Home

art 4

দুপুর মিত্র যে গল্পের নাম দিয়েছেন মেটা ফিকশন, আমাদের এদিকে মানে পশ্চিমবঙ্গে তা অনু গল্প। এই খুব ছোট ছোট আয়তনে গল্প, এর পরম্পরা বাংলায় তেমন কিন্তু নেই। সাহিত্যেই এই ফর্মটি অনেকটা নতুনই বলা যায়। এই ভাবে গল্প বলা, খুব অল্প কথায় বেশি কথা বলা এর হয়ত কোনও সামাজিক প্রয়োজন ঘটেছে। সমাজের দাবি থেকেই তো আখ্যানের নানা আঙ্গিক জন্মেছে। এ যেন হাতে পাওয়া এইটুকু সময়ে একটু গল্প শুনিয়ে দেওয়া।

গল্প বলা আর শোনা মানুষের সহজাত প্রবণতা। সুবোধ ঘোষের কিংব্দন্তীর দেশে গ্রন্থে তিনি পেশোয়ার শহরের কিসসাখানি বাজারের কথা শুনিয়েছিলেন। পথের ধারে কিসসা (গল্প )র পশরা নিয়ে বসত বুড়ো কিসসাদার–গল্প বলিয়েরা। পয়সা ফেল, গল্প শোনো। এই কিসসা বলিয়ে লোক দিল্লি শহরেও ছিল। এমন গল্প আমরা শুনেছি কালিদাসের কালে। মেঘদূতম কাব্যে আছে গ্রাম বৃদ্ধ সন্ধেয় বসে শোনায় রাজা উদয়ন আর রাজকন্যা বাসবদত্তার প্রণয় কাহিনি। দুপুর কি সেই গল্প শোনাতে বসেছেন। মেটা ফিকশন নাম আমার তেমন পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু দুপুর যে গল্প বলতে বসেছেন তা আমাকে তাঁর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে।

এই যে তিনি গল্প শোনাতে বসেছেন, যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে সে গল্প শুনে নিয়ে আবার চলতে আরম্ভ করা যায়। আমাদের লোক কাহিনিতে এমন গল্প আছে। সেই সব গল্পের ভিতর দিয়ে সমাজের নানা অশুভ ঘটনা, প্রবণতার বিপক্ষে বলা হত কত রকম কথা। থাকত অনেক মিরাকল। যা ঘটতে পারে না, তা ঘটিয়ে দেওয়া হত। দুপুর মিত্রর এই মেটা ফিকশন অনেকটা সেই কথা বলেছে। খুবই আধুনিক তিনি এখানে। ভেঙেছেন আমাদের পুরাণ- রাধা-কৃষ্ণের প্রণয় কাহিনির শিকড়।

তাঁর মেটা ফিকশন-১, রাধা মঙ্গল, এই রাধা কৃষ্ণ মিলনের আগেই ধর্ষিতা হয় সহপাঠীদের দ্বারা। এই রাধা সুন্দরী, পাড়ার ঘরে ঘরে এর যাতায়াত। এই রাধা ইস্কুল পশ করে কলেজে যায়। কলেজে সহপাঠীদের চোখের মণি হয়ে ওঠে। রাধা তাদের মধ্যমনি। তারপর সহপাঠীরাই একদিন তাকে ধর্ষণ-এর পর হত্যা করে। নগরে ক্রন্দন শুরু হয়, হায় রাধার এ কী হল ? স্বর্গ মর্ত্য সর্বত্র আলোড়ন শুরু হয়। দেবতারা এমন হবে ভাবতে পারেনি। কী হল দেবতাদের প্রতিশোধ ? রেপ এবং মার্ডারের পর তারা মদ খেটে বসে, মদের বিষ ক্রিয়ায় মারা যায় সকলে। ভক্তরা রাধা রাধা বল। দুপুর খুব সরাসরি বলেন। তাঁর এই গ্রন্থ পুরাণ, ধর্মীয় মিথ–সব ভেঙেছে। ব্যঙ্গ অতি ক্ষুরধার।

রামায়ণের সীতা দুপুরের গল্পে ওই ভাবে জন্ম নেয় মৃত্তিকা হতে বুঝিবা। এই সীতার বাবা মা দরিদ্র চাষী। এক প্রবল বর্ষার দিনে, নবগঙ্গার তীরের গ্রামে জন্ম হয় সীতার. আসলে তাকে জমিতে কুড়িয়ে পেয়েছিল এক চাষী। সে তাকে বুকে করে নিজের কুড়িরে নিয়ে আসে। মেয়ের নাম দেয় সীতা। দুপুর লিখছেন ঃ ‘লাঙলের আঘাতে ভূমি বিদীর্ণ করে যে সীতার জন্ম হয়, কোনও কৃষকের ঘরে মেয়ে হলে তার নাম তো সীতাই রাখতে হবে। সীতা শুধুই দু:খের এ ভুল, সীতা

একজন কৃষকের হাল কর্ষণে আনন্দের জন্ম। একজন কৃষক সারা জীবন এইই চায়।’ এই গল্পেও দুপুর মিথ ভেঙ্গেছেন। এই সময়কে অন্বিত করেছেন রামায়নের কাহিনির সঙ্গে। রামায়ন কাহিনি ভেঙ্গেচুরে নতুন বয়ান নির্মাণ করেছেন।

বন্যায় সীতার পালক পিতার ঘর ভেসে যাওয়া। সে ছিল ভূমিহীন চাষী। তার ঘর ভাঙ্গে বন্যায়। বন্যায় যখন সীতার জনকের ঘর ভাঙ্গে, তখন সীতা ১৬-১৭।
এই গল্প তখন ছকে আবদ্ধ হয়ে যায়। পৌরাণিক সীতা ঢাকা শহরে। বাবা রিকশা চালায়। তার বিয়ে হয় বস্তির একটি ছেলের সঙ্গে। বিবাহিত সীতা অপহৃত হয়। নাহ, এই গল্প শেষ পর্যন্ত ছকের ভিতরে পড়ে যায়। রাধার গল্পে যেমন নতুন গল্প তৈরি হয়, এখানে তা হয় না। দুপুরের মেটা ফিকশন কখনো প্রবন্ধের রূপ নিয়েছে।

এই গ্রন্থটিতে দুপুরের গল্প নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা রয়েছে। কিন্তু তার ভিতরে কোথাও যেন গল্পের খেই কেটে যায়। এরই ভিতরে হরিশ্চন্দ্রকে নিয়ে দুপুরের যে গল্প তা আমাকে চমকিত করেছে। গল্পটি পুরাণ আর এই বাস্তবতার মিশেলে এক আলাদা মাত্রা পেয়েছে। একই প্রয়াস ছিল রাধা বা সীতার গল্পে। রাধার গল্প অনেকটা পৌঁছলেও সীতার গল্পে ছক ভাঙতে পারেননি দুপুর। সে ছক ভাঙা হয়েছে রাজা হরিশ্চন্দ্রের গল্পে।

আর ছক ভেঙ্গে দুপুর নতুন এক কাহিনি, নতুন এক পুরাণ রচনা করেছেন। হ্যাঁ, এই বই, আলাদা বই। এর গল্প আলাদা গল্প। কখনো মনে হয় এই মেটা ফিকশন আর গল্প বুঝি আলাদা। এর বলবার ভঙ্গি আর বিষয় তো ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে বারবার। কখনো তথ্য আর তথ্যর ভারে তাঁর মেটা ফিকশন হয়েছে ক্লান্তিকর, কখনো তা শিল্পের সৌন্দর্যে অপূর্ব।

আমি দুপুরকে দেখিনি কখনো। তাঁর গল্প পড়েছি অন্তরজালে। ইন্টারনেটে। সে পড়া আসলে পড়া হয়ে ওঠেনা অনেক সময়। মুদ্রিত অক্ষর যদি গ্রন্থে আসে, তা পড়লে অন্য অনুভব হতে পারে। এই ভাবে পড়া আর লেখা খুবই অবিচারের কাজ। দুপুর লিখবেন। তাঁর মেটা ফিকশন পড়তে আগ্রহী হয়ে থাকলাম।

অমর মিত্র

২২.০১.২০১৩

 

মেটাফিকশন-১: রাধামঙ্গল

রাধার জন্ম:

পাঠক বিশ্বাস করেন আর নাই করেন এই রাধার জন্ম এইভাবেই। একবার বিষ্ণু রম্যবনে প্রবেশ করে রমণ ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ফলে কৃষ্ণের ডান অংশ থেকে

কৃষ্ণমূর্তি ও বাম অংশ থেকে রাধা মূর্তি প্রকাশ পায়। রাধা কৃষ্ণকে কামাতুর দেখে তাঁর দিকে অগ্রসর হন। রা অর্থ লাভ এবং ধা অর্থ ধাবমান। ইনিই অগ্রসর হয়ে

কৃষ্ণকে লাভ করেছিলেন বলে- এঁর নাম হয়েছিল রাধা। পৃথিবীতে পা পড়ল রাধার।

বলুন – জয় রাধা।

রাধার কিশোর বেলা:

এ পাড়া থেকে ও পাড়া ঘুরে বেড়ায় রাধা। রাধার কথার শেষ নেই। রাধার জানার শেষ নেই। রাধার আকুল হওয়ার,বিহ্বলিত হওয়ার শেষ নেই। মা পারেন না রাধাকে

বোঝাতে,রাধাই বরং মাকে বোঝান। পাড়ার সমস্ত কাকীদের সাথে রাধার খাতির। রাধা এক্কা দুক্কা খেলে খেলে পাড় করে দেয় বেলা। রাধা দুপুর বেলা কোথায়

খাওয়া-দাওয়া করে কেউ জানে না। একবার এ বাড়ি তো,কাল অন্য বাড়ি। রাধা ছুটে চলে,নিজের মত,নিজের উচ্ছ্বাসে। সমস্ত পাড়া রাধাময়। সমস্ত পাড়াই রাধা।

সমস্ত পাড়াই রাধাময়।

বলুন – জয় রাধা।

রাধার রূপের বর্ণনা:

কালো রাতের তারা হাসাহাসি করে রাধার চুলে। রাধার হাসিতে হেসে ওঠে দেবকুল। রাধার মসৃন হাতে স্পর্শে জেগে ওঠে সবুজ ঘাস। রাধার চোখে চোখ রেখে কত

দেবতা হয়ে যায় অজ্ঞান। রাধার আঙ্গুল যেন কচি ঘাসের লতা। রাধার কুচযুগলে তারারা সুশোভিত। নাভি যেন এক ফোটা শিশির। রাধার কথা সুরের মালায় গাথা

অসংখ্যা শব্দ।

বলুন – জয় রাধা।

রাধার কলেজ গমন ও দেবতাদের উল্লাস ও সহপাঠীদের হত্যা-ধর্ষণ:

প্রতিদিন কলেজে যায় রাধা। অনেক পড়তে হবে তার। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে বাড়ির সকালের সমস্ত কাজ শেষে রাধা যায় কলেজে। কলেজে রাধার প্রেমে পড়ে আছে

সমস্ত ছেলেরা। একবার দেখামাত্র কেউ চোখ ফেরাতে পারত না। কেউ ফেরাতে পারে না নিজেদের মুখ। রাধা হাসে আর হাসে। তার হাসিতে গড়িয়ে পড়ত সমস্ত জগত।
একদিন বাড়ি ফেরার পথে সেই রাধাই ধর্ষিত হয় সহপাঠী দ্বারা। শুধু ধর্ষণ নয়,ধর্ষণ করে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে যায় সহপাঠীরা।

বলুন – জয় রাধা।

নারদ মুনীর কৃষ্ণের কাছে বিচার ও দেবতাদের ক্ষোভ:

এই ঘটনায় কেঁপে ওঠে দেবতালয়। নারদ মুনী বিচার দেন কৃষ্ণকে। ঘোর কলি ঘোর কলি। কৃষ্ণ- এ রাধার কেমন অবতার। কৃষ্ণ ক্ষেপে ওঠেন। কৃষ্ণের লাল চোখ থেকে বের হতে থাকে লাভা। সেই লাভায় কাঁপতে থাকে পুরো পৃথিবী।

পৃথিবীবাসীর মুখে রাধা রাধা নাম:

পুরো এলাকা,এলাকা থেকে আরেক এলাকা,পুরো পৃথিবীতে চাউর হয়ে যায় এই ঘটনা। লোকজন হায় হায় করতে থাকে। লোকজন হায় হায় বলতে থাকে। মানুষের চোখে আর ঘুম আসে না। এ রাধার কি হল। লোকজন বলতে লাগল,রাধার সেই সব সহপাঠিরা,যারা রাধাকে ধর্ষন করে হত্যা করেছে, কেউ আর বাঁচতে পারি নি। সেদিন রাতেই মদ খেয়ে বিষক্রিয়ায় মারা যায় তারা।

বলুন – জয় রাধা।

মেটাফিকশন-২: সীতাপুরাণ

সীতার জন্ম

বাংলাদেশের নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় সীতা জন্ম নিলেন। সেদিন বৃষ্টির জলে ভরা ছিল নড়াইল। সীতার বাবা তখন হাল চষতে বাড়ির বাইরে। ঘরে আর কেউ নাই।

নবগঙ্গা নদী তখন জলে ভরপুর। অথৈ নদীর ডাক দিন-রাত এপার থেকে ছুটে কেড়ায় ওপারে। এরকম মেঘ কালো দিনে সীতা এসে জন্ম নিলেন নড়াইলের কুলে।

সীতানামকরণ ও এলাকাবাসীর নানা আলাপ

ঘর মেয়ের হাসিতে আলোয় ভরে ওঠেছে যেনে হাল চাষ ফেলে দৌঁড়ে আসেন সীতার বাবা। এসেই মেয়েকে কুলে নিয়ে তার নাম দেন সীতা। ঘরে পাড়া-প্রতিবেশীর

সবাই এসে জড় হয়েছেন। সীতা নাম দেওয়া হয়েছে শুনে অনেকেই বললেন- এই নাম কেউ রাখেন না। সীতা মানে দু:খ,সীতার আজন্ম জীবন ছিল দু:খের। মাও

বাবাকে অনুরোধ করেন মেয়ের নাম যেন সীতা না রাখা হয়। কিন্তু বাবার কথা অন্য,যে সীরধ্বজ রাজার হলকর্ষণের সময় সীতার জন্ম হয়,জমি চাষ করার সময়

লাঙলের আঘাতে ভূমি বিদীর্ণ করে যে সীতার জন্ম হয়,কোনও কৃষকের ঘরে মেয়ে হলে তার নাম তো সীতাই রাখতে হবে। সীতা শুধুই দু:খের এ ভুল, সীতা

একজন কৃষকের হাল কর্ষণে আনন্দের জন্ম। একজন কৃষক সারা জীবন এইই চায়।

সীতার রূপ ও চরিত্রের বর্ণনা

বয়স যতই বাড়ে সীতার রূপও ততই বাড়তে থাকে। এলাকাবাসীর নজরেও পড়তে থাকে সীতা। শুধু রূপে নয়,গুণেও। মা-বাবার হেন কাজ নেই যে সীতা তা করে দেয়

না। সীতার মা-বাবা সীতাকে নিয়ে খুবই খুশি আর আনন্দিত। এলাকাবাসীও সীতার রূপগুণে খুব মুগ্ধ। সবার মনে কেবল একই কথা- সবার ঘরে যেন সীতার মত

মেয়ে জন্ম নেয়।

নবগঙ্গার ভাঙন ও সীতার পরিবারসহ ঢাকায় আগমন

সীতার বয়স যখন ১৬ কি ১৭,সীতার বিয়ে নিয়ে কথা বলছেন তার মা-বাবা,দু-একটা ছেলে পক্ষও এসে দেখে গেছে সীতাকে সে বছরই শুরু হল নবগঙ্গা নদীর

ভাঙন। নদীর এই যে ভাঙন শুরু হল তার আর শেষ নেই। অনেক মানুষকে গ্রাম ছেড়ে দিতে হল। কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে। সীতাদেরও একই অবস্থা। ধানী

জমিগুলোও সব নদী খেয়ে নিল। সীতারা চলে এল ঢাকায়। ঢাকায় তাদের কিছুই চেনা নেই। এলাকার যে লোকটির সাথে তারা ঢাকায় এসেছিল, সেই লোকটিই বলল

সীতা আর তার মাকে গার্মেন্টে কাজ করতে। আর সীতার বাবা কাজ নিল রিক্সা চালনার। বস্তিতে অজস্র মানুষের সাথে একটি ভাংন অতিক্রম করে তারা এমন এক

জগতে এসে পৌঁছল,তাদের মনে হল- কোনোরকম জীবনটা এখন কাটিয়ে দিতে পারলেই চলে।

সীতার বিয়ে ও অপহরণ

এরকম সুন্দর একটি মেয়ে বস্তিতে থাকে,বস্তির কোনও ছেলেরই নজর এড়াল না বিষয়টা। মা-বাবা এটা বুঝতে পেরে আর আজানা-অচেনা জায়গা, কিছু একটা

হয়ে গেলে এরকম ভেবেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল মা-বাবা। ছেলে সেই বস্তিতেই থাকে। কাজ করে একই গার্মেন্টে। বিয়ের দু একদিন যেতে না যেতেই বস্তির ছেলেরা

অপহরণ করে নিয়ে যায় সীতাকে।

সীতার অগ্নিপরীক্ষা:

সীতার কান্না দেখে মায়ায় পরে যায় সেইসব ছেলেরা। সেদিনই বস্তির পাশেই বখাটে ছেলেরা ফেলে রেখে যায় সীতাকে। এবার শুরু হয় স্বামীর সাথে সীতার ঝগড়া।

সীতার স্বামী সীতাকে আর ঘরে নিতে চায় না। কারণ সীতা এখন অসূয়া। সীতা কিছুতেই বোঝাতে পারে না,বখাটে ছেলেরা তার শরীর পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখেন নি। রাতভর

কান্না-কাটি করল সীতা। স্বামী কোনও কথাই মানতে চাইল না। সীতাকে এখন অগ্নিপরীক্ষা পরীক্ষাই দিতে হবে। পরদিন রাতে সীতা রান্না ঘরে তার শরীরে নিজেই আগুন ধরিয়ে দিল।

সীতার নাম মাহাত্ম্য

সীতাকে লংকার রাজা রাবণ অপহরণ করে নিয়ে গেলে তাকে উদ্ধার করতে রাম,লক্ষণ,হনুমানসহ বিশাল বাহিনী লংকা আক্রমণ ও ধ্বংস করে। সীতাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেও পরবর্তীতে রামচন্দ্রের অযোধ্যা রাজ্যের প্রজারা সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সীতার চরিত্রের পবিত্রতা প্রমাণের জন্য রাম অগ্নিপরীক্ষার আয়োজন করেন। অগ্নিপরীক্ষার অংশ হিসাবে সীতাকে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করতে হয়। সীতা সতীসাধ্বী হলে আগুন তার কোনো ক্ষতি করবে না,এই ছিলো সবার বিশ্বাস। অগ্নি পরীক্ষার মাধ্যমে সীতার চরিত্রের পবিত্রতা প্রমাণ হলে রামচন্দ্র সীতাকে ঘরে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে আবারও সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন রাম সীতাকে আবারও বনবাসে পাঠান। সেখানে বাল্মিকী মুণির আশ্রমে সীতা আশ্রয় পান। এর কিছুদিন পরেই সীতার দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। লব ও কুশ নামের দুই পুত্র সন্তান বড় হওবার পরে রাম একবার শিকার করতে বনে গেলে রামের সাথে পুত্রদের দেখা হয়। তখন আবারও সীতার চরিত্র নিয়ে প্রজাদের নিন্দা শুরু হয়। এতে লজ্জা ও ক্ষোভে সীতা পাতালে প্রবেশ করেন। এরপর থেকে কোনও মা-বাবাই তাদের মেয়ের নাম সীতা রাখেন না।

মেটাফিকশন-৩ বুদ্ধিজীবীচরিত

প্রথম অধ্যায়
আমেরিকা ও আমেরিকা জাতি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বৈচিত্র্যমণ্ডিত বহুজাতিক সমাজব্যবস্থা। বহু দেশ থেকে বিভিন্ন জাতির মানুষের অভিনিবেশের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি

বহুসংস্কৃতিবাদী দেশে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন বিশ্বের বৃহত্তম জাতীয় অর্থনীতি।

বলা হয়ে থাকে আমেরিকার আদিম অধিবাসীরা এশীয় বংশোদ্ভুত। মার্কিন যুক্তরাষ্
ট্রের মূল ভূখণ্ডে এরা কয়েক হাজার বছর ধরে বসবাস করছে। তবে নেটিভ

আমেরিকানদের জনসংখ্যা ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের পর থেকে মহামারী ও যুদ্ধবিগ্রহের প্রকোপে ব্যাপক হ্রাস পায়। প্রাথমিক পর্যায়ে আটলান্টিক মহাসাগর

তীরস্থ উত্তর আমেরিকার তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই এই উপনিবেশগুলি একটি স্বাধীনতার

ঘোষণাপত্র জারি করে। এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে উপনিবেশগুলি তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ঘোষণা করে এবং একটি সমবায় সংঘের প্রতিষ্ঠা করে।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে এই বিদ্রোহী রাজ্যগুলি গ্রেট ব্রিটেনকে পরাস্ত করে। এই যুদ্ধ ছিল ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসে প্রথম সফল ঔপনিবেশিক স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৭৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়া কনভেনশন বর্তমান মার্কিন সংবিধানটি গ্রহণ করে। পরের বছর এই সংবিধান সাক্ষরিত হলে যুক্তরাষ্ট্র একটি

শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার সহ একক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ১৭৯১ সালে সাক্ষরিত এবং দশটি সংবিধান সংশোধনী সম্বলিত বিল অফ রাইটস একাধিক মৌলিক

নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো ও রাশিয়ার থেকে জমি অধিগ্রহণ করে এবং টেক্সাস প্রজাতন্ত্র ও হাওয়াই প্রজাতন্ত্র অধিকার করে

নেয়। ১৮৬০-এর দশকে রাজ্যসমূহের অধিকার ও দাসপ্রথার বিস্তারকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ দক্ষিণাঞ্চল ও শিল্পোন্নত উত্তরাঞ্চলের বিবাদ এক গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়।

উত্তরাঞ্চলের বিজয়ের ফলে দেশের চিরস্থায়ী বিভাজন রোধ করা সম্ভব হয়। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা আইনত রদ করা হয়। ১৮৭০-এর দশকেই মার্কিন

অর্থনীতি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির শিরোপা পায়। স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সামরিক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা দান করে। দ্বিতীয়

বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দেশ প্রথম পরমানু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে। ঠান্ডা যুদ্ধের

শেষভাগে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র মহাশক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের দুই-পঞ্চমাংশ

খরচ করে এই দেশ। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

দ্বিতীয় অধ্যায়

প্রাচীন কাহিনী

আধুনিক আমেরিকা রাষ্ট্রের উত্তর-মধ্য অঞ্চল ও তৎসংলগ্ন কানাডার দক্ষিণান্ঞলে একদা বিচরণ করত এক মহাপরাক্রমশালী জাতি। বহু গোত্র উপগোত্রে বিভক্ত

সীউ নামের এই মহাজাতিটি ঐ অঞ্চলে বাস করত হাজার হাজার বছর ধরে। তারা ডাকোটা নামে বহুল পরিচিত। সীউ জাতি তিনটি গোত্র, যথা- সান্টী সীউ,

ইয়াঙ্কটন সীউ ও টেটন সীউ। তারা নিজেদের সম্মান করে যথাক্রমে ডাকোটা, নাকোটা ও লাকোটা নামে পরিচয় দেয়। তারা বিস্তৃত ছিল আধুনিক আমেরিকান

মানচিত্রে মিনোসেটা, উত্তর ও দক্ষিণ ডাকোটা, উইসকনসিন, আইওয়া, মিসৌরী, ওয়াওয়েমিং; কানাডার নেব্রাস্কা, ম্যানিটোবা ও সাস্কাচোয়ান অঙ্গরাজ্যে।

সান্টী সীউরা চারটি উপগোত্রে বিভক্ত- মিডিইকানতান, ওয়াপেতন, ওয়াহপেক্যু ও সিসেতান। সান্টীরা এই বিশাল সাম্রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে বাস করত এবং

তারা ছিল অরন্যচারী। উনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে সান্টীরা শ্বেতাঙ্গদের সাথে দুটো প্রতারণামূলক চুক্তির মাধ্যমে তাদের মোট ভুমির নয় দশমাংশ এলাকা

হারিয়ে ঢুকে যেতে হয় বাধ্য হয়।

মিনোসেটা নদীর পাড় ঘেষা সংকীর্ণ এক ভুখন্ডে। সেই চুক্তি দুটো ছিল ভুমির প্রকৃত মালিক আদিবাসীদের প্রতি সুপরিকল্পিত প্রতারণা। শ্বেতাঙ্গদের অন্তরে একটি চুক্তিই ছিল তা হল ভুমি দখল করা, এবং সে চুক্তি তারা পালন করতে যে কোন উপায় অবলম্বন করতে পিছ পা নয়। এই বিশাল ভুমির বিনিময়ে আমেরিকান সরকার সান্টীদের প্রতিবছর একটি ‘নির্দিষ্ট’ হারে টাকা দিত। ডাচরা আদিবাসীদের কাছে থেকে নিউ ইয়র্ক দ্বীপটি কিনেছিল কয়েকটি ছিপ ও চকমকি পাথরের বিনিময়ে। এথেকেই ভুমির মূল্য ও কেনাবেচার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এবং এই ধরনের বিক্রয়ে আদিবাসীরা বাধ্য হত। এই বিশাল ভুমি হারানোর কারনে বনচারী সান্টীরা হারাল তাদের বুনো চাল সংগ্রহের, মহিষ শিকারের অন্ঞল। তাদের জীবিকা অর্জনের পথ অনেকটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়ল। তাই প্রায়ই তাদের ট্রেডারদের কাছে তেথেকে ধারে খাবার ও দরকারী পণ্য কিনতে হত। যখন টাকা আসত ট্রেডাররা সরকারের কাছে থেকে আগেই তাদের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে নিত। আর ট্রেডারদের হিসাবে টাকা সবসময়ই আদিবাসীদের হিসাবের চেয়ে বেশি হত। এক্ষেত্রে আদিবাসীদের কথা সরকার মানত না, তারা মানত শ্বেতাঙ্গ ট্রেডারদের কথা। এভাবেই সান্টীরা প্রতিবছর প্রতারিত হতে লাগল। ১৯৬২ সালে যখন আমেরিকার গৃহযুদ্ধ চলছিল তখন তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ আসতে দেরী হচ্ছিল। আর সান্টীরা ছিল উপবাসী এবং ক্ষুধার্থ। সান্টীদের মহানেতা লিটল ক্রো তার লোকজন নিয়ে গেলেন ইন্ডিয়ান এজেন্সিতে। সেখানে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হল। ট্রেডার এন্ড্রু মাইরিক বলল,তারা যদি এতই ক্ষুধার্থ হয় তবে হয় তারা খড়কুটো খাক অথবা নিজেদের মলমুত্রই খাক।
এটা ছিল সান্টীদের প্রতি চরম অপমান। সান্টীরা সর্বদা চুক্তি মেনে চলত। কিন্তু শ্বেতাঙ্গরা প্রায়ই চুক্তি ভঙ্গ করছিল। লিটল ক্রো অনুভব করলেন তিনি যেন সব হারাচ্ছেন। এর মাঝে একদিন একটি দূর্ঘটনা ঘটে যায়। চারজন ক্ষুধার্থ সান্টী যুবক ডিম সংক্রান্ত ঘটনায় অহেতুক পাচঁজন শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ডের

পর কোন সান্টী আর অনিরাপদ নয়, কারন তারা জানে শ্বেতাঙ্গরা দু একজনের অপরাধে সবাইকে পাইকারী ভাবে শাস্তি দেয়। তাই এখন যুদ্ধ অপরিহার্য। তারা যদি

আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেয় তবে শ্বেতাঙ্গরা সবাইকে খুন করবে। সবাই লিটল ক্রোকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে।

১৮৬২ সালের ১৮ই আগস্ট তারা এজেন্সী আক্রমণের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করে। তারা সেই বণিক মাইরিককে হত্যা করে তার মুখে ঘাস গুজে দিয়ে প্রতিশোধ নেয়।
২২ আগস্ট মিনেসোটার ফেয়ারফ্যাক্স-এর ফোর্ট রিজলি আক্রমণের করে। তারা দূর্গ দখল করতে ব্যার্থ হয়। এর কয়েক দিন পর লং ট্রেডার হেনরী শিবলীর

রেজিমেন্ট এসে দূর্গে যোগ দেয়। সান্টীদের সাথে শিবলীর পূর্বেই পরিচিতি ছিল একজন প্রতারক হিসেবে। সান্টীদের টাকা মেরে দেয়ার পেছনে এই লোকটির

ভূমিকা ছিল সবচে’ বেশি। এর পর সান্টীদের আর শান্তিতে ফিরে যাবার পথ ছিল না। বিজয়ী ইতিহাস এই যুদ্ধকে একটি সন্ত্রাসী হামলা বলে দাড় করিয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধটি ছিল দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটি জাতির আত্মরক্ষার সর্বশেষ প্রচেষ্টা।

এরপর বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ চলতে থাকে। এই যুদ্ধে ওয়াবাসা নামে এক সান্টী নেতা শিবলীল সাথে আপোষ করে। ওয়াবাসা বীর ও গুরুব্তপূর্ণ যোদ্ধা ছিলেন। পরাজয়

মেনে নিয়ে সান্টীরা আত্মসমর্পণ করে এবং বন্দীদের ফিরিয়ে দেয়। লিটল ক্রো বুঝতে পারেন কারো বিশ্বাস ঘাতকাতা এই যুদ্ধে পরাজয় অসম্ভব। ২০০০ হাজার

সান্টীকে বন্দী করা হয়। তারাপর শুরু হয় বিচার, সোজা বাংলায় যাকে বলা যায় প্রহসন। তাদের পক্ষে কোন কৌসুলি নিয়োগ দেওয়া হয় নি। প্রথম ব্যক্তিটির

বিচারের মাধ্যমে বোঝা যায় প্রহসনের মাত্রা। গডফ্রে নামক একজনকে শুধু এই কারনে মৃত্যূদন্ড দেয়া হয় যে কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা নাকি তাকে বলতে শুনেছে

যে সে নাকি সাতজন শ্বোতঙ্গকে হত্যা করেছে। কোন প্রমাণের ধার ধারা হয় নি। ৫ নভেম্বর বিচার শেষ হয়। বিচারে ৩০৩ জনের মৃত্যূদন্ড হয়। আর বাকী ১৭০০

মানুষকে আটাকে রাখা হল শুধু এই অপরাধে যে তারা জন্মেছে আদিবাসী হয়ে, যাদেরকে তারা নাম দিয়েছে রেড ইন্ডিয়ান। এরা যদি মানুষ না হয়ে পশুও হয় তবু

তাদের জীবননাশেরে দ্বায়িত্ব শিবলী একা বহন করতে রাজী নয়। তাই সে নথিপত্র চালান করে দিল নর্থ ওয়েস্ট মিলিটারী ডিপার্টমেন্টের কমান্ডার জেনারেল জন

পোপের ঘাড়ে। জন পোপ সেটা চালান করে দিলেন খোদ রাষ্ট্রপতি লিংকনের কাছে। এখানে প্রেসিডেন্ট তার উন্নত বিচার বিবেকের পরিচয় দিলেন। তিনি বিচারের

সকল নথি-পত্র চেয়ে দুজন আইনজীবি নিয়োগ করলেন। ৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত রায় এল। ৩০৩ জন হতে মৃত্যূদন্ডাদেশ প্রাপ্তের সংখ্যা কমে এল ৩৯ জনে। পরবতীতে

আরও একজনের মৃত্যূদন্ডাদেশ রহিত হয়।

যিশু খ্রীস্টের জন্মদিনের অর্থাৎ বড়দিনের ঠিক পরদিন ২৬ ডিসেম্বর ধার্য কার হয় ফাঁশি দিন। ফাঁশির স্থান ছিল মানকাতা শহড়ে। প্রতিহিংসা পরায়ন, বিকৃতমনা

বিনোদনপিয়াসী শ্বেতাঙ্গরা হাজির হল প্রকাশ্য ফাঁশি দেখতে। গলায় ফাঁশ পরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত সীউদের কন্ঠে ছিল মরণ সঙ্গীত। সৌভাগ্যবশত আব্রাহাম

লিংকনের হস্তক্ষেপ না পরলে ঝুলে থাকা সান্টী সীউদের সংখ্যা হত আরও প্রায় ৩০০ বেশি। এটা আমেরিকার ইতিহাসে সবচে’ বড় গণফাঁশি। ফাঁশি কয়েক ঘন্টা

পর আবিষ্কার কারা হল যে যাদের ফাঁশি দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে দুজনের নাম লিংকনের পাঠানো তালিকায় ছিল না। আজ পৃথিবীর ইতিহাসের এই কলঙ্কিত

ঘটনার ১৪৭তম বার্ষিকী। কিন্তু বেমালুম চেপে গেছে পৃথিবী তার এই কলঙ্কিত ইতিহাস।

এই যুদ্ধটি আমেরিকাকে দারুন একটি সুযোগ এনে দেয় বিনা পয়সায় আরেকটি বিশাল ভূমি ‘কিনে’ নেয়ার। যারা বেচে গেল তারা কি আসলেই বেচে গেল? তারা

বেচে রইল শুধু অনুশোচনা করার জন্য আর ধুকে ধুকে মরার জন্য। বেচে যাওয়া বেশির ভাগকে দীর্ঘমেয়াদী কারদন্ড দেয়া হল। আমেরিকার আদিবাসীদের

ইতিহাস যার সমাপ্তি ঘটেছিল ১৮৯০ সালে সেই দীর্ঘ বেদনাময় ইতিহাস পড়লে আমরা পরিচিত হব সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসের আরও বেশ কয়েকজন শ্রেষ্ট

মানুষের সাথে যাদের শ্বেতাঙ্গরা মানুষ বলে বিবেচনা করে নি। আমরা জানব যে তারা মানবতায়, প্রজ্ঞায়, শিক্ষায়, ন্যায় পরায়নতায়, মহানুভবতায় ছিলেন শ্রেষ্ঠজন,

স্বজাতির প্রতি দ্বায়িত্ব ও মমতায় অতুলনী, তারা সত্যিকারের নেতা। যে বিশাল ভূখন্ড একাদা পরমেশ্বর তাদের দিয়েছিলেন অকাতরে তাদের হৃদয় ছিল তার চেয়ে

বড়! কি পরম মমতায় তারা নিজ জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে প্রাণ দিয়েছেন! আমরা তাদের ভুলে গেছি। ভুলে গেছি তাদের সংগ্রামের কথা। তাদের

মৃত্যূদিবসেও তাদের স্মরণ করতে আমরা কৃপণ।

তৃতীয় অধ্যায়

জন্ম ও বাল্য ও যৌবনকাল

বাংলাদেশ নামক এক বদ্বীপে জন্ম নিল এক ছেলে। পাঠক বিশ্বাস করেন এই চরিত্রটি এমনই। আপনার বিরক্তি লাগলে আমার কিছু করার নাই। স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জ্ঞানের মহিমা ছিল আকাশ সমান। স্কুলে থাকতেই শিক্ষকেরা বুঝতে পারল এ ছেলে অনেক বড় হবে। কলেজে থাকতে যোগ দিল বাম সংগঠনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে অনেক বড় বাম নেতা এবং পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেনীর শিক্ষক অবশ্য তাকে পছন্দ করত। সেই জায়গা থেকেই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলও বেশ ভাল হল।

চতুর্থ অধ্যায়
সংসার ধর্ম

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষকেরাই লুকিয়ে বিয়ে দিয়ে দিল সেই ছেলেকে। হঠাত একদিন জানা গেল সেই বুদ্ধিজীবী ছেলে আর দেশে নাই। আমেরিকায় গিয়েছে মার্কসীয় অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা করতে।

পঞ্চম অধ্যায়
নবজীবন লাভ

অনেকদিন পর সে বাংলাদেশে ফিরল। এটা জানা গেল তার বাংলাদেশের বিখ্যাত বিখ্যাত পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত কলাম দেখে। সেখানে লিখেই সে হৈচৈ ফেলে দিল। সমস্ত জীবন বিপ্লবীরা দিয়ে দেবার পরও যে কথা বলার সাহস পান না, তার চেয়েও অনেক র‍্যাডিক্যাল কথাবার্তা ছাপাতে শুরু করল এই বুদ্ধিজীবী। লোকজন তার লেখায় রীতিমত বিস্মিত।

ষষ্ঠ অধ্যায়
প্রচার ও অত্যাচার

সবাই সন্দেহ করা শুরু করল কে এই বুদ্ধিজীবী। এতদিন তো তার নাম শুনি নি। এত বড় বড় র‍্যাডিকেল কথাবার্তা সে কিভাবে বলে। নানা রাজনৈতিক দল নানা খোঁজখবর নেওয়া শুরু করল। অনেকে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিল। অনেকে তার অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করল। স্থানীয় প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীরা মিডিয়াগুলোতে প্রভাব তৈরি করতে লাগল। বলা হল তার লেখা যেন না ছাপা হয়। আমরা তার অতীত ইতিহাস জানি। বাংলাদেশের বিখ্যাত পত্রিকাগুলো তার লেখা ছাপানো বন্ধ করে দিল।

সপ্তম অধ্যায়
সংগ্রাম

বুদ্ধিজীবীটি বুঝতে পারল এই ভাবে লড়া যাবে না। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী এনজিও এর জায়াগায় কারা, সে অনুযায়ী সে মিশনারী এনজিওগুলোর দিকে ঝুকে গেল। তারপর সে বুঝতে পারল জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় কথা বলা বা নিজের মত প্রকাশের জন্য নিজেদেরই মিডিয়া দরকার। সে নিজেই মিডিয়া তৈরি করল।

অষ্টম অধ্যায়
ব্রত উদযাপন

অনেক তরুণ ও দেশ জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক- কলেজ শিক্ষক-চিন্তা করতে চায় এরকম মানুষেরা তার দিকে ভিড়তে লাগল। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে সে যেভাবে কথা বলছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে এটা সত্যিই প্রশংসনীয়। সবাই তার প্রশংসাই করতে লাগল। নানা জায়গায় তাকে নিয়ে নানা রকমের প্রশংসার আড্ডা শুরু হয়ে গেল।

নবম অধ্যায়
বুদ্ধিজীবীর চিন্তার বিস্তার

ধীরে ধীরে তার চিন্তা সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সমস্ত দেশের অনেক চিন্তক, অনেক লেখক, কলেজ – বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার মত করে কথা বলতে লাগল। সবাই তার মত বুদ্ধিজীবী হতে লাগল। সবাই সেই বুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠল।

মেটা ফিকশন-৪: নারীবিজয়

অধ্যায় ১
নারীজাতি

নারীরা চার জাতের। পদ্মিনী চিত্রিণী আর শঙ্খিনী হস্তিনী। পদ্মিনীদের নয়নকমল থাকে। থাকে কুঞ্চিত কুন্তল। তাদের কুচস্থল থাকে ঘন আর মৃদু হাসিনী। পদ্মিনী

জাতের নারীদের নাসারন্ধ্র ক্ষুদ্র থাকে। তাদের ভাষা হয় মৃদু মন্দ। এরা যে কোনও নৃত্য গীতে আশায় সত্যবাদিনী। এবং এই নারীদের ভক্তি থাকে দেবদ্বিজে, পতি

অনুরক্ত, তবে অল্প রতিভক্ত। এরা নিদ্রাভোগিনী।শরীর সুললিত। এ
ই নারীরাই পদ্মিনী।।

চিত্রিণীদের থাকেপ্রমাণ শরীর। স্থিরচিত্তের অধিকারী। এদের নাভি অতি সুগভীর হয়। এরাও মৃদুহাসিনী। এদের স্তন সুকঠিন চিকুর চিকণ। আর শয়ন ভোজনে

মধ্যচারিনী। এদের কণ্ঠ বিভূষিত, শরীর কমনীয় ও এদের অল্প লোম হয়।

শঙ্খিনীদের দীঘল শ্রবণ, দীঘল নয়ন, দীঘল চরণ, দীঘল পাণি। এদের শরীরও সুদীঘল। এদেরও অল্প লোম হয়।

হস্তিনীরা স্থূল কলেবর, স্থূল পয়োধর, স্থূল পদকর। এরা প্রচুর আহার করে। নিদ্রা ঘোরতর এবং বিহারে প্রখর পরগামিনী। এদের ধর্ম্মে ভয় নাই। দন্ত ঘোরতর

এবং কর্ম্মেতে তৎপর মিথ্যাবাদিনী। এদের বহু লোম হয় ও শরীর সুপ্রশস্ত।

অধ্যায় ২
পুরুষ জাতি

নায়ক পুরুষ অষ্ট রকমের। উৎকণ্ঠিত নায়ক, অভিসারক নায়ক, বিপ্রলব্ধ নায়ক, স্বাধীনভার্য্যা নায়ক, খণ্ডিত নায়ক, কলহান্তরিত নায়ক, প্রোষিতভার্য্যা নায়ক,

প্রোষিতপত্নী নায়ক। উৎকণ্ঠিত পুরুষেরা বিরহে কাতর থাকে। ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না। অভিসারক পুরুষেরা দ্বিতীয় প্রহর রাতে নারীর দেখা পায় এবং আশা

ফলে। বিপ্রলব্ধ নায়কেরা সুখের সময় ঘরে থাকে। নিজের ভিতরে নানা রস খুঁজে পায়। গুরুদের প্রতি ভয় কম থাকে আর অন্ধকারকে ভয় পায় না।
স্বাধীনভার্য্যা নায়ক পুরুষেরা যে কোনও সময় যে কোনও স্থানে সাথে থাকা নারীকে মোহন ফাঁদে ফেলে এবং সেই নারীকেই সে সময় সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে।
খণ্ডিত পুরুষদের নারী কথা দিয়ে অন্য পুরুষেরা সাথে চলে যায়। এরা এই অভিমানে নারীকে ছেড়ে চলে যায়। কলহান্তরিত নায়ক পুরুষেরা সামান্য অপরাধেই

নারীকে ত্যাগ করে এবং এই অপরাধে ভুগে। প্রোষিতভার্য্যা পুরুষেরা নিরন্তর কামজ্বালা সয়ে যায়। না পেয়ে অবশেষে উদাসীন হয়। প্রোষিতপত্নী পুরুষেরা নারী

চলে যেতে চাইলে অভিশাপ ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে।

অধ্যায় ৩

করিমকে আমরা বলতাম নারীমোহন, রমণ রসিক, গুরু আরও কত কি যে। পাঠক এই চরিত্রটিকে আপনিও দেখেছেন। আপনার পাশেই হয়ত এই চরিত্রটি বসে আছে। করিম নারী পটাতে ওস্তাদ ছিল। ও সারা জীবনে এত নারী পটিয়েছে যে আমরা রীতিমত ওকে ওস্তাদ মেনে নিতাম। ও চ্যালেঞ্জ করে করে প্রেম নিবেদন করত আর ও যে সফল সেটা আমাদের দেখিয়ে বেড়াত। একদিন আমরা বললাম ফার্স্ট ইয়ারে একটা নতুন মেয়ে এসেছে। খুবই সুন্দর। এটা তুই কিছেতেই পটাতে পারবি না। সে ওপেন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিল। শুধু চ্যালেঞ্জই নয়, সে বলে দিল এই মেয়েকে সে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবে এবং যৌনকাজ করবে। আমরা তার চ্যালেঞ্জ নেওয়া দেখে রীতিমত বিস্শিত হয়ে গেলাম। এক মাসের মাথায় করিম সেই মেয়েকে নিয়ে আমাদের ব্যাচেলর বাসা এল। ঠিক এই ঘটনা নয় আরও কত বার কত নারী যে সে বিজয করেছে তার গুনে শেষ করা যাবে না। আমরা তার কাছ থেকে শেষমেষ পরাজয় মেনে নিলাম। এবং গুরু হিসেবে তার কাছ থেকে তালিম নেওয়া শুরু করলাম। সে নানাভাবে আমাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা নেওয়া শুরু করল, তালিম শেখানোর কতা বলে। ও আমাদের শেখালোও। ওর একটিই কথা- মেয়েরা যতই যা বলুক না কেন, সন্ত্রাস-ক্ষমতা- অত্যাচার ইত্যাদি মেয়েরা পছন্দ করে। মাটি কর্ষিতই হতে চায়। এছাড়া ফলন ফলবে না যে। জাস্ট তোরা তোদের ক্ষমতার কথা বলবি। টাকা-পয়সা, হেন আছে তেন আছে , হেন করেছিস, তেন করেছিস আর সব সময় মেয়েদের খাওয়াবি; দেখবি মেয়েরা তোর পেছন পেছন ঘুরতে শুরু করবে।

অধ্যায় ৪

এই কৌশলে আমি কাউকে না জানিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে একটি মেয়ের পেছনে লেগে গেলাম। সব কিছুতেই আমার সেই ক্ষমতাশীল- প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল চেহারাটা দেখানো শুরু করলাম। তার পেছনে এক সপ্তাহেই কয়েক হাজার টাকা খরচ করে ফেললাম। একদিন আমি তার হাত ধরে বললাম- তোমাকে চাই। মেয়েটি রাজি হয়ে গেল।

মেটা ফিকশন-৫: লক্ষ্মীর পাঁচালী

অধ্যায় ১

লক্ষ্মী নামটা শুনলেই মনে হয অনেক লক্ষ্মী লক্ষ্মী মেয়ে। পাঠকেরও নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে গল্পকার যেহেতু লক্ষ্মী নাম রেখেছে এই চরিত্রের, এই মেয়ে লক্ষ্মী হবেই। আসলেই তাই মেয়েটি অনেক লক্ষ্মীই বটে। এমন গুণবতী মেয়ে আজকাল দেখা যায় না বলাই চলে। এই মেয়েটিই অনেক বড় হয়েছে মানে বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে। আর সেই কারণেই লক্ষ্মীদের বাসায় এখন অনেক লোকই আসে সম্বন্ধ করতে।

অধ্যায় ২
এমন লক্ষ্মী মেয়েকে কার না পছন্দ হয়। তবু লক্ষ্মীর বিয়ে হয় না। বিয়ে হয় না মানে লক্ষ্মীরই পছন্দ হয় না। আগের দিনে মেয়েদের পছন্দ বলে কোনও বিষয় ছিল না। লোকজন আসত। মেয়ে দেখে শুধু পছন্দ হলেই নয়, যৌতুক, দেনা-পাওনা ইত্যাদি ইত্যাদি যদি মিলে যেত, তবেই মেয়ের বিয়ে হত। আজকাল দেনা পাওনা, যৌতুক এসব যে একেবারে নেই তা নয়, তবে মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের একটা বিষয় এখন মা-বাবারাই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। শুধু মা-বাবা নন, পরিবারেরঅন্যান্য বয়্যজ্যেষ্ঠরাও মেয়ের এই ধরণের মতামতে আপত্তি করেন না।

অধ্যায় ৩

একাবার লক্ষ্মীকে দেখতে আসল এক ছেলে। ছেলে ভালই। পড়াশুনা আছে বেশ। ভাল চাকরি করে। লক্ষ্মীর সাথে মানাবেও। কিন্তু ছেলে পক্ষ মেয়ে দেখে যাবার পর বাধ সাধল মেয়ে। মানে মেয়ে এই বিয়ে করবে না। কারণ এই ছেলে ন্যাকা ন্যাকা করে কথা বলে। কি অদ্ভুত একটা ছেলে ন্যাকা ন্যাকা করে কথা ভলবে বলেইমেয়ে সেই ছেলেটিকে বিয়ে করবে না। আর সবই তো ভাল। পরিবারও ভাল। কিন্তু মেয়ে যখন রাজি নয়, তখন আর কি করার। বাড়ির কেউই এগুল না মানে এগুতে সাহস পেল না।

অধ্যায় ৪

৬-৭ মাস পর আরও একটি সম্বন্ধ আসল। ছেলেটির পরিবারের সবাইকে দেখে মনে হল অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের তারা। আসলেই অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের,অনেক আগেকার দিনের ধনী। সেই পরিবার এসেছে লক্ষ্মীদের বাসায়। লক্ষ্মীর মা-বাবা অস্থির হয়ে গেল এই পরিবারের সেবা শ্মশ্রুসায়। এই ঘরে মেয়ে যাবে।ছেলেও ডাক্তার। এরকম ঘর আর পাওয়া যাবে না। মা-বাবা তো একবাক্যে রাজি। কিন্তু রাজি হল না লক্ষ্মী। কারণ ছেলের হাসি নাকি হুতুম পেঁচাদের মত। বাড়ির সবার হাসাহাসি। এরকম ঘরে মেয়ে যাবে, সুখে-শান্তিতে থাকবে। ছেলের হাসি হুতুম পেঁচার মত হলে লক্ষ্মীর সমস্যা কি। কিন্তু লক্ষ্মী বলে কথা। মেয়ে বলেছেপছন্দ হয় নি, তো সম্বন্ধ করা যাবে না মানে ফেরত। মা-বাবা এবার একটু বিচলিতই হলেন।

অধ্যায় ৫

পাঠক আপনি ভাবছেন বোধহয় আমি ইচ্ছে করেই মেয়ে চরিত্রটিকে এমন করে লিখছি, আসলে তা নয়। এই মেয়ের মত আপনার আশাপাশেও হুবুহু না হলেও এইটাইপের চরিত্র আছে। বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিয়ে একটু বলুন না, আমি ভুল লিখছি না সঠিক লিখছি। যাই হোক ৬-৭ মাস পর আরেকটি সম্বন্ধ আসল। এদিকেমেয়ের বয়স কিন্তু বাড়ছেই। তবে মা-বাবা এখন অবশ্য মেয়ের বয়স নিয়ে চিন্তা করেন না। যুগ পাল্টিয়েছে। মেয়ে লেখা-পড়া করে। প্রয়োজনে নিজেই বর খুঁজেনিয়ে বিয়ে করে ফেলবে। এ নিয়ে মা-বাবার এত টেনশন নেই। তবে দেখে-শুনে বিয়ে দিলেই ভাল বলে মা-বাবা পাত্র খুঁজছেন। তো এবারের সম্বন্ধটা তেমন ভালনা। মানে ছেলে চাকরি-বাকরি করে না, নিজেদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান রয়েছে। খুব একটা ধনীও না, আবার গরীবও বলা যায় না। মানে একটা মেয়ে এই পরিবারেথেকে খেয়ে জীবন পার করে দিতে পারবে। তো ছেলে পক্ষ দেখে-শুনে চলে গেল। পরে জানাল মেয়ে পছন্দ হয়েছে কিন্তু যৌতুকের টাকা দিতে হবে অনেক। যৌতুক দিয়ে বিয়ে করা, না মুখের ওপর না করে দিল মেয়ে। মানে এটাও বাদ। পাঠক আমি কিন্তু এই সম্বন্ধকেও ইচ্ছে করে বাদ দেই নি।

অধ্যায় ৬

এরপর দীর্ঘদিন হয়ে গেল মেয়ের বাসায় কোনও সম্বন্ধ আসে না। এদিকে মেয়ের বয়স বাড়ছে তো বাড়ছেই। মেয়েও কিছু বলে না, মানে পছন্দের কেউ আছেকিনা এই জাতীয়। কি বলবে আসলেই পছন্দের কেউ নেই। এবার কিন্তু মেয়ের মা-বাবা অনেক টেনশনে। মেয়ের মা-বাবা নিজেরাই পাত্র খুঁজতে লাগলেন। পেরেওবটে। তবে আগেকার কোনও সম্বন্ধের মত নয়। এই ছেলের বয়স একটু বেশি। চাকরি-বাকরি করে। বেসরকারি কোনও সংস্থায় হয়ত। অনেক টাকা-পয়সা আছেবোঝা যায়। ছেলেও অনেক শিক্ষিত। কিন্তু বিয়েটা করছে দেরিতে। তবে ছেলের চেহারাটা তেমন ভাল না। চেহারা দিয়ে কি করবে মেয়ে। মা-বাবা একপায়ে রাজি।

মেয়েকে এই বিয়ে করতেই হবে। মা-বাবা ভেবেছিল আগের সম্বন্ধগুলো মেয়ে যে কারণে বারণ কারছে, এবার তো এই ছেলের ভিতরে সেসব কারণ তো আছেই, আরও বেশি করে আছে। মেয়ে নিশ্চিত রাজি হবে না। কিন্তু জোর করে হরেও মেয়ের বিয়ে দিতে হবে এবার। এবার আর কোনও ছাড় নেই। মেয়েরও অমত নেই। মা-বাবা একটু বিস্মিত হলেন বৈকি। কিন্তু কথা বাড়ালেন না। লেখক হিসেবে মেয়ের এই আচরণে আমিও বিস্মিত হয়েছি বৈকি। তবে মেয়ের মর্জি আর মা-বাবার মর্জি যেখানে এক হয়ে যায়, সেখানে আগ বাড়িয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। কিন্তু আমার মনে হল, মেয়েটি সংসারে টিকবে না। মানে কিছুদিন সংসার করেমা-বাবার বাড়িতে ফেরত আসবে। এরকম বিদঘুটে টাইপের একটা ছেলেকে শেষ পর্যন্ত মেয়েটি বিয়ে করল। কিন্তু আমাদেরও চিন্তার বাইরে এসব। লক্ষ্মী তোআসলেই লক্ষ্মী। শ্বশুর বাড়ির সবার মন জয় করল মেয়ে। শুধু শ্বশুর বাড়ির মানুষ নয়, শুনেছি ওর বর সম্পর্কেও নাকি ও মন্তব্য করত- তার মত নাকি মানুষ হয়

মেটা ফিকশন-৬: রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনী

অধ্যায়-১

একদিন গভীর রাতে করিম একটি বাস স্ট্যান্ডে নেমেই দেখতে পেল বাস স্ট্যান্ডটির একটি কোনায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে কাঁদছে। এত রাতে বাস স্ট্যান্ডে তেমন মানুষ জন নাই, একা একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে কাঁদতে দেখে প্রথমে তার মেয়েটির কাছে যেতে ইচ্ছে হলেও পরে ভয়ে পিছিয়ে আসল। ভয়টা তেমন কিছু না। মানে বাস স্ট্যান্ডে একা একা জিন-পরীরাই থাকে, এই জাতীয় পূর্ব ধারণাই তাকে ভয়ের ভেতরে ফেলে দেয়। কিন্তু সে এই ঘটনায় এড়িয়েও যেতে পারছে না। এত রাতে একটি মেয়ে কাঁদছে, লোকজন তেমন নাই, যারাও আছে, তারাও কেউ এই ঘটনায় এগিয়ে যাচ্ছে না। আমার কাছে মনে হল মানে গল্পকারের কাছে মনে হলকরিমের যাওয়াই উচিত। মানে আমি নিয়ে গেলাম বিষয়টা এরকম নয়, করিমই মেয়েটির কাছে গেল। তারপর যা ঘটল, তাতে আমার বিন্দুমাত্র হাত ছিল না। মানে গল্পকার হিসেবে আমারও ধারণা ছিল না যে রাতে অনেক বাস স্ট্যান্ডে মেয়েরা এরকম কান্নার অভিনয় করে ছিনকাইয়ের মত কাজ করে। করিম দেশের বাড়ি থেকে এই মাত্র ঢাকায় ফিরেছে মানে বাস স্ট্যান্ডে নেমেছে। এর মধ্যে এরকম একটি ঘটনা ঘটবে কে জানত। আবার একমও নয় যে করিমের ঢাকায় কোনওআত্মীয়-স্বজন আছে, ছিনতাইকারীরার তাকে সর্বস্বান্ত করলেও তাতে করিম খুব একটা সমস্যায় পড়বে না। কিন্তু ঘটনা যেটা ঘটল, করিম সর্বস্বান্ত হল। মেয়েটিরকাছে যেতেই কয়েকজন ছেলে তাকে ঘিরে ধরল। বলল- কোনও কথা না বাড়িয়ে সব কিছু দিয়ে চলে যেতে। তা না হলে এই রাতে এখানেই মরে পড়ে থাকতে হবে। এত রাতে কেউ তাকে বাঁচাতেও আসবে না। আর এখানে যারা আছে, সবাই তাদেরই লোক। চিল্লাচিল্লি করলেও কাজ হবে না। আমার অবশ্য একবার মায়াও হল। ভাবলাম বেচারা করিমের ঘারে এরকম একটা ঘটনা কি না ঘটালেই নয়। কিন্তু গল্প কি আর গল্পকারের কথা মানে। মানে করিম সর্বস্বান্তই হল। যা নিয়ে এসেছিল, এমন কি ঢাকায় এসে করিম যার বাড়িতে গিয়ে ওঠবে, সেই টাকাটাও নিয়ে নিল। এত দূর হেঁটে হেঁটে এখন করিম কিভাবে সেই বাসায় যাবে, আর বাসে ঢাকায় চরে গেলেই হয়, জায়গা চিনতে হয় না। কিন্তু এখন তো করিমের হাঁটতে হবে। হেঁটে হেঁটে চিনে করিম কি আর সেই বাড়িতে যেতে পারবে? আসলেই পারবে না ।

অধ্যায়-২

করিম আসলেই পারল না। মানে হাঁটতে হাঁটতে করিম সাভার বাস স্ট্যান্ডের মানে কাঁচাবাজারের পাশের একটি রাস্তা ধরে চলে এসেছে রাজা হরিশ্চন্দ্রের ঢিবিতে।

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে করিম ঢিবিটির এক পাশে গিয়ে বসল। হঠাত সে দেখতে পেল একজন লোক এত রাতে ঢিবির পাশ দিয়ে হাঁটছে। তার শরীরের পোশাক

থেকে এত ঘন কালো রাতের নানান রঙ ঝলমল করছিল। করিম একটু ভয় ও সংকোচের সাথেই তার কাছে গেল। যাওয়া ছাড়া আর উপায়ও ছিল না করিমের।

কারণ এত রাতে কোনও মানুষ খুঁজে পাচ্ছিল না করিম। আর কোথায় যাবে, কিভাবে যাবে, কি করবে এই জাতীয় প্রসঙ্গ কার সাথে আলাপ করবে সেই সিদ্ধান্তও

নিতে পারছিল না। করিম প্রথমে ভেবেছিল লোকটি দরবেশ টাইপের কেউ একজন হবে। এবং এই লোকটিই সত্যিকার অর্থে তাকে সাহায্য করতে পারবে। করিম

কি বলবে কি বলবে এরূপ ভাবতে ভাবতে লোকটিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল- আপনি যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। লোকটি

বলল- কর। করিম বলল- আপনি এত রাতে এখানে পায়চারি করছেন। আপনার ঘরবাড়ি নাই। লোকটি বলল- ঘরবাড়ি। সবই তো আমার ঘরবাড়ি। এটাও আমার ঘর। তুমি বোধহয় আমাকে চিনতে পার নি। আমি রাজা হরিশ্চন্দ্র। কি হয়েছে তোমার বলতে পার। আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। করিমের কাছ থেকে হরিশ্চন্দ্র সমস্ত কাহিনী শোনার পর বললেন এবার আমার কথা শুন।

ইন্দ্রের সভায় নাচার সময় তাল কেটে একবার এক নর্তকী অভিশাপ পেয়ে এলেন মর্ত্যে। মর্ত্যে এসে সে বিশ্বামিত্রের তপোবনে রোজ ডাল ভাঙত। তাই দেখে

একদিন মুণি ফাঁদ পেতে রাখলেন। যথারীতি পরের দিন এসে সেই নাচুনি ধরা পড়ল ফাঁদে। সেদিনই আবার আমি বনে শিকার আসি। মেয়েগুলো আটকে আছে

দেখে আমি ছেড়ে দেই। সকালে বিশ্বামিত্র এসে দেখেন হ্যাঁ, কেউ তো বাঁধা পড়েছিল তার ফাঁদে, কিন্তু কেউ একজন তা মুক্ত করে দিয়েছে। খবর নিয়ে তিনি

আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি বললাম, দেখুন মুণি, আমি তো রাজা, সবার ভালো করাই আমার কাজ-তাই ওই মেয়েটা মুক্তি চেয়েছে বলে আমি তাকে মুক্তি

দিয়েছি। আমি ত জানতাম না, সে যে আপনার শিকার। আমার তেমন দোষ নেই। মুণি বললেন, তোমার কাছে মুক্তি চাইল আর তুমি দিয়ে দিলে? আমি তোমার

কাছে যা চাইব তা তুমি দিবে?তখন আমি রাজি হই। মুণি তখন আমার কাছ থেকে রাজ্য চেয়ে বসেন। আমি আমার অযোধ্যা রাজ্য কিন্তু দিয়ে দিয়েছি। তাহলে

নিজেরই আর থাকার জায়গা নাই। সেই থেকে আমি এভাবে ঘুরে বেড়াই। তোমার আর আমার ঘটনার মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য নাই। পার্থক্য একটাই, আমি

মুণির ফাঁদে পড়েছিলাম আর তুমি ছিনতাইকারীদের ফাঁদে। তাতে কি। তোমার যদি কোনও আপত্তি না থাকে তো তুমি আমার সাথে থাকতে পার। সেই দিন থেকে

করিম হরিশ্চন্দ্রের সাথে থাকতে শুরু করল।

মেটা ফিকশন-৭: মহাপুরুষদের কথা

না গল্পকার, এভাবে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। কিছু একটা বলেন। আপনারা গল্পকাররাও যদি এভাবে চুপ মেরে বসে থাকেন তো এই রাত্রে মশার
কামড় খেয়ে খেয়ে কতক্ষণ টিকে থাকা যাবে বলেন তো?
আমি বললাম, ঠিক আছে। তবে বানিয়ে কোনও গল্প করতে পারব না। সত্য গল্প বলব।
তারা মাথা নাড়ালেন। পাঠক সত্য গল্পই কিন্তু বলছি।

গ্রীক ট্র্যাজেডির জনক কে বলুন তো?

একজন বলল- কে না জানে এইসকলাস।

আমি বললাম, হুম ঠিকই বলেছেন।

এবার শুনুন, এই বিশ্ব বিখ্যাদ এই গ্রীক ট্র্যাজেডির জনক কিভাবে মারা গেছেন।

একবার ঈগল পাখি কচ্ছপের খোলস ভাঙ্গার জন্য খোলসটি পাথরের উপর ফেলেছিল। কিন্তু ঈগল পাখি বুঝতে পারে নি এই পাথরটি আসলে এইসকলাসের টাক।

শেষমেষ কি আর হবে। ট্র্যাজেডি ত ট্র্যাজেডিই। কচ্ছপের খোলসের আঘাতে মারা পড়ল এইসকলাস।

হাসছেন যে, ঘটনাটা কিন্তু সত্যি পাঠক। আমি একদমই বানিয়ে কিছু বলছি না।

হেসে হেসে একজন বলল, আচ্ছা আরেকটা গল্প বলুন, বিশ্বাস করেছি।

আচ্ছা অর্গানিক মুড মুভমেন্টের একজন প্রধান উদ্যোক্তার গল্প বলছি, শুনুন। জেরোমি আরভিং রোডেইল ছিলেন অর্গানিক মুড মুভমেন্টের একজন প্রধান উদ্যোক্তা। একবার তিনি একটি টিভি শোতে অর্গানিক ফুড মুভমেন্টের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলছিলেন। এ সময় তিনি ঘোষণা দেন তিনি কমপক্ষে ১০০ বছর বাঁচবেন। কিন্তু এই টিভি শো চলাকালীন সময়েই হার্ট আ্যাটাকে মারা যান।

এবারও হাসছেন আপনারা। কি আশ্চর্য, সত্যি গল্প এটা। বিশ্বাস না হয় কাউকে জিজ্ঞেস করুন অথবা খোঁজ নিয়ে দেখুন না। আমি ইচ্ছা করে আর্গানিক ফুড মুভমেন্টের সমালোচনা করার জন্য এটা বলি নি। পাঠক, আপনারাও বোধহয় আমাকে সন্দেহ করছেন। আচ্ছা সন্দেহ করছেন করুন, কিন্তু সন্দেহটা দূর করার জন্য যা যা চেক করা দরকার সেটাও করুন।

ষ্টেশনে বসে থাকা একজন বলল, না না হতে পারে। আপনি আরেকটি গল্প বলুন।

আমি বললাম, হতে পারে মানে। হয়েছে। এটা সত্যি। কিন্তু আপনাদের মনে হচ্ছে, শুধুমাত্র গল্প করার জন্য আমি এটা বলিছি। যাই ভাবুন, আমার কিছু করার নেই ভাই। আমি গল্পকার বলেই যে সবকিছু ইনিয়ে বিনিয়ে বলব, তা কিন্তু ভাবা ঠিক নয়। আমি অনেক সময় সত্যি গল্পও বলি। আচ্ছা আরেকটা গল্প শুনুন।

একজন কবির মৃত্যু কিভাবে হয়, বলুন তো। মানুষ সাধারণত যেভাবে মরে সেভাবেই তো, তাই না? কিন্তু আমি একজন কবির কথা জানি, উনার মৃত্যু হয়েছিল কাব্যিকভাবে।

একজন বলল, কাব্যিকভাবে? মানে?

আমি বললাম, বিশ্বাস হচ্ছে না। আসলেই কাব্যিকভাবে। তাহলে শুনুন।

চীনের একজন কবির নাম লি পো। তিনি একদিন অতিরিক্ত মদ্যপান করে রাতের বেলা নৌকায় ঘুরতে বের হন। নদীর পানিতে চাঁদের ঝলমল চেহারা দেখে তার চাঁদ ধরার ইচ্ছা হয় খুব। তখনই চাঁদ ধরতে গিয়ে তিনি নদীর পানিতে ঝাপ দেন এবং সেখানেই ডুবে মরেন।

মেটা ফিকশন-৮: সাংবাদিকের পুঁথি

এক দেশে ছিল এক সাংবাদিক। তার ছিল একটি কলম। সাংবাদিকটির ছিল প্রচুর টাকা-পয়সা। কিন্তু সারাক্ষণ সে মন খারাপ করে বসে থাকত। পাঠক, এই গল্পটি পড়ুন। ভাল লাগতে পারে। সাংবাদিকদের চরিত্র কিন্তু অনেক রোমাঞ্চকর আর নানা অভিজ্ঞতায় ভরপুর। তার কলমের ছিল অনেক জোর। কলমের এক খোঁচায় সে অনেক কিছু করে ফেলার ক্ষমতা রাখত। এজন্য সংবাদ পত্রের অফিসে তার নাম-ডাক যেমন ছিল, তেমনি ছিল তাকে দেখামাত্র অনেকের ভয়ে জুবুথুবু হওয়ার খবরও। আরও একটি খবর তার সম্পর্কে শোনা যেত, তবে এটা ভেতরে ভেতরে অনেকেই আলাপ করত, কেউ সবার সামনে এসব আলাপ করতে ভয় পেত, তা ছিল উনি অনেক মিথ্যা সংবাদ লিখেন। অথবা বাংলাদেশে স্ক্যান্ডাল সাংবাদিকতার জনকও বলা যেতে পারে তাকে। টাকা পেলে উনি হেন কোনও সংবাদ নাই, যা তিনি ছাপিয়ে দিতেন না। যাই হোক নাম-ডাকের কথাই সবাই জানত। তাই দূর-দূরান্ত থেকে তার কাছে অনেক মানুষও আসত, তাদের নিপীড়নের খবরটি উনি যেন লিখে জানিয়ে দেন দেশবাসীকে। এটার কারণও ছিল, মানুষের রাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা কমে গিয়েছিল। আইন-আদালত কারও কাছে গিয়েই মানুষ ভরসা পেত না। একমাত্র একটা সময় তৈরি হয়েছিল যে মানুষ এর ওপর আস্থা রাখছে বা সংবাদপত্র সত্য কথা বলার ক্ষমতা রাখে।

তো একবার তার কাছেই এক লোক হাজির। তার সংবাদ ছাপিয়ে দিতেই হবে। অনেক টাকার ব্যাপার-সেপার। গোপনে এসে সব সংবাদের বিষয় তাকে দিয়ে
দেওয়া হল। সঙ্গে টাকা-পয়সাও। ওই লোকটি সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি ভেরিফিকেশন করতে চান? সাংবাদিকটি বললেন- টাকা-পয়সা ছাড়া
আমার আর ভেরিফিকেশনের দরকার নাই। পরদিন সংবাদ এল- ইউটিউবে ছেয়ে গেছে স্বপ্নার নগ্ন ভিডিও।

হুলস্থুল পড়ে গেল পুরো বাংলাদেশে। পুরো বাংলাদেশ বলতে, আপনিও পাঠক খুঁজতে লাগলেন সেই ভিডিও। যারা ইন্টারনেট ব্যবহার জানেন, তারা সবাই লুকিয়ে
সেই ভিডিও খুঁজতে লাগল। সাইবার ক্যাফেগুলোতে বেড়ে গেল ভিড়।

সাংবাদিকটি সে দিন স্বাভাবিকভাবেই এলেন সংবাদপত্র অফিসে। এসে নিজের টেবিলে বসলেন। কেউ কেউ তাকে দেখে হাসছে বলে মনে হল তার। তার ঘনিষ্ঠ
বন্ধুরা তাকে আড্ডায় ডেকে নিলেন। একজন বললেন- দোস্ত গতকাল যে নিউজটা করছ, সেটা তো হিট। সাংবাদিকটি বলল, হিট না হওয়ার কি আছে। সংবাদ তো এভাবেই খাওয়াতে হয়। আরেকজন বলল- দোস্ত, তুমি যে নিউজটা করছিলা, ভিডিওটা কি দেখছিলা? সাংবাদিকটি বলল- না, ভিডিও দেখার দরকার মনে করি নি। কেন ইউটিউবে কি ভিডিওটা নাই। বন্ধুটি বলল- আছে। সাংবাদিকটি বলল- তাহলে? বন্ধুটি বলল- আচ্ছা ভাবীর নামও তো স্বপ্না, তাই না? এবার সাংবাদিকটি একটু বিরক্ত হল বলে মনে হল। সাংবাদিকটি বলল- হ্যাঁ, কিন্তু এ কথা বলার মানে কি? বন্ধু বলল- দোস্ত ভিডিওটিতে যাকে দেখা যায়, তার চেহারাটা স্বপ্না ভাবীর মত। আমার ধারণা কেউ তোকে ফাসানোর জন্য স্বপ্না ভাবীর ছবি ভিডিও এডিটিং করে ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছে। সাংবাদিকটি বিরক্ত হল এবং বিচলিতও হল মনে হল। এবং সেদিনের পর থেকে সাংবাদিকটিকে আর কোনও সংবাদপত্র অফিসেই নাকি দেখা যায় নি। এমন কি এখন সে কোথায় আছে, তাও কেউ জানে না।

মেটা ফিকশন-৯: গঞ্জিকাবৃত্তান্ত

একবার এক দেশে শিব ঠাকুরের ভক্ত বাড়তেই লাগল। হাজার-হাজার, লাখ-লাখ, কোটি-কোটি মানুষ ভক্ত হতে শুরু করল শিবের। শিব টাকুর এক পাহাড় থেকে নেচে বেড়ান আরেক পাহাড়ে। এক শ্মশান ঘাট থেকে উড়ে বেড়ান আরেক শ্মশানে। শিবের সাথে কোনও দেবতাই আর পেরে উঠছেন না। সবাই যদি শিবেরই ভক্ত হয়ে যান তাহলে অন্য দেবতাদের কি হবে। দেবতারা যুক্ত করলেন, যাই হউক এই শিবকে ঠেকাতেই হবে। দেবতারা মর্ত্যে নেমে এলেন। শিবের কি এমন শক্তি যে সব মানুষ তার ভক্ত হয়ে উঠছেন। দেবতারা মানুষ রূপে শিবালয়ে ঘুরতে লাগলেন। খুঁজ করতে লাগলেন কি এই শিবের শক্তি। দেবতারা কয়েকদিন মর্ত্যে থেকে ফিরে গেলেন দেবতালয়ে।

একদিন সব দেবতারা শিবের কাছে গেলেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে মহাদেব, এ তোমার কেমন রূপ। মর্ত্যলোকে সকল মানুষ কেবল আপনারই ভক্ত হয়ে ওঠছে। মহাদেব হাসলেন। বললেন, কেন দেবকুল। এভাবে কেন বলছেন? এ সময় নারদ বলে ওঠলেন, কিন্তু মহাদেব আমি মর্ত্য লোক ঘুরে এসে দেখলাম, মনুষ্যকুল সত্যিকার অর্থে আপনার ভক্ত নয়। মহাদেব বিচলিত হলেন। বললেন, কি বলছেন এসব নারদ মুনী। নারদ বললেন, হে সথ্যি মহাদেব, আমি মর্ত্য লোক ভাল করে ঘুরে দেখেছি। তারা কেউই আসলোঁপনার ভক্ত নয়। মহাদেব বললেন, আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না। নারদ মুনি বললেন, আপনি মনুষ্যকুলকে নষ্ট হওয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। যা আপনার কাছ থেকে কাম্য নয়। আপনার কারণেই দেবতাদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে। মহাদেব এবার ক্রোধ সামলাতে পারলেন না। নারদ বলে চিতকার করে ওঠলেন তিনি। কেঁপে ওঠল পৃথিবী। নারদ বললেন, বিশ্বাস না হয়, তো একবার মর্ত্য লোক ঘুরে আসুন মহাদেব।  আমারা দেখে আসলাম, কেউই আপনার ভক্ত নয়, তাদের ভক্তি কেবল গঞ্জিকা সেবনে। হাজার-হাজার, লাখ-লাখ, কোটি-কোটি মানুষ আপনার মন্দিরে যাচ্ছে কেবল গঞ্জিকা সেবন করতে, আপনাকে ভক্তি করতে নয়। এইভাবে চলতে থাকলে দেবতাদের কোনও সম্মানই থাকবে না মনুষ্যকুলে।

সঙ্গে সঙ্গেই মহাদেব ধ্যানস্থ হলেন। এরপর থেকে মহাদেবকে কোনও দেবতাই নাকি গঞ্জিকা সেবন করতে দেখেন নি।

মেটা ফিকশন-১০: লেখকচরিত্র

দুপুর মিত্রের দুপুর মিত্রকে নিয়ে লেখা এই গল্প। মানে এই গল্পের চরিত্র দুপুর মিত্র নিজেই। সে হিসেবে এই গল্পের চরিত্র ও সত্যতা নিয়ে কোনও সন্দেহ নাই।
মানে লেখক নিজেই যখন এই গল্পের চরিত্র এবং তিনি নিজেই যখন এই গল্পটি লিখছেন তখন অসত্য বলে কোনও বিষয় আশা করি পাঠক খুঁজে পাবেন না। পাঠক
সারাক্ষণ যে সত্যিকারের গল্প পড়তে ইচ্ছুক, সেই সত্যিকারের গল্পটিই আপনাকে উপহার দিতে যাচ্ছেন লেখক নিজেই। কাজেই চুপচাপ পড়ে যান।

একবার এক দেশে ছিল এক কবি। এই কবি নিজেই নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলেছিল। রাষ্ট্র-সমাজ-নারী-রাজনীতি হেন কোনও বিষয় নেই, যা নিয়ে এই
কবির নিজস্ব কোনও বক্তব্য ছিল না। এবং সেই বক্তব্যগুলো এমন ছিল যে অতীতে প্রতিষ্ঠিত যে কোনও সাহিত্যের কাঠামো বক্তব্যের তোপে ভেঙে পড়ছিল। এই
কারণে শঙ্কিত হয়ে ওঠেছিল, আমলা-রাষ্ট্র তথা সমাজের সুবিধাভোগী মানুষেরা। তাদের তৈরি করা সুবিধাবাদী বিপ্লব, রঙ-তামাশার সাহিত্য চর্চা এক প্রকার
অন্ধকারের দিকে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। তো এমন পরিস্থিতিতে কার না ক্ষেপে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যায়, কে না রেগে ওঠে? কাজেই শুধু রেগে
যাবার ভেতরে এই ঘটনা সীমাবদ্ধ থাকল না, একদিকে সুবিধাবাদী লেখক শ্রেনী ফুসে ওঠল, অন্যদিকে নিপীড়িত লেখক শ্রেনী যূথবদ্ধ হওয়া শুরু করল। এরকম
অবস্থায় রাষ্ট্র এই দুপুর মিত্রকে ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার এরকম ঘোষণা দিল। কিন্তু কবি স্বাভাবিক ভাবেই নানা জায়গা ঘুরতে লাগলেন। নানা জায়গায় গিয়ে তার কাজ-কর্ম তার মত করে করতে থাকলেন। কিন্তু কেউই তাকে ধরতে পারল না। রাষ্ট্র-পুলিশ-সমাজ কেউই তাকে ধরল না। ধরতে আসল না। বিষয়টা দুপুর মিত্র বুঝতে পারল না। পুলিশের সামনে দিয়েই দুপুর মিত্র হাঁটছে, কিন্তু দুপুর মিত্রকে পুলিশ ধরছে না। পোস্টার ছাপা হয়েছে, পুরো বাংলাদেশ পোষ্টারে ছেয়ে গেছে, সেই পোস্টারে নিখুঁতভাবে ছবি ছাপা হয়েছে দুপুর মিত্রের। কারও তাকে না চেনার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু কেউই কেন যেন তাকে ধরছে না। ধরিয়ে দিলেই কিন্তু সে পুরস্কার পাবে। তারপরও। বিষয়টা দুপুর মিত্রের ভাল লাগল না।

একদিন দুপুর মিত্র নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি নিজেই তাকে ধরিয়ে দেবার কাজটা করিয়ে দেবেন। দুপুর মিত্র রাস্তায় হাঁটছে এরকম একটা লোককে দেখে,
তাকে থামিয়ে বললেন- আচ্ছা দেখুন তো এই পোস্টারে ছপানো চেহারা আর আমার চেহারা তো একই, তাই না? লোকটা দুপুর মিত্রের দিকে তাকাল। কিছু বলল
না। দুপুর মিত্র বললেন, মানে এই দুপুর মিত্রটা আমিই। রাষ্ট্র আমাকে ধরিয়ে দেবার জন্যই পুরস্কার ঘোষণা করেছে। আপনি যদি আমাকে ধরিয়ে দেন, তাহলে
আপনি পুরস্কার পাবেন। লোকটা আবারও দুপুর মিত্রের দিকে তাকাল এবং কি একটা শব্দ করে চলে গেল। দুপুর মিত্র বুঝতে পারল, শব্দটা ছিল পাগল। কিন্তু এর মানে ধরতে পারল না যে এভাবে নিজেকে ধরিয়ে দেবার পরও লোকটা পুরস্কার নিতে চাইল না, লোকটা কি তাহলে বিশ্বাসই করল না যে আমিই দুপুর মিত্র। দুপুর মিত্র ভাবল, পুলিশের কাছে গেলেই বরং ঘটনাটা চুকে যায়। তারা নিশ্চয়ই ভুল করবে না। নিশ্চিত বুঝতে পারবে- আমিই দুপুর মিত্র। তো দুপুর মিত্র পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বলল- ভাই আপনারা যে দুপুর মিত্রকে ধরিয়ে দেবার জন্য পোস্টার ছাপিয়েছেন, সেটা আমিই। একজন পুলিশ দুপুর মিত্রের দিকে তাকল। ভেতর থেকে কেউ একজন চিল্লা-চিল্লি করছিল- করিম এই সব পাগল কিভাবে অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাকিয়ে থাকা পুলিশটি দুপুর মিত্রকে তাড়িয়ে দিল।

অনেক অনেকদিন পর দুপুর মিত্রকে দেখা গেল একটি গার্লস স্কুলের সামনে কি জানি সব বকে যাচ্ছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s