্ছ
বলা যায় আমাদের প্রায় সব পথই এক
বলা যায় সব পথই আমাদের পথ
বা আমাদের যাওয়ার পথ একটাই
বা আমাদের লক্ষ্য, আমাদের গন্তব্য একটাই
এবং সেটা যে কোনও কিছুতেই
কেবল
কখনও
হঠাত
মাঝেমাঝে
তোমার পথের সাথে মেলে না আমার পথ
অথবা আমার পথের সাথে মেলে না তোমার পথ
অথবা আমরা আলাদা হয়ে যাই।

৩৭. সাহেবরা এসে আমাদের খুব সমাদর করলেন
অনেক দামী আর অপূর্ব সুন্দর গাড়ি নিয়ে তারা আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়েছিল
সচরাচর এই ধরনের গাড়ি নিয়ে কোনও সাহেব আমাদের গ্রামে ঢোকেন না
তারা ঢুকেছেন
গাড়িটি এত সুন্দর আর আমাদের গ্রামের মাটি আর কাঁদা রাস্তায় এটি কেমন কালো হয়ে ওঠেছে
গ্রামের লোকেরা কালো হয়
কারণ তাদের সারাক্ষণ রোদে রোদে থাকতে হয়
ক্ষেতে-খামারে ঘুরে বেড়াতে হয়
গ্রামের লোকেরা তাই দেখতে অসুন্দর
গ্রামে শহরের গাড়ি ঢুকলেও কেমন হয়ে ওঠে অসুন্দর
সেইসব সাহেবেরা আমাদের সমাদর করলেন খুব
আমরা আমাদের গরিব হওয়াটাকে মেনে নিতে পারছিলাম না
ভেতরে ভেতরে লজ্জা লাগছিল
আর সমাদর করার কথা আমাদের
কিন্তু উল্টো সমাদর করছেন সাহেবেরা
আমরা একটি পুকুরের পাড়ে সাহেবদের সাথে নানা কথা বললাম
এই গ্রামটি তাদের অনেক ভাল লেগেছে বলল তারা
এই গ্রামের ধারক্ষেত তাদের ভাল লেগেছে
গ্রামের চারপাশে তাকালেই সবুজ
সবুজ আর সবুজ যেন পাহারা দিয়ে রাখে এই গ্রাম
তারা এই সবুজের প্রশংসা করলেন আর শহরে যে কোনও সবুজ থাকে না এই কতা বললেন
কোনও কোনও সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন
সাহেবরা আরও অনেক কিছু জিজ্হস করলেন
এই গ্রামে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা কত
এই গ্রামে কয়টি স্কুল আছে
এরকম কত রকম প্রশ্ন
তারপর সাহেবরা বললেন
তারা এই গ্রামে আসতে চান
মানে তারা এই গ্রামে একটি কোম্পানি দেবেন
এতে গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি থেকেই একজন করে চাকুরি পাবে
এতে গ্রামে বিদ্যুত চলে আসবে
এতে গ্রামের মানুষ আরামে-আয়েশে দিন কাটাতে পারবে
আমরা তো অনেক খুশি
এই সব সাহেবেরা তো শুধু সাহেব নয়
আসলে ফেরশতা
আমরা তাদের কি করে ধন্যবাদ জানাব
পেলাম না খুঁজে
একদিন সাহেবেরা সত্যি সত্যি গ্রামে এলেন
একদিন সাহেবেরা সত্যি সত্যি কোম্পানি দিলেন
একদিন সাহেবেরা সত্যি সত্যি গ্রামে বিদ্যুত নিয়ে এলেন
একদিন সাহেবেরা সত্যি সত্যি গ্রামের প্রতিটি ঘর থেকে একজন একজন করে চাকুরি দিলেন
আর গ্রামের পাহারাদার সবুজ রঙটি কেমন কালো হয়ে ওঠছে
আমরা কেমন সবুজ থেকে কালো হয়ে ওঠছি
কালো হওয়া তো খুব খারাপ
আর ধানক্ষেতও ভরে ওঠছে কোম্পানির কালো জলে
আর আমাদের দাদা সেই ধানক্ষেতের এক কোণায় সারাদিন বসে থাকেন
কারও সাথে কোনও কথা বলেন না
বাসায় এসে ভাতও খেতে চান না
কেবল ধানক্ষেতের এক কোণায় প্রতিদিন সকালে গিয়ে বসেন
রাতে কখনো ফেরেন অথবা কখনো ফেরেন না

৩৮. জেলেরা সারাদিন ঘুমায় আর মাছ ধরে সারারাত
একদিন বের হয় মাছ ধরতে
আর ফিরে আসে পনের-বিশ দিন পর
যখন সে ফিরে আসে তখন টাকা নিয়ে আসে
খাবার কিনে আনে
ছেলের জন্য খেলনা কিনে আনে
বউয়ের জন্য ভালবাসা আনে
আর যখন সে মাছ ধরতে যায়
তখন সে বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে
কিছু বলে না
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে
কিছু বলে না
ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে
কিছু বলে না
একবার তার ব্যাগ ঠিক আছে কিনা দেখে
দৌঁড়ে চলে আসে নৌকার কাছে
ফিরে তাকায় না
ফিরে কেন তাকায় না
ফিরে তাকালে কি কান্না পায়
ফিরে তাকালে কান্না পায় কেন
এতকিছু ভাবে না সে
এতকিছু ভাবলে খাবার ঝুটবে না পেটে
নৌকায় গিয়ে আর সব জেলেদের সাথে গল্পে জড়িয়ে নেয়
যেন কিছু করে নি সে
যেন কিছু ভাবে নি সে
যেন কিছু ঘটেনি আজ
মাছ ধরার গল্প নিয়ে নৌকা এগিয়ে চলে
ভাসতে ভাসতে নৌকা চলে যায় সুদূর সমুদ্রে
রাত ভর গান আর ভালবাসায় নেচে ওঠে মাছ
মাছেরা ভরে ওঠে নৌকায়
যেন মাছ নয়
কতশত স্বপ্ন জমে ওঠেছে চোখে
বউ হাসছে যেন
ছেলে হাসছে যেন
মাছেরা সব জানে
মাছেরা জানে কখন জেলেদের জালে ধরা দেবে সে
কখন জেলেরা খুশি হবে ধরা পড়লে
কখন জেলেরা নিজেরাই মাছ হয়ে ওঠবে
এইভাবে ফিরে আসে জেলে
ঘরে ফিরে আসে অনেক খাবার আর ভালবাসা নিয়ে
ছেলেকে মাছ ধরার গল্প বলে
গল্প বলে কিভাবে মানুষও হয়ে ওঠে মাছ
আর সেইসব মাছ কি করে জানে
জেলেদের জালে তাকে কখন কিভাবে ধরা দিতে হবে
ছেলে চুপচাপ শুনে আর বাবাকে বলে
তাকেও যেন তার বাবা একদিন মাছ ধরতে নিয়ে যায়
এইভাবে একদিন সব জেলেরা মাছ ধরতে গেল
মায়েরা অপেক্ষা করতে থাকল জেলেদের ফিরে আসার
ছেলেরা অপেক্ষা করতে থাকল তাদের বাবাদের ফিরে আসার
একদিন রেডিও জানাল
সেই গ্রামের সমসন্ত জেলে সমুদ্রে মাছ হয়ে ভাসছে।

৩৯. মেয়েটি প্রচণ্ড মেধাবী ছিল
কথা-বার্তা, চলনে-বলনে মেধার ছাপ ছিল স্পষ্ট
ওর স্বপ্নগুলোও ছিল দুর্দান্ত
সে স্বপ্ন দেখত যে তার বর এমন কেউ হবে
যাকে দেখলেই মনে হবে দেশের সেরা একজন মানুষের সাথে কথা বলছি
তার চেহারা হবে রাজপুত্রের মত
সে স্বপ্ন দেখত এরকম একজন বরের হাত ধরে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশ থেকে দেশ
সে স্বপ্ন দেখত একদিন নারী আর পুরুষের সমতা আসবে
ছেলেদের মত নারীরাও সব কিছু করতে পারবে
সে স্বপ্ন দেখত গ্রামে সে একটি মেয়েদের স্কুল দেবে
সেখানে হাজার হাজার মেয়েরা পড়াশুনা করবে
অনেক বড় হবে
স্বপ্নগুলো দেখেও তো মেধা বোঝা যায়
এই স্বপ্নগুলো সেই সব মেধার কথাই মনে করিয়ে দেয়
বিষয়টা বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের বিষয় নয়
একেবারেই নির্জলা সত্য
একেবারেই সত্যি এ কথা
ক্লাসে সে কখনও সেকেণ্ড হয় নি
ক্লাসে সে সব শিক্ষকের প্রিয় ছিল
শুধু ক্লাসের পড়াশুনা নয়
বিতর্ক-নাচ-গান-কবিতা পাঠ সব বিষয়েই সে ছিল পারদর্শী
সামাজিকভাবে মানুষের মেধা থাকলেই হয় না
পুঁজিবাদী সমাজটা এমন যে তার চেহারাও ভাল থাকতে হয়
সেদিক দিয়েও মেয়েটি ছিল অনেক এগিয়ে
শুধু এগিয়ে নয় ঈর্ষা করার মতই ছিল
একদিকে পড়াশুনা,আরেকদিকে সামাজিক যে কোনও কাজ
সবদিক দিয়েই কি কারও পক্ষে এগিয়ে থাকা সম্ভব?
এতটা এগিয়ে থাকা সম্ভব?
এটা বিশ্বাস করার মত নয়
তবে কখনও কখনও অবিশ্বাস্য কিছু বিষয় বিশ্বাস করতেই হয়
না করেও উপায় নেই
কারণ এটা বানানো নয়
একেবারেই সত্য
নির্জলা সত্য
মেয়েটির এইসব স্বপ্ন শুনে যে কেউ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত
আর বলত তুমিই পারবে
আমরা অবাক হয়ে থাকতাম
একটি মেয়ের ভেতর ঠিক কি এমন থাকলে সে এতটা এগিয়ে যেতে পারে
সত্যিই মেয়েটা মেধাবী ছিল
এবং তা ছিল ঈর্ষা করার মত
কিন্তু এই ঈর্ষা অনেকটা মেয়েটার প্রেমে পড়ার ঈর্ষা
অনেক বেশি ভালবেসে ফেলার ঈর্ষা
একদিন সেই মেয়েটিকেই আর খুঁজে পাওয়া গেল না
খুঁজে পাওয়া গেল না যে গেলই না
সারা শহর মাইকিং করা হল
সারা শহরের মানুষের মুখে মুখে সেই মেয়েটিকে নিয়ে করুণ আহাজারি
আহা কি হল এই মেয়ের
এমন মেয়ে আর হয় না
কোথায় গেল এই মেয়ে
যথারীতি একদিন ভুলেও গেল সবাই এই মেধাবী মেয়েটির মুখ
অনেকদিন পর একদিন হঠাত টিভিতে সেই মেয়েকেই দেখলাম
একজন সুন্দর ছেলের হাত ধরে নাচছে

৪০. আমি যখন ছোট ছিলাম
তখন আমার নখ বড় হলেই
আমার বাবা আমার নখ কেটে দিতেন
যতবার নখগুলো বড় হতো
ততবারই বাবা আমার নখগুলো কেটে দিতেন
কিন্তু আমার বাবা কি জানতেন
তখন আমার আবেগও বড় হচ্ছে
আমার মা আমার বাবা
তাদের প্রতি আমার আবেগ বাড়ছেই ক্রমশ
হয়ত জানতেন
জানার কথাই তো
আমার বাবা যখন ছোট ছিলেন
তথন আমার দাদা নিশ্চয়ই
যত্ন করে কেটে দিতেন তার হাত ও পায়ের নখ
এই এখন যেমন তিনি আমার হাত-পায়ের নখ কেটে দিচ্ছেন
তখনও তার তার আবেগ বড় হচ্ছিল
কিন্তু সেই আবেগ তো আর কাটা যায় না
আমার আবেগও তো কাটতে পারবেন না আমার বাবা
কাজেই এটি বড় হচ্ছে
ধীরে ধীরে ক্রমশ বড় হচ্ছে
আর ভাললাগা-ভালবাসা বাড়ছে তাদেরকে নিয়ে
আরও অনেককে নিয়ে
ঠিক আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার পায়ের পাতাও ছিল ছোট
আমি সেই পায়ের পাতার ছাপ মাটিতে দেখে বলতাম
মা দেখ লক্ষ্মীর পা
মা হাসতেন
কিন্তু আমার মা কি জানতেন আমার পায়ের পাতাও বড় হচ্ছে ক্রমশ
জানতেন তো বটেই
এই কারণেই হয়ত মাঝে মাঝে বলে উঠতেন
মানুষ বড় হলে তার মা-বাবাকে ভুলে যায়
মানুষের পায়ের পাতা যত বড় হতে থাকে
ততই নাকি মানুষ অনেক বড় হতে থাকে
আর বড় হতে থাকা কি মা-বাবাকে ভুলে যাওয়া?
আমি জানি না
কখনও এভাবে ভাবি নি
তবে ভেবেছি যে আমার আবেগ আর আমার পায়ের পাতা এক সাথেই বড় হচ্ছে
আর তাই আমি বড় হচ্ছি
এবং আবেগ ততই তীব্র হচ্ছে আমার মা-বাবাকে নিয়ে
একদিন আমার আবেগ আরও বেশি আবেগী হয়ে উঠল একজন মেয়েকে নিয়ে
আমি জানতাম না এই আবেগের কথা
এই আবেগ সবকিছু ভুলিয়ে দিল আমায়
খেয়াল করলাম
মা-বাবার চাইতেও এই মেয়েটি কিভাবে যেন আমাকে বেশি আবেগী করে তুলছে
আমি অনেক কিছুই ভুলতে বসেছি যেন
আমার শৈশব- বাবার নখ কেটে দেওয়া- মাকে লক্ষ্মী পায়ের কথা বলা
আমার মা-বাবাকে নিয়ে আবেগ
একদিন বড় হলে
তোমাদের কষ্ট করতে হবে না আর

তাহলে কি মানুষের নখের মত আবেগও কেটে যায়?

৪১. ব্যাংক কলোনির ভেতর হাঁটছি
এমন কোনও কলোনির ভেতর আমি সচরাচর যাই না
এই না যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে
যেমন আমি শুনেছি
সেসব কলোনিতে একটা একটা করে সিগারেট বিক্রি করে না
আমার পক্ষে এক প্যাকেট সিগারেট কেনার টাকা কখনোই থাকে না
আবার সে সমস্ত কলনিতে অনেক দামি সিগারেট বিক্রি হয়
আমি যে ব্র্যান্ডের সিগারেট খাই তা সেখানে পাওয়া যায় না
আবার ক্ষিধে লাগলে খাওয়ার হোটেল
বা সস্তা দরের খাবার সেখানে নেই
এমন একটা অবস্থা হয় যে
না খেয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না
আর সে সমস্ত জায়গাতে
আমার তেমন কোনও বন্ধুকেও পাওয়ার কথা না
বা আমার বন্ধুরা কেউই ব্যাংক কলোনিতে নেই
বা এই ধরণের চাকুরের কেউ নেই
যারা আছে তাদের সাথে ঠিক আগের মত খাতির নেই
সম্ভবত অর্থনীতিই এই ফারাকটা করে দিয়েছে
বন্ধুত্বের ভেতর অর্থনীতির ফারাক থাকাটা কষ্টের
কিন্তু এটা আমাকে কষ্ট দেয় না
বা দিলেও আমি এই কষ্ট থেকে মজা নেবার চেষ্টা করি
ব্যাংক কলোনির মানুষগুলোকে এই কারণে আমার ভেতরে এক ধরণের ভীতি তৈরি করে
আমি সহসাই তাদের সাথে মিশতে পারি না
মিশতে গেলেও কেমন জড়তা চলে আসে
তবুও হাঁটছি
এই ভর দুপুরে ব্যাংক কলোনির ভেতরটা অনেক নিরব
গভীর রাতের মত নিরব
আর সেখানকার প্রত্যেকটা বাসা ও অফিসের সামনে রয়েছে কুকুর
এই কুকুরগুলোর চিতকারও আমার বয়ের আরেকটা কারণ
ঠিক কারণ বললে হয় না
বড় ধরনের কারণ
আমি এই এলাকায় নতুন এই দেখে নয়
মনে হয় ব্যাংক কলোনিতে সমস্ত দেশের যে টাকা জড় করে রাখা হয়েছে
কুকুরগুলো মনে করে বোধহয় আমি সেইসব টাকা নিতে এসেছি
এজন্যই শুধু নয়
যদি এরকম ঘটনা ঘটে যায়
সেখানকার মানুষগুলো সত্যি আমাকে চোর মনে করে
সেটা আমার জন্য হবে ভয়াবহ আর অসহ্যরকমের
হয়ত এই ধরনের ঘটনা ঘটে যাবার পর আমার আত্মহত্যার ইচ্ছেও জাগতে পারে
আমি তাই চুপচাপ ভেতরে সাহস নিয়ে হাঁটছি
কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই
উদ্দেশ্য ছাড়াও ভরদুপুরে কেউ কেউ হাঁটে
আবার ব্যাংক কলোনিগুলোতে নাকি ভরদুপুরেই বেশি ডাকাতি হয়
এতসব ভয় নিয়ে কি কখনও নিজের মত করে একা একা হাঁটা যায়?
যায় না
ব্যাংক কলোনির ভেতর ঢুকে পড়লে এরকম ভয় আমাকে তাড়া করে বেড়াবে জানতাম
তারপরও আজ কেন যেন এই রাস্তায় চলে এলাম
আবার ঠিক এত বেশি ভয় করবে এটা এতদিন ভাবিনি
আজ সত্যি সত্যি আমার ভেতরে বিষয়টা খেয়াল করলাম
সত্যি সত্যি মনে হল ব্যাংক-টাকা এই বিষয়গুলো আমার ভিতরে ভীতি তৈরি করে
ব্যাংকের মানুষ-ব্যাংকের সংস্কৃতি আমার ভেতরে ভীতি তৈরি করে
আমি এই ভীতি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি কাউকে না জানিয়েই
ব্যংকের মানুষের এই ধনাড্য সংস্কৃতি আমাকে একই সাথে যেমন অভিভূত করে
মনে হয় এরকম জীবনও মানুষের হয়
আবার ঠিক উল্টোভাবে আমি যখন ভাবতে যাই
যে এইসব মানুষের অনেক নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়
এইসব মানুষেরা ঠিকমত ঘুমুতে পারে না
এইসব মানুষেরা সহজ-স্বাভাবিকভাবে কোথাও হেঁটে বেড়াতে পারে না
কারণ তাতে তাদের মেরে ফেলার ভয় থাকে
তখন আমার সেই অভিভূত হওয়াটা ম্লান হয়ে যায়
আর ব্যাংক কলোনি আমার একটা মৃত্যুপুরি মনে হতে থাকে
সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার রাস্তা খুঁজতে থাকি
মনে হয় একবার যদি এই কলোনি থেকে আমি বের হতে পারি
আমি বেঁচে গেলাম
মনে হয় এই বেঁচে যাওয়াটাই আমি এতক্ষন ধরে খুঁজতেছিলাম।

৪২. এত রাতে এত ভয় চোখে নিয়ে ঘরে থেকে বেরিয়ে পড়েছ তুমি
আজ নয়
প্রায়ই তুমি কাউকে না জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়
গভীর রাতে পার্কে একা একা বসে কাঁদ
আমি জানি কেন তুমি একা হয়ে যাও
বন্ধুদের সাথে খেলতে তোমার কেন ভাল লাগে না
কেন তুমি ক্লাসে মন মরা হয়ে পেছনের বেঞ্চে বসে থাক
কেন প্রায়ই তোমার মেজাজ খিটখিটে থাকে
আর কখনও কখনও তোমার শিক্ষকদের সাথেও তুমি খারাপ ব্যবহার কর
কেন স্কুলের সামনে যেখান থেকে আইসক্রিম কিনতে
তার সাথে ঝগড়া কর
কেন কেন মাঝে মাঝে তুমি স্কুলে যাও না
কেন মাঝে মাঝে বাসায় ফের না
কেন বাড়িতে তোমার মা-বাবাকে তোমার শিক্ষক
অভিযোগ লিখে পাঠায়
কেন তুমি এত রাতে বেরিয়ে পড় ঘর থেকে
আর পার্কে একা একা বসে কাঁদ
কারণ তোমার মা-বাবা প্রায়ই ঝগড়া করেন
তোমার মা তোমার খোঁজ খবর নেন না
অন্য বন্ধুদের মায়েদের মত তোমাকে তিনি স্কুলে নিয়ে যান না
তোমার মা তোমার জন্য ভাল খাবার রান্না করে টিফিন করে দেন না
তোমার রাগ হয় মায়ের ওপর
তুমি ভেতরে ভেতরে তোমার মাকে দেখতে পার না
তোমার এখন মায়ের সাথে কথা বলতে ভাল লাগে না
আমি জানি
আমি জানি
তোমার বাবা অনেক রাতে বাড়ি ফেরেন
কখনও ফেরেন কখনও ফেরেন না
কখনও তিনি ঘরে এসে মাতলামি করেন
তোমার মাকে তিনি মারধর করেন
অনেক রাতে পেঁচার ডাকের মত করে
তোমার মা কান্না-কাটি করেন
রাতে হঠাত তোমার ঘুম ভেঙে যায়
তুমি বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে থাক
তুমি তোমার মায়ের কাছে যেতে পার না
তোমার বাবার কাছে যেতে পার না
তোমার বাবা তোমার জন্য আগের মত খেলনা কিনে নিয়ে আসেন না
তোমার বাবা তোমার বন্ধুদের বাবার মত তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হন না
তোমার বাবা তোমাকে কখনও স্কুলে নিয়ে যান না
তোমার বাবা তোমার কোনও খোঁজ-খবর নেন না
তোমার বাবাকে আর ভাললাগে না
তোমার বাবাকে খুব ভয় লাগে
ভয়ঙ্কর লাগে
তোমার ঘর থেকে পালিয়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে
তোমার পালিয়ে পালিয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে
তুমি ঘরে ঠিক মত খাওয়া-দাওয়া কর না
তুমি ঠিক মত পড়াশুনা কর না
তুমি প্রাণ খুলে হাস না
বিকেল বেলা খেলতে বের হও না
তোমার অন্য বন্ধুদের মত নিজেকে মনে হয় না
অনেকে তোমাকে এড়িয়ে চলে
অনেকে বলে এই ছেলেটা খুব অল্প বয়সে বড় হয়ে গেছে
তুমি এড়িয়ে চল তাদের
তোমার মনে হয়
সবার মত তুমি না
তুমি অন্যরকম
তুমি অন্যদের মত হতে চেয়ে চেয়ে
হয়ে গিয়েছ অন্যরকম
কারও মত নয়
তোমার মত
আর তাই প্রায়ই কাউকে না জানিয়ে খুব দূরে কোথাও চলে আস তুমি
যেখানে নদীর জল তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে
নদীর জল তোমার মায়ের মত করে তোমাকে দেখে হাসে
নদীর জল তোমার বাবার মত করে তোমাকে দেখে হাসে
নদীর জল তোমাকে তোমার মা-বাবার মত করে আদর করে
তুমি নদীর জলে চেয়ে থেকে থেকে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়

৪৩. আমার দাদীমা আমাকে শিখিয়েছিলেন
কিভাবে হাঁটতে হয়
আমি তার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছি
আমি যখন পৃথিবীর ওপর দু’ পা ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাতাম
তিনি হাসতেন আর হাততালি দিতেন
আমি যখন পৃথিবীর ওপর এক পা দু’ পা করে এগুবার চেষ্টা করতাম
তিনি হাসতেন আর হাততালি দিয়ে উতসাহ দিতেন
আজ আমি সেই হাঁটি হাঁটি পা দিয়ে কতদূর চলে এসেছি
আমার দাদীমা জানেন না
আমার দাদীমা না জেনেই চলে গেলেন
কিছু না বলেই চলে গেলেন
কিন্তু আমি যখন মাঝে মাঝে ইদানিং একদমই হাঁটা হয় না এরকম কিছু ভাবি
আমি যখন ভাবি যে প্রতিদিন সকালে আমার অন্তত আধা কিলোমিটার হাঁটা উচিত
তখন আমার দাদীমার কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে তার সেই হাসিমাখা মুখ
আমি পৃথিবীর ওপর এক পা দুই পা করে এগুচ্ছি
আর উনি হাততালি দিচ্ছেন

আমার দাদীমা আমাকে শিখিয়েছিলেন কথা
আমি যখন একেবারেই ছোট
কোনও কথাই পারি না বলতে
তখন আমার দাদীমা আমাকে শিখিয়েছিলেন মা ডাক বাবা ডাক
তারপর আস্তে আস্তে কত কথা শিখেছি
এখন আমি কত কথা শিখেছি
কথার ছলাকলা শিখেছি
কথা গুছিয়ে বলা
কথা সাজানো
কথা দিয়ে কবিতা লেখা
কথা দিয়ে গল্প লেখা উপন্যাস লেখা
কতকিছু শিখলাম
আমার দাদীমা আমার এত কথা শিখে ফেলার কথা জানেন না
জানেন না আমি এখন সেই সব কথা দিয়ে কবিতার বই বের করি
জানেন না আমি এখন সেই সব কথা দিয়ে গল্পের বই বের করি
আমার দাদীমা এসব কিছু না জেনেই চলে গেলেন
প্রায়ই যখন আমি চুপচাপ বসে থাকি
যখন কারও সাথে কোনও কথা বলতে ইচ্ছে করে না
যখন একা একা চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে
তখন আমার দাদীমার কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে আমার সেই প্রথম মা ডাক বলে ওঠার সময়
যেভাবে উনি শেখানোর আনন্দে চমকে উঠেছিলেন
মনে পড়ে আমার সেই প্রথম বাবা ডাক বলে ওঠার সময়
যেভাবে উনি শেখানোর আনন্দে চমকে উঠেছিলেন
মনে পড়ে আমার প্রথম দাদীমা ডাক বলে ওঠার সময়
যেভাবে উনি শেখানোর আনন্দে চমকে উঠেছিলেন
মনে হচ্ছে আজ হঠাত
একা
চুপচাপ
বসে থাকার এই সময়ে
কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে না করার এই সময়ে
আমি বলে উঠছি
দাদীমা

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s