Home

art 1 

দুপুর মিত্রের ফ্ল্যাশ ফিকশন মন লাগিয়ে আমি পড়তে থাকি- আরও স্পষ্ট করে বললে, তা পড়তে আমি বাধ্য হই। সেটা কোনো জোরাজুরির বিষয়ই নয়, আমার মনোবাঞ্ছার বিষয় বলেই তা পড়ে কিছু লিখতে মন চাইল। এবং তা চাইতে চাইতে গল্পের এ-ধারাটা মূলত কী, তাই আবিস্কারে প্রবৃত্ত হই। এ চাওয়াটারও প্রয়োজন ছিল, কারণ এ ধারাটা সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা ছিল না। এ করতে গিয়ে আমি আমাকে নিয়েই খানিক ঘাটাঘাটি, এমনকি মাখামাখি শুরু করলাম! এইটুকু আবারও বুঝতে থাকলাম, ফ্ল্যাশ ফিকশন (তড়িৎ-গল্প / মুঠো-গল্প হতে পারে এর বাংলা নাম) এ যে ছোটগল্প বা অণুগল্প নয় কিংবা নয় তাৎক্ষণিক গল্প (Sudden story) তা অন্তত মানা গেল। এর সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার নৈবদ্য দিয়েই বুঝতে হয় যে এর নাম ফ্ল্যাশ ফিকশন বা তড়িৎ/মুঠো গল্প কেন! এর শব্দসংখ্যা ৭৫০ এর মতো হতে পারে। এক-বসায় তা পড়া যায়, ভাবা যায়; তবে ‘সাডেন স্টোরি’র মতো যেখানের গল্প সেখানে রাখার বিষয় তা নয়। তবে তা সাহিত্যসত্য যে, এতে গল্পের মেজাজটা নিশ্চিতই চালু থাকে। আমার এটা মনে হতে থাকে দুপুর মিত্র গল্পের ভিতর গল্পের আলাদা চেহারা ক্রমশ আবিস্কার করছেন বা প্রতিস্থাপন করতে আছেন। তিনি সেই গল্পে মানুষের সৃষ্টিশীলতা আর নিসর্গের চেহারা যেমন এনেছেন, তেমনি অতি প্রাকৃত বিষয়কে বেশ আলোকায়িত করেছেন, জীবন এখানে চলমান লাঙলের ফলার দাগের মতোই স্পষ্ট হওয়ার বাসনা রাখে। লেখক যেন পাঠকের সাথেই আছেন! একটা গল্পের কেন্দ্রীয় ধারণা তাতে স্পষ্ট হতে থাকে, সময় জেগে উঠতে থাকে, চরিত্র জাগতিক হয়, মূল দ্বন্দ্ব আকার পায়, জীবনের মাখামাখিটা জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে আবিস্কৃত হওয়ার কায়দা প্রকাশ করে।
শুধু গদ্যই তো গল্প হয় না, কাহিনী বা ঘটনা বা প্রতিবেদনও গল্প নয়। গল্প গল্পই। তাতে গল্পকারের ঈশ্বরত্ব থাকে, নিজেকে প্রকাশের সৃষ্টিশীল প্রয়াস থাকে। তার সবই দুপুর প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। তবে এটা ঠিক তার গল্পে সমকালীন রাজনীতি, জীবনকে দেখার দার্শনিক প্রত্যয় আমাদের আবিস্কার করতে যেয়েও থেমে থাকতে হয়! আমরা চলতে যাই, সবারই সৃজনশীল বিকাশ চাই, শরীরী শ্রমের সৃষ্টিশীলতা বুঝতে চাই। সেইসব ইশারা আমরা এখানে পাচ্ছি বটে!
এ হচ্ছে গল্পের এক নতুন জগৎ, নতুন আবহ, আমাদেরকে চিহ্নিত করার নবতর এক প্রয়াস বটে- আসুন পাঠক, আমরা তাতে যাপন করি!

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
২৫.১২.১২

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ১

রাজকন্যার মুখ একেবারেই কালো মেঘে ভরা। এই মুখ দেখলে প্রজাদের কেউই ভাল থাকতে পারে না। রাজার কাছে এই সব প্রজাদের কোনও আবদারই নাই। কেবল তারা চায় রাজকন্যার মুখ যেন একবার সূর্যমুখির মত হেসে ওঠে।
এমন এক রাজ্য, প্রজাদের কোনও আবদারই নাই। কেবল সবার একটাই দাবি রাজকন্যার মুখে হাসি ফুটুক। এটা নিশ্চয়ই সিরিয়াস কিছু।
আমি রাজকন্যাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার, সারাক্ষণ মুখ
গোমড়া করে থাক কেন? রাজ্যের সবাই তোমাকে নিয়ে চিন্তিত। তোমার মা-বাবা তোমার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারে না।
রাজকন্যা বলল, আমার ওই মা-বাবার জন্যই তো মুখ গোমড়া করে থাকি।
আমি বললাম, কেন?
রাজকন্যা বলল, আমার মা-বাবা, কেউই এখন বাসায় থাকেন না।
আমি বুঝতে পারলাম না। আবারও জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
রাজকন্যা বলল, বাবার পরকীয়ার কাহিনী জেনে মাও এখন পরকীয়া শুরু করেছেন।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ২

কেবল দিনের বেলায় বিশ্বস্ত, শান্ত, এক নলা বন্দুক হাতে নেওয়া এই ব্যাংকের পাহাড়াদারকে রাত যতই গভীর হয় ততই নাকি পাগলের মত হতে দেখা যায়। শহরের সমস্ত অলি-গলি থেকে কুকুরেরা দৌঁড়ে আসে তার কাছে। আর গভীর রাতে তারা নাকি এক টানা ডেকে ওঠে।

শুনেছি, ব্যাংকের টাকাগুলো আমার, ব্যাংকের টাকাগুলো আমার- এরকম চিতকারও নাকি শুনেছেন কেউ কেউ।

 
ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩

রাজপুত্র আর রাজকন্যা একসাথে চাকরিতে ঢুকল। কোনও একটি মিডিয়া হাউজে। রাজকন্যার উত্তরোত্তর সফলতা। হু হু করে বাড়তেও থাকল তার বেতন। আর রাজপুত্রের পোড়াকপাল। তার দিকে তাকানোর শুধু যে কেউ নেই তাই নয়, চাকরি চলে গেল এই বোধহয়। রাজকন্যা দিনে দিনে সেলিব্রিটি হয়ে উঠতে থাকল। আর রাজপুত্র ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকল।

এখন আর তাড়া একসাথে কোথাও বেরুতে পারে না। কোথাও বেড়াতে গেলেই রাজপুত্রের মন খারাপ হয়ে যায়। সবাই রাজকন্যাকে ঘিরে থাকে। রাজকন্যাকে নিয়ে রাজ্যের সমস্ত মানুষের কত কি যে জিজ্ঞাসা। আর রাজপুত্র পাশেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

কিভাবে যেন তারা আলাদা হয়ে যেতে থাকল। কিভাবে যেন তারা ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকল। কিভাবে যেন একে অপরের অপরিচিত হয়ে উঠতে থাকল।

একদিন রাজপুত্র রাজকন্যাকে বলল, চল আমরা কোথাও বেড়িয়ে আসি। কতদিন আমরা একসাথে হা ধরে হেঁটে বেড়াই না খেয়াল আছে। কথা শুনে রাজকন্যা হেসে দিল। বলল- চল।

দু’জন কিন্তু একাকী সন্ধ্যা বেলায় যাতে কেউ তাদের চিনতে না পারে, অন্ধকারের ভিতর দিয়ে দু’জনে হাত ধরে পার্কের ভিতর দিয়ে হাঁটছে। পার্কের যে রাস্তায় কোনও জন মানুষ নাই, কখনও যায় না ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ হয় বলে সেদিকেই তারা যাচ্ছে। রাজকন্যা বলল- চল এবার আমরা উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটি। রাজপুত্র বলল- কেন। এমন নির্জন, অন্ধকারে ভরা জগতে আজ হাঁটতে তো খারাপ লাগছে না। অরও ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভিতর তারা হাঁটছে, এমন অন্ধকার যে কেউ কাউকে দেখতে পারছে না। রাজকন্যার গলা শুকিয়ে এল। কার যেন হাত তার মুখ চেপে ধরতে চাচ্ছিল। রাজকন্যা বলল, চল অনেক তো হল। এবার যাই। রাজপুত্র মনে মনে ভাবল- এখনই তো সময়। ওকে শেষ করে দেবার। এই যন্ত্রনাটাকে শেষ করে দেবার। এই অসহ্য, বিরক্তিকর জীবনকে শেষ করে দেবার। রাজপুত্র একবার হাত রাজকন্যার মুখের দিকে নিয়ে যায়। রাজকন্যা তখনই বলে ওঠে, আচ্ছা এই অন্ধকারে তুমি যদি ভালকাসায় আমাকে মেরে ফেল, কেমন হবে?

হাতটা নিচে নামিয়ে ফেলে রাজপুত্র। মনে হয় পারছে না। কি যেন আটকে দিল তাকে, কি যেন আটকে দিল তাকে।

ভালবাসা, রাজকন্যা বলছে, আচ্ছা তুমি মনে হয় আমাকে আর আগের মত ভালবাস না।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৪

দুইজন বৌদ্ধ ভিক্ষু আলাপ করছিলেন।

: সত্য দিয়ে মানুষ আসরে কি করে?
: সত্য দিয়ে মানুষ ধর্ম তৈরি করে। আমাদের বুদ্ধ ধর্ম তৈরি করেছিলেন, যা আমরা পালন করি।
: সবাই কি সত্য দিয়ে ধর্ম তৈরি করে? এখন তো আর নতুন কোনও ধর্ম দেখা যায় না। তার মানে এখন কি মানুষ সত্য দেখে না?
: দেখে, আগে মানুষ সত্য দেখলে ধর্ম তৈরি করত। এখন মানুষ সত্য দেখলে রাজনৈতিক পার্টি তৈরি করে।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৫

গভীর রাতে আমি প্রায়ই একা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি যেভাবে একদিন বেরিয়ে পড়েছিল রাজপুত্র। মনে হয় গভীর রাতে কোথাও কিছু একটা হয় আর সেখানে আমার থাকা জরুরি। একদিন ক্লান্ত হয়ে একটি বিশাল খোলা মাঠে হাঁটতে হাঁটতে মাঝখানটায় এসে দাঁড়াই। দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকানোর চেষ্টা করি। দেখি কেউ নেই, কেউ না। চারপাশে এখন কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার। আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লাম। একটা দুটা তারা ছুটে যাচ্ছে। আমি তাদের ধরার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন থেকে যখন পাশে তাকালাম, দেখি কয়েকটা কুকুর আমার পাশে আমারই মতন শুয়ে আছে। এত বড় বিশাল মাঠ কিভাবে খুঁজে খুঁজে যেখানে আমি শুয়ে আছি কুকুরগুলোও সেখানে এসে শুয়ে পড়ল। পৃথিবীতে কেউই এমনকি কুকুরগুলোও মানুষকে একা থাকতে দেয় না।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৬

সকাল বেলা দাঁত ব্রাশ করে বেলকনিতে একটি সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়াতেই জাহাঙ্গীরের পরকীয়ার কথা মনে পড়ল। জাহাঙ্গীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। ফর্সা, সুন্দর কিন্তু কথা বলার সময় বিদঘুটে বাংলায় কথা বলে। ওর আগের একটি প্রেম ছিল। এখন অবশ্য বিয়ে করেছে। একটি বাচ্চাও হয়েছে। কিন্তু জাহাঙ্গীরের সাথে তার পূর্ব প্রেমিকার সম্পর্ক এখনও বহাল। আড্ডায়, ঠাট্টায়, নানা দুষ্টামিতে

তাদের পরকীয়া প্রেমের অনেক রসাল আলাপই চাউর হয়ে গেছে। অনেকেই জানে। মনে হয় তার বউও। কিন্তু তাদের মদ্যে এ নিয়ে কোনও ঝুট-ঝামেলা হতে দেখি নাই। কখনও কিছু আমাদের সামনে বা অন্য কোনও মাধ্যমে এ নিয়ে কোনও ধরণের কথাও শুনু নাই। কিন্তু ভাবছিলাম ওই মেয়েটির কথা, যে মেয়েটির সাথে আগে তার প্রেম ছিল, যে মেয়েটি আগে প্রায়ই মেসে খাবার এনে তাকে খাইয়ে যেত, যে মেয়েটির জন্য আমরা মাঝে মাঝে তাদের রুম ডেট করার যাতে কোনও সমস্যা না হয়; সেজন্য তাদের রুমে রেখে বাইরে বেড়িয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে বিরক্তও হতাম। সেই মেয়েটিও এখন বিবাহিত। পুত্র সন্তানের জননীও বটে। ভাবছি পরিবার আর পরকীয়া কিভাবে এক সাথে চলতে পারে। এরকম ভাবতে ভাবতে বেলকনি থেকে যে মুরগীটির ওপরে একটি মোরগ বসতে দেখেছিলাম, দেখলাম সেই মুরগীটিকেই এখন তাড়া করছে আরেকটি মোরগ।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৭

গভীর রাতে হঠাত জেগে ওঠলেও আমি বিছানা ছেড়ে উঠি না। কেমন যেন একটা ভয় লাগে। একদিন এরকম রাতে জানালা দিকে বাইরে তাকাতেই গা শিউরে উঠেছিল আমার। জানালার কাছের যে গাছের শাখা ধরে আমি চাঁদ দেখতে চাইতাম, সেই শাখাতেই কে যেন বসেছিল সেদিন। আমি কোথাও কিছু দেখিনি এরকম একটা মানসিক অবস্থার ভিতর দিয়ে জানালা বন্ধ করে দিয়েছিলাম সেদিন। এরপর থেকে টয়লেটে যাবার খুব প্রয়োজন ছাড়া গভীর

রাতে আমি বিছানা ছেড়ে কোথাও যাই না। গতকাল রাতে প্রচণ্ড টয়লেট চেপে যাওয়ায় বিছানা ছেড়ে উঠতেই হল আমার। টয়লেট শেষ করে শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে আসতেই গা কেমন ছমছম করে ওঠল। আজ কি কিছু একটা দেখব। এমন কিছু যা কাঙ্খিত নয়। যদি দেখে ফেলি এই ভয়ে কিছুটা চোখ বন্ধ করে, আবার কিছুটা চোখ খুলে শোবার ঘরে এগিয়ে বিছানার দিকে তাকাতেই দেখি কে যেন শুয়ে আছে। আমার পা কেমন ভেঙ্গে আসে। শক্তি হারিয়ে ফেলি। কোনও শব্দ করতে পারিনি। শুধু মনে আছে, তার চেহারাটা সেই মফস্বলের একা একা থাকা মাঝ বয়সী কবির মতো, যে একদিন আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল, কিন্তু আমি তাকে তেমন একটা সময় দিতে পারি নি।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৮

দু’জন পুরোহিত আলাপ করছিলেন।

: রাধা আর কৃষ্ণের মাহাত্ম আসলে কি?
: রাধা হলেন ভক্ত আর কৃষ্ণ হলেন ঈশ্বর। রাধা-কৃষ্ণের মিলন হল ঈশ্বর আর ভক্তের মিলন।
: তাহলে রাধা কি সবসময় কৃষ্ণের কাছে যেতেন না কৃষ্ণও মাঝে মাঝে রাধার কাছে আসতেন?
: উভয়েই উভয়ের কাছে যেতেন।
: আমি যদি ভক্ত হয়ে থাকি, তাহলে সব সময় আমিই কেন ঈশ্বরের কাছে যাব? ঈশ্বরের কি কখনও কখনও নয়, একবার হলেও আমার কাছে আসা উচিত না?

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৯

সোহেল আজ খুশি। অনেক খুশি । এত বেশি খুশি আর আনন্দ আর প্রেম এইভাবে খেলা করেনি তার শরীরে আগে। তার উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করছে। তার নাচতে ইচ্ছে করছে। সে গাছের পাতার দিকে তাকায়। পাতাগুলি কেমন হেসে হেসে গেয়ে ওঠে। সে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের দিকে তাকায়। মেঘগুলি কেমন নেচে নেচে মিলিয়ে যায়। সে মানুষের মুখের দিকে তাকায়। মুখগুলি কেবল উদ্বেলিত আনন্দে ভেসে ওঠে। কেননা সে একটি মেয়েকে বলেছে- তোমাকে আমাকে ভালবাসার জন্য খুব প্রয়োজন। অবশ্য মেয়েটি তাকে কিছু বলেনি। বোধহয় মেয়েটি মনে মনে ভেবেছে- ভালবাসার এই অভিনব পন্থাটি কিভাবে তার মাথায় এল।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ১০

ফিলিপের কথা মনে পড়ছে বেশ। একটা সময় বাংলাদেশের আদিবাসী অঞ্চলগুলো তন্ন তন্ন করে ঘুরে বেরিয়েছে। সে সময় আমার একমাত্র বন্ধু ছিল পিলিপ। ফিলিপ আদিবাসী। কিন্তু সে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। সে নয় গোটা পরিবারই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। হয়ত দারিদ্রতাই তাদের খ্রিস্টান হতে বাধ্য করেছে। দারিদ্রতাই কেবল তাদের খ্রিস্টান করেছে। ভাল ধর্ম বা দার্শনিতা নয়। কেননা ও অনেক দেব-দেবীর নাম আমাকে শুনিয়েছে। তাদের মাহাত্ম্যও আমাকে বলেছে। মিসি সালজং, সুসমি, গয়ড়া- এরকম কত দেব-দেবী। সে সময় তাকে আমার মনে হয় নি যে সে আসলে সেসব অবিশ্বাস করে। ও একদিন আমাকে বলেছিল- আসলে সব ধর্মই তো এক। তোমাদের আল্লাহ, আরেকজনের ভগান, আরেকজনের মিসি সালজং। সব ধর্মেই তো সৃষ্টিকর্তা এক। সে দিন আমি তার কথায় অনেকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। চিনুয়া আচেবের থিংস ফল এপার্ট পড়ে যেভাবে কেঁদে ফেলেছিলাম একদিন। ওকানকো, যে তার বাবাকে পছন্দ করত না কিছুটা ভীরু ছিল বলে, যে সারা জীবন কাটাতে চেয়েছে যুদ্ধে, কারন সে মনে করে ব্যর্থরা মেয়েমানুষ, সেই ওকানকোই খ্রিস্টানদের সাথে মারপিট করে-একজনকে মেরে ফেলে, আর খ্রিস্টানদের হাতে তার যেন মরন না হয় সেজন্য সে নিজেই আত্মহত্যা করে। ওকানকোও এভাবে কথা বলত। বলেছিল তোমার সৃষ্টিকর্তার সাথে আমাদের সৃষ্টিকর্তার ফারাক কোথায়? ফিলিপ কি ওকানকো?

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ১১

আমাদের যে বন্ধুকে নিয়ে আমরা সবসময়ই বিরক্ত হতাম, তার নাম সোহেল। কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি, পথে হয়ত দেখা গেল কোনও বাউল গান করছে, অনেকক্ষণ খোজাখুঁজির পর সোহেলকে দেখা গেল সেইখানে আবার নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছি, প্রতিদিনই সে আসে মাঝে দুই-তিন দিন দেখা গেল সে নেই। কই গেল কই গেল কেউ জানে না। বাড়ি গিয়েও জানা যেত না যে সে আসলে কোথায় আছে। তারপর হঠাত দেখা। প্রশ্ন করলে বলত- আশেপাশেই ছিলাম। এরকম একটি ছেলের সাথে চলাফেরা করতে কিছুটা সমস্যা তো হতই। কিন্তু সবচেয়ে যে বিষয়টাকে আমি বেশি ভয় পেতাম তা হচ্ছে সে প্রায়ই আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলত, তার দাদা একদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেই নি। কেউ কেউ বলত, সে সন্ন্যাসী হয়ে গেছে। কেউ কেউ বলত, সে অন্য দেশে চলে গেছে। কেউ কেউ বলত, সে আসলে বেঁচে নেই। অনেক কথা সেই দাদাকে নিয়ে তাদের পরিবারের। সোহেলের মা-বাবাও নাকি তাকে ভয় করত। প্রায়ই বলত, সোহেলও তার দাদার মত হয়েছে। আমরা এ নিয়ে তেমন একটা সিরিয়াস না হলেও একদিন সত্যিই তা সত্য হয়ে দাঁড়াল। সোহেল সত্যি বাড়ি ফিরে না । একদিন না, দুই দিন না, তিন দিন না, এভাবে এক সপ্তাহ, এক মাস, এক বছর সোহেল বাড়ি ফিরল না। ফিরলই না। আমরা ভেবে পেলাম না। এমন কোনও সঙ্গও খুজে পেলাম না, যেখানে গেলে সোহেলকে খুঁজে পাওয়া যাবে। সোহেলের বন্ধু হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমরা একটা উদ্ভট পরিস্থিতির মুখেই পড়লাম। আমরা এই ঘটনার পর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। লুকিয়ে লুকিয়েই বলা যায়। কখনই সোহেলের বাবার সামনে দাঁড়ায়নি এরপর থেকে। মফস্বলের রাস্তায় যদি কখনও সোহেলের বাবার মুখোমুখি পড়ে যেতাম, আমি সেই বাবার মুখের দিকে কখনই তাকাতাম না। আমার কান্না চলে আসত। অনেকদিন পর হযত বা আমরা ভুলেই বসেছি সোহেলের কথা, জানা গেলে সোহেল বাড়িতে ফিরেছে। আর সাথে তার বউ।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ১২

দু’ জন দর্শনের ছাত্র আলাপ করছিল।
: আমি বুঝি না মানুষ কেন হাজার হাজার বছর বাঁচতে চায়। মানুষ তো হাজার হাজার বছর বাঁচেই।
: মানে? কত কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্মনিক হাজার হাজার বছর বাঁচার জন্য কত কিছু করে যাচ্ছে; আর তুই বলছিস মানুষ তো হাজার বছর বাঁচেই!
: হ্যাঁ মানুষ হাজার বছর শুধু নয়, লাখ লাখ বছর ধরে বাঁচে।
:মানে কি? কিভাবে বাঁচে বলত দেখি?
: দেখ তুই বিয়ে করলে, তোর তো বাচ্চা হবে?
: হ্যাঁ হবে।
: সেই বাচ্চার শরীরে তো তুই আর তোর বউ লুকিয়ে থাকবে?
: হ্যাঁ থাকবে।
: তোর বাচ্চা বড় হয়ে বিয়ে করবে, তারও বাচ্চা হবে, সেখানও তুই থাকবি। এভাবে তার আরেকটি বাচ্চা. তার আরেকটি বাচ্চা এভাবে ক্রমাগত তুই তোর বংশধরের মাঝে তুই বেঁচে থাকবি। তাই না? কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিকরা কেন বেঁচে থাকার জন্য এত কিছু করে আমি বুঝতে পারছি না।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ১৩

এক দেশে ছিল তিন ছেলে আর এক মেয়ে। এক ছেলে খুবই মেধাবী, হ্যান্ডসাম। শিল্প-সাহিত্য এসব নিয়ে তার কোনও আগ্রহ ছিল না। আরেক ছেলে ছিল বাঁশি বাদক, অনেক পড়াশুনা, বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে অদ্ভুত কথা বলতে পারত কিন্তু গড়পড়তা চেহারা। তৃতীয় ছেলেটি ছিল একেবারেই গ্রাম্য। সংসারের কাজ ছাড়া তাকে আর তেমন কিছু করতে দেখা যেত না। আমাদের ধারণা ছিল মেয়েটি প্রথম ছেলেটি মানে যে ছেলেটি মেধাবী ও হ্যান্ডসাম তার প্রেমে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে গ্রাম্য ছেলেটির সাথে বেশি দেখা গেল। আমাদের ধারণাটা ঠিক উল্টে-পাল্টে গেল বোধহয়। তখন আমরা ভাবলাম, মেয়েটি হয়ত বা তার মায়ের মতই হয়েছে অথবা তার মা তাকে হয়ত শিখিয়ে দিয়েছে যে মেয়েদের শেষমেষ সংসারটাই আসল। আর তাই সংসারের বাইরে হয়ত বা মেয়েটি আসতে চায় না। কিন্তু বেশ কিছু দিন পর আমরা মেয়েটিকে বাঁশি বাদকের সাথেই বেশি দেখলাম। আমরা আন্দাজ করলাম মেয়েটির সংসারের নেশা হয়ত বা কেটে গেছে। মেয়েটি হয়ত বা বুঝতে পেরেছে শুধু সংসার নয়, এই বিশ্ব জগতের সাথে আরও কোনও বিস্ময় লুকিয়ে আছে, তা তাকে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এই ছেলেটির সাথেও মেয়েটি বেশি দিন থাকল না। সব শেষে আমাদের ধারণাই সত্য হল মানে মেয়েটি খুবই মেধাবী ও হ্যান্ডসাম ছেলেটির কাছেই এল। ছেলেটির প্রতিটি কথা, প্রতিটি আচরণে মুগ্ধ হয়ে রইল মেয়ে। আমাদের ধারণাই সত্য রূপ পেল বলে আমরা মনে মনে আনন্দিত হলাম। কিন্তু দেখা গেল ছেলেটিই মেয়েটির কাছে আর থাকল না। মেয়েটি হতাশ হয়ে বাঁশিবাদকের কাছে এল। বাঁশিবাদক তাকে রাতভল বাঁশি শুনিয়ে সমুদ্রের দিকে রওয়ানা হল। মেয়েটি শেষমেষ সেই সংসারী ছেলটির কাছে এল। সংসারী ছেলেটি তখন তার নিজের সংসার নিয়ে এতই ব্যস্ত যে মেয়েটিকে সময় দিতে পারল না।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ১৪

শিশুটির বয়স এক বছর। কথা বলতে পারে না। বাবাকে দেখলে বলে বা .. বা .. মাকে দেখলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর হেসে লাফিয়ে ওঠে।
পাশাপাশি তিনটি ফ্ল্যাট। তিনটি পরিবার। তিন পরিবারেই বেশ যোগাযোগ।
শিশুটি এক ফ্ল্যাট থেকে দৌঁড়িয়ে আরেক ফ্ল্যাটে যায়। তিনটি পরিবারই ছেলেটির দুষ্টামিতে আনন্দিত।
মা একা সব পারে না। বাচ্চার এই দুষ্টামি সামাল দিতে দিতেই দিন চলে যায়।
একদিন দুপুর বেলা কোনও একটা কারণে রান্না করতে পারেন না শিশুটির মা।
বাবা এসে গালি-গালাজ করায় মা কেঁদে ফেলেন। মায়ের কান্না দেখে শিশুটি দৌঁড়ে আরেক ফ্ল্যাটে চলে যায়। সেখানে ফ্রিজ টেনে একটা বাটি বের করে মায়ের কাছে দৌঁড়ে আছে সে।
বাটি দেখিয়ে দেখিয়ে অ্যা আ্যা করে চিতকার করে কি যেন বলে চলে শিশুটি।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ১৫

আমাদের মফস্বল শহরের এক পাড়াতেই থাকত পাগলী। বিকাল বেলা পাগলি যখন চিল্লা-চিল্লি করত, আমার পাড়াড়র সমস্ত ছেলেরা সেই পাগলীর পেছনে পেছন ছুটতাম। গান গেয়ে গেয়ে বলতাম, পাগলীরে তুই কই যাস? ওমনি পাগলী আমাদের দিকে তেড়ে আসত। আমরা কিছু দূর দৌড়ে পালাতাম। পরে আবার পাগলীর পিছু পিছু গান ধরতাম, পাগলীরে তুই কই যাস? বেশ কিছু দিন আমরা বিকাল বেলা ক্রিকেট খেলার অফুরন্ত আনন্দের ভে

তর পাগলির দেখা পাই না। আমাদের খেলার বন্ধুদের মধ্যে, যে বন্ধুট বড়; সে খবর আনল- পাগলীর শরীর খুবই খারাপ। বেশিদিন বাঁচবে না। আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম। আজই পাগলীকে দেখতে যাব। সেদিন দল বেধে তাকে দেখতে গেলাম। দেখলাম পাড়ার যে মাঠটাতে কখনও কেউ যায় না, সেখানে পলিথিন আর বাঁশের বেড়া দিয়ে টং ঘরের মত করে বাসা তৈরি করেছে সে। সেখানেই সে থাকত। পাশে বসে থাকতে দেখলাম একটা কুকুর। আমাদের সবাই সেই ঘরের ভেতর যাবার সাহস করলাম না। কেউ কেউ আমাদের মধ্যে যারা সাহসী তারা বাসার ভেতরে উঁকি দিয়ে তাকে দেখল। আমরা তাদের মুখে পাগলীর অসুস্থ শরীরের বর্ণনা শুনলাম। তখন কেউ কেউ বলল, পাগলীকে নিয়ে আমাদের এই ধরণের গান করে ক্ষেপানোর কাজগুলো ঠিক ছিল না। আমারও সেসব কথা যৌক্তিক মনে হল। বেশ কয়েকদিন পর সত্যি শোনা গেল, পাগলীটি আর বেঁচে নেই। বাসায় মা আলাপ করছিল, আহা সেই পাগলীটি, ছেড়া-অর্ধনগ্ন অবস্থায় একদিন আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল। সেদিন মা তাকে একটি পুড়ুনো শাড়ি দিয়েছিল। শাড়ি পেয়ে পাগলী খুশি হয়ে বলেছিল, দেখিস তোর ছেলে অনেক বড় হবে। অনেক বড়। পাগলীদের কথার কি কোনও মানে থাকে?

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ১৬

সমুদ্রের কাছে অনেক গিয়েছি। একবার আমার বান্ধবীকে নিয়ে কাউকে না জানিয়ে চলে গিয়েছিলাম সমুদ্রে মানে কক্সবাজার। সেখানে হোটেল ভাড়া করে থেকেছিলাম ৬/৭ দিন। আমার বান্ধবী কবিতার মত দেখতে তার চেহারা। আমি তার শরীর দেখেছিলাম সমুদ্রের কাছে গিয়ে। আর সমুদ্রকে বলেছিলাম, আমার বান্ধবীর আবাহনের কাছে তুমি তো কিছুই নও। সমুদ্র কিছু বলে নি আমায়, কেবল একবার একটি ঢেউ বেশ বড় হয়ে ফুসে উঠেছিল। খুব একটা পাত্তা দেই নি আমি। বান্ধবীর চাইতে সমুদ্র নিশ্চয়ই বড় নয়। আমি সমুদ্রের আচল ঘেষে বান্ধবী হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে দিগন্তে মিশে গিয়েছিলাম। একবার দু’জনে দু’জনের হাত শক্ত করে ধরে সমুদ্রের গভীরে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। খুব বেশি দূরে যাই নি অবশ্য। আমি যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বান্ধবী যেতে দেয় নি। পাড়ে ফিরে এসে একবার তাকিয়ে দেখেছিলাম সমুদ্রের গর্জন। মনে হয়েছিল, সমুদ্র হেসে উঠেছিল আমাদের ভয় দেখে। সেদিন রাতে আমি আমার বান্ধবীর সমস্ত শরীর চেখে দেখেছি। দেখতে চেয়েছি, কে বেশি রহস্য করে হাসতে পারে, সমুদ্র না আমার বান্ধবী।

আমার বন্ধু জাহাঙ্গীর। ডলফিন বিশেষজ্ঞ। সমুদ্রেই তার কারবার। আমরা যে সমুদ্রে এসেছি তা তাকে জানাইনি। চলে আসার তারিখ কাছে আসছে দেখে বন্ধুকে ফোন করে জানাই যে আমার এই হোটেল আছি। ও তার গাড়ি করে নিয়ে যায় ওর গবেষণা কাজে ব্যবহৃত জাহাজে। সেদিন রাতে পূর্ণিমার। জাহাজে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে আমার বন্ধু চরে গিয়েছে ততক্ষণে ঘুমের সমুদ্রে। আমি আর আমার বান্ধবী জাহাজের ছাদে দাঁড়িয়ে বিচার করছিলাম- কে বেশি সুন্দর? সমুদ্র না পূর্ণিমা। হঠাত নজরে এল খুব দূর থেকে একটি ঢেউ বেশ বড়ড় হয়ে আসছে আমাদের দিকে। আমি আমার বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে কিছুই বললাম না। ঢেউটি এসে বরাবরের চেয়ে একটু জোরো আঘাত করল আমাদের জাহাজকে। কিছুটা কেঁপে উঠেছিলাম। কিন্তু আমার বান্ধবী এসবের কিছুই টের পেল না। হয়ত এলকোহলের মাত্রাটা ওর জন্য একটু বেশিই হয়েছে।

কিন্তু আমি আজও এর রহস্য ধরতে পারলাম না। সমুদ্রের ঢেউ যতদূর জানি একই মাত্রার হয়। হঠাত করে একটি ঢেউ কখনও বড় হয় না। কিন্তু আমরা যতবারই কেবল দু’জনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছি, ততবারই হঠাত সমুদ্রের একটি ঢেউ বড় হয়ে উঠেছে। আর এটা আমার বান্ধবী কখনোই বুঝতে পারে নি। কেবল বুঝতে পেরেছি আমি।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ১৭

রাতভর ঝগড়ার পর বীথি বলল, দেখো আমার পক্ষে সবকিছুই অদৃশ্য করে ফেলা সম্ভব। তুমি আমার সাথে লাগতে এসো না।

আমি অবাক হয়ে বীথির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

বীথি বলল, বিশ্বাস হচ্ছে না । এই তো? দেখো- এটা তোমার আমাকে ভালবেসে দেওয়া তোমার সবচেয়ে দামি আংটি না? এটাই আমি শেষ করে দেব।

বীথি আংটি হাতে নিতেই ভয় পেয়ে গেলাম। বলে কি, এতো দামি আংটিটাকে রাগের বশে সে কি না করে ফেলে।

বীথি আংটি হাতে নিল। আমার মুখ ক্রমশ: শুকিয়ে এল।

আংটিটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে বীথি বলল, কি কিছু দেখতে পাচ্ছ?

আমি হেসে বললাম, না কেবল তোমার হাতই দেখতে পারছি।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ১৮

সে হঠাত করেই ঘুম থেকে জেগে ওঠল এবং টের পেল যে সে একটি মস্ত বড় শিলাখন্ডের ছায়ার নিচে পড়ে আছে। তার সাথে থাকা গাধাটিকে সামনে এগুতে তাগাদা দিল। কিন্তু গাধা এগিয়ে যেতে চাইল না। কিছু দূরেই ছোট ছোট দালানের বাড়ি দেখতে পেল। সন্ধ্যার একটু আগে এই দৃশ্য ছিল খুবই চমতকার। সে এই দূরে থাকা গ্রামের দিকে এগুতে লাগল। প্রচণ্ড তাপে তার চোখ বুজে আসছিল। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে নিজেকে খুব দুর্বল মনে হচ্ছিল। সে দুলে দুলে হাঁটছিল। একবার তার মনে হল খুব দূরের একটা ভবনের কাছে একজন ধর্মযাজক দাঁড়িয়ে আছে। তখন তার মনে হচ্ছিল কেন এত মানুষ কে কেমন আচরণ করে এবং কিভাবে চিন্তা করে এসব নিয়ে পড়াশুনা করে। ভাবছিল আর নিজে নিজে প্রশ্ন করছিল কেন মানুষ আমার মত করে ভাবে না? কেউ কেউ কেন এত রক্ষণশীল হয় আবার কেউ কেউ কেন হৃদয়ের রক্ত ঝড়ায়। ভাবছিল আর নিজে নিজে প্রশ্ন করছিল কেন মানুষ আমার মত করে ভাবে না। সামাজিক-রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক- ধর্ম যে বিষয়ই হউক না কেন কেউ যখন কারও বিরোধিতা করে সে তখনই মৌলবাদী হয়ে ওঠে। ভাবছিল আর প্রশ্ন করছিল কেন মানুষ আমার মত করে ভাবে না।

তারপর হঠাত সে নিজেকে গ্রামের মাঝপথে আবিস্কার করে। ৪ ঘণ্টা পর গাধাটি তাকে খুঁজে পেল। গ্রামের কিছু লোক তাকে এই অবস্থায় দেখে হায় হায় করতে লাগল। পরদিন সকালে সে সত্যি একজন ধর্মযাজককে দেখতে পেল। গ্রামের লোকজন সেই ধর্মযাজক থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর সে ধূসর রঙের বালু উড়তে দেখল। বালু উড়ে যাবার পরপরই জনশূন্য হয়ে গেল সেই স্থান। তারার মত করে সে চোখ খুলতেই টের পেল পড়নে তার কোনও কিছুই নেই, ধুলোময় এক টুকরা কাপড় ছাড়া।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ১৯

পৃথিবী যখন ধ্বংস হওয়া শুরু করেছিল, সেই মুহূর্তগুলোর কথা ভেবে তুমি হয়ত লজ্জিত হচ্ছ। তুমি হয়ত টিভিতে প্রধানমন্ত্রীকে কাঁদতে দেখেছ। কারও মুখে কোনও কথার উত্তর পাওনি।

তোমার বাবা, তোমার মা হয়ত পত্রিকা হাতে নিয়ে বলেছে- এইই শেষ।

তুমি হয়ত চিতকার করে বলেছে- কি হচ্ছে এসব।

তোমার মা হয়ত বা বলেছে- শত্রুরা আমাদের দেশে আজ বোমা নিক্ষেপ করবে।

তোমার বাবা হয়ত বলেছে- এতে প্রচণ্ড বিকিরণ হবে আর রোগ ছড়িয়ে পড়বে।

তুমি হয়ত বলেছ- এটা আমাদের দেশে নয়, ভারত অথবা পাকিস্তানে।

তোমার মা-বাবা হয়ত তখন বলেছে, না তুমি জান না। আমাদের দেশেও বোমা নিক্ষেপ করবে।

এই প্রথম হয়ত তোমার বিশ্বাস হতে শুরু হল। এই প্রথম তুমি হয়ত ভয় পেয়ে গেলে। তুমি কি করবে ভেবে পাচ্ছ না।

টেলিভিশন ফুটেজে অনেক দেশের ধ্বংসযজ্ঞই আজ দেখতে পাচ্ছ। তোমার দেশেও আজ এমন হবে।

সত্যি সত্যি তোমার কথাই সত্যি হল। সকাল হল। রাতভর তীব্র উত্তেজনা আর মরে যাওয়ার ভয় থেকে রক্ষা পেলে। বোমা পড়ে নি তোমার দেশে।

তোমার মা তোমার জন্য চা করে নিয়ে এসেছে।

তোমার বাবা বাগানে বসে পত্রিকা পড়ছে।

সবই স্বাভাবিক। তুমি বাইরে গেলে। অফিস করলে। শহরের কিছু জায়গা ঘুরলে আর গত রাতের কথা মনে করলে। এরপর বাসায় ফিরলে।

তোমার দেশে বোমা পড়ে নি, গত রাতে ভয়ের বোমা ছড়িয়ে পড়েছিল তোমাদের সমস্ত শহর জুড়ে।

এভাবে একদিন- দুইদিন চলে গেল। টিভিতে অনেক লোককে চিতকার করতে দেখছ। কান্না করতে দেখছ।

একদিন হয়ত তোমাকেও টিভিতে দেখা যাবে।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ২০

চাকরি নেই। বেকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে আমি এক প্রকার না খেয়ে খেয়ে ময়লা জামা -কাপড় পড়ে রাজধানীর পথে পথে ঘুরি। এর মাঝে গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে ডান পা-টাও মচকে গেছে। সকাল ১১ টা বেজে গেলে সারা শরীরে কেমন অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। ঢাকার অনেক মানুষের যখন অফিসে যাওয়া শেষ বা তখনও কেউ কেউ যাচ্ছেন সেই ১১ টায় আমিও বেরিয়ে পড়ি অফিসে নয় হাঁটতে।

ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাজধানীর অভিজাত গুলশান পাড়ার গলিতে ঢুকে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে সেখানে দেখলাম হাই রাইজিং বিল্ডিং অনেক কম। বেশির ভাগই এক চালা দালানের বাড়ি। সামনে ছোট ছোট বাগান। বেশ মফস্বলের দালান বাড়ির মত মনে হল। নির্জন, মাঝে মাঝে বিদেশীদের যাতায়ত আর আমার ক্রাচের ভর দিয়ে চলা, সব কিছুর মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পেলাম। হঠাত একটি বাসায় আমি কনকচূড়া গাছ দেখতে পেলাম। রোদের মধ্যে কেমন ঝিলমিল করে ওঠেছিল কনকচূড়া। আমি গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুল কুড়াতে কুড়াতে বাগানের ভিতরে চলে গেলাম। ফটকের সামনে কেউ ছিল না, হয়ত অভিজাত এলাকারই এত নিরাপত্তা যে বাড়ির নিরাপত্তার দরকার হয় না। তাই ফটকে কোনও দাড়োয়ান নেই। আমি কনকচূড়া গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসে রইলাম।

বাড়ির ছাদে আমি একজন অপূর্ব সুন্দরী নারী দেখতে পেলাম। কনকচূড়া আর তার হাসি এই ঝিলিমিলি রোদে কেমন একাকার হয়ে ওঠেছিল। সে হয়ত এই বাড়ির মেয়ে। বড় লোকের মেয়েরা সুন্দর হয়। বড়লোকের মেয়েরা খুব একাকী থাকে। এই মেয়েটি কি আমার সাথে কথা বলবে। অনেকক্ষণ ধরে আড়ালে দেখছিলাম এই মেয়েটিও আমাকে খেয়াল করছিল।

আমার দিকে দারোয়ানের মত একজনকে আসতে দেখলাম। আমার ধারণা ভুল। আমি যে বাগানে ঢুকে পড়েছি সে হয়ত খেয়াল করে নি। দারোয়ানটি আমাকে কিছু বরার আগেই মেয়েটি বলল- এই যে এদিকে আসুন। আমি বাড়ির নিচে দাঁড়াতেই সে একটি ৫০ টাকার নোট উপর থেকে আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। মেয়েটি হয়ত ভেবেছিল- আমি ভিক্ষুক।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ২১

সন্ধ্যাবেলা পার্কে জুটিদের নানা বিষয় নিয়ে অনেক মিষ্টিমধূর গল্প শুনেছি বন্ধুদের কাছে। আজ মনে হল এসব তো কেবল শুনেই গেলাম, আসলে কি সেরকম কিছু-এটা তো দেখা হল না। মাথায় কেমন উত্তেজনা চেপে বসল। মনে হল না আমারও দেখতে হবে আসলেই কি জুটিরা পার্কে সেক্স করে, এরকম উন্মুক্ত মাঠে। যেখানে লোকজন চারপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কেউ কেউ টিজ করছে, কখনও কখনও বাইকের আলো এসে চোখ ঝলসে দিয়ে যাচ্ছে; এরকম একটি পার্কে আসলেই কি কারও পক্ষে সেক্স করা সম্ভব। আমি একা একা পুরো পার্ক ধরে হাঁটতে শুরু করলাম আর কোথায় দাঁড়িয়ে থেকে জুটিদের সুবিধামত দেখা যাবে আর তারা এমনকি পার্কের অন্যান্যরা আমাকে বুঝতে পারবে না, তা ঠিক করতে লাগলাম। আমি একটি সুবিধামত জায়গায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকতে লাগলাম। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন পার্কের চতুর্পাশ ঘিরে ফেলেছে। ঝুপের কিনারে আমি দুইটি জুটি বসে থাকতে দেখলাম। একটা জুটিকে কেবল একটা জমাট অন্ধকার মনে হল। আর আরেকটা জুটিকে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল, তারা কি করছে। আমি এই জুটিটার দিকে মনো যোগ দেবার চেষ্টা করলাম। দেখলাম দুটি অন্ধকার এক হয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম তারা চুমু খাচ্ছে। পার্কের ভেতরে চুমু খাওয়া এটা স্বভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া ভাল। বাইরের দেশে প্রকাশ্যেই চুম্বন খাওয়া হয় এবং এটা তাদের সেক্স হিসেবে নয়, সৌজন্যতা প্রকাশ অর্থে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রকাশ্যে চুম্বন খাওয়াটা অনেকটা নিষেধমূলক ব্যাপার। তাই বোধহয় জুটিদের পার্কে চুম্বন খাওয়ার জন্য অন্ধকারের অপেক্ষা করতে হয়। একটা অন্ধকারের দলাগুলো দেখে আঁচ করা যাচ্ছিল, কে ছেলে আর কে মেয়ে। আমি মেয়ে অন্ধকারটিকে বেশ একটিভ দেখলাম। আমার ধারণা ছিল সেক্সে মেয়েদের আগ্রহ তেমন থাকে না, আর পার্কের মত জায়গায় মেয়েরা বেশি আগ্রহ দেখাবে না এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু মেয়েটার একটিভ সিচ্যুয়েশনটা আমাকে বেশ নাড়া দিল। পার্কে একটি জুটি সেক্স করছে তাতে একটি মেয়ে এতটা একটিভ। ছেলে অন্ধকারটা গাছের ডাল ঘেষে দাঁড়াল আর মেয়ে অন্ধকারটা গাছের ডাল ঘেঁষে দাঁড়ানো ছেলে অন্ধকারটাকে জাপটে ধরল। অন্ধকার দুটি ৫/৬ মিনিট এরকম জাপটে ধরে ছিল। তারপর ওরা আবার ছাড়াছাড়ি হল। এবার অন্ধকার দুটি একজন আরেকজনকে অনেকক্ষণ জাপটে ধরে নড়াচড়া করতে দেখলাম। ওরা সম্ভবত গাছের ডাল ঘেষে শক্ত করে দাঁড়িয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় সেক্স করছিল। আমার মনে হল, মেয়ে অন্ধকারটা নিশ্চয়ই ভাসমান কোনও সেক্স ওয়ার্কার হবে। মধ্যবিত্তের কোনও মেয়ে এরকম কাজ করতে পারে না নিশ্চয়ই। আমি অন্ধকারে তাদের পড়নের পোশাক কি ছিল, তা বুঝতে পারছিলাম না। ফলে অন্ধকার দুটি কোন শ্রেনীর তা বোঝা যাচ্ছিল না। একবার একটা বাইকের অন্ধকার হুট করে সেখানে পড়ায় মেয়ে অন্ধকারের জামার রংটা ধরতে পারলাম। একটা লাল রং এর জামা। আমার মাথায় উত্তেজনা চেপে বসল যে মেয়ে অন্ধকারটা আমাকে দেখতেই হবে। সে নিশ্চয়ই ভাসমান সেক্স ওয়ার্কার। অন্ধকার জুটি দুটি যে পথে দিয়ে বেরুতে পারে, আমি সে পথে এবার দাঁড়িয়ে রইলাম। ১৫-২০ মিনিট পরে সেই পথ দিয়েই অন্ধকারে দেখা লাল জামা পড়া মেয়েটিকে হাঁটতে দেখলাম, তার বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে হাঁটছে। মেয়েটি দেখতে আমার বোনের মত, আমার বোনেরও এরকম একটি লাল জামা আছে। প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি কয়েকবার দেখে নিশ্চিত হলাম কিন্তু নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারি নি; অন্ধকারে লাল জামা পড়া যে মেয়েটি ছিল, সে সত্যি আমার বোন।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ২২

বন্ধু অশোকের পীড়াপিড়িতে ওদের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যেতেই হল। আমার সাধারণত কারও বাসায় দাওয়াত খেতে যেতে ইচ্ছে করে না। তার মধ্যে অশোক তো আমার অনেক ভাল বন্ধু তো বটেই, ওর বউটাও আমাদের ভাল বন্ধুদের তালিকায় ছিল। এমনিতে দেখা হত। হয়ত বসুন্ধরায় আমি শপিংএ, ওরাও হয়ত শপিং করছে। দেখা হয়ে গেল।ওরা হয়ত টিএসসিতে আড্ডা মারছে। আমিও টিএসসিতে। হঠাত দেখা হয়ে গেল। এই জাতীয় দেখা সাক্

ষাত ছাড়া খুব একটা ফোনও করা হয় না আর যাওয়া তো হইইনা। দাওয়াত খেতে গেলাম ঠিকই। অনেকদিন পর সেটা। এবং আমাকেই কেবল দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। ভেতরে ভেতরে একটু লজ্জাও বোধ করলাম।

আলাপ হল অনেক কিছুই। অশোকটা আগের মতই আছে। কেমন শিশুদের মত আচরণ ওর। আর মনের ভেতরটা কেবল সাদা। ও হাসে আর কথা বলে। অশোকের বউ মানে আমার বান্ধবী মাধবী অবশ্য চেঞ্জ হয়েছে। একটু তাড়াতাড়িই বোধহয় ওর শরীরে ভারিক্কি ভাবটা চলে এসেছে। তবে ওর সেই মনভুলানো হাসি এখনও আছে ঠোঁটে। দু’ জনকেই মানিয়েছে বেশ। সংসারটাও বেশ গোছালো। কেবল আমারই কিছু হল না। এরকম একটা সংসার আমারও থাকতে পারত। কিন্তু হইনি। কেন যেনও। কোনও মেয়ে মানুষের কাছে যেতে পারি নি বলে অথবা আমিই হয়ত প্রস্তুত ছিলাম না, এখনও নই। আর কখনও প্রস্তুত হব বলেও মনে হয় না। তবে আনন্দ একক কোনও বিষয় নয়। সেই হিসেবে ওদের সংসারের আনন্দ মানে তাদেরই আনন্দ নয়, আমার জন্যেও আনন্দের। আমি সেই হিসেবে আনন্দটা ভাগ করে নেবার চেষ্টা করলাম।

যা হোক রাতের বেলা আমাদের খাওয়া পর্ব শেষ হল। এবার বিয়ার, এক গামলা মুরগির রোস্ট আর সারারাত ছাদের ওপরে আড্ডা। এই আয়োজন একান্তই আমার জন্য। স্পেশাল। মানে আজ আমাকে ওদের কবিতা শুনাতে হবে। অনেক অনেক কবিতা। ভেসে যাবার, হেসে ওঠার, কেঁদে ফেলার কবিতা। যথারীতি সেই আয়োজন শুরু হল। হাসি-ঠাট্টা-কবিতা-আড্ডা চলতে চলতে রাত প্রায় দুইটা। অশোকের মুখে হাই ওঠছে। ও আগে থেকেই এমন। অলস টাইপের। বিয়ারটাও ঠিকমত খেতে পারে না। এদিকে মাধবী ঠিক তার উল্টো। সংসারের এই যে কঠিন গাথুনি দেখলাম, তা বোধহয় মাধবীরই অবদান। অশোক বলে গেল, তোরা আড্ডা দে-আমি ঘুমুতে গেলাম।

ছাদের ওপর অন্ধকার, চাঁদের আবছা আলো, মাধবী আর আমি। মাধবীর সেই মনভুলানো হাসিটা স্পষ্ট দেখতে পারছিলাম। মাধবী বলল- বিয়েটা করলেই না। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলাম। আরও এক গ্লাস বিয়ার খেতে খেতে বললাম- না। বোধহয় বিয়েটা করাই হবে না। প্রসঙ্গ এড়াতে বললাম- তোমার সংসারটা বেশ ভালই গুছিয়েছ। সবকিছু ফিটফাট। বেশ ভাল লাগল। মাধবী আমার পাশেই বসা ছিল। ও আরেকটু আমার গা ঘেষে বসল। আমি বুঝতে পারছিলাম না এ মানে কি। ও কি আমার কাছ থেকে কিছ চায়- এমন কিছু কি যা অমোক দিতে পারে না। আমি মাধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমার হাসিটা সেই আগের মতই আছে। মনভুলানো। মাধবী আমার হাতের ওপর ওর হাত রাখল। বলল- মেয়েরা এমন কিছু চায়, এমন কিছু মূল্য, এমন কিছু ভালবাসা, যা সব ছেলেরা দিতে পারে না কিন্তু এর জন্য মেয়েরা মুখিয়ে থাকে। অশোক সেরকম একটা ছেলে। আমি অশোককে ভালবাসি। কিন্তু এতটা ভালবাসব কখনই ভাবিনি। মাধবীর থেকে আমি একটি সরে বসলাম। আরও এক পেগ বিয়ারের জন্য আমি গ্রাস খুঁজতে লাগলাম।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ২৩

ভঙ্গুড়, পরিত্যক্ত পোড়াবাড়িটি ছিল আমাদের পাড়াতেই। জমিদারের বাড়ি। দেশভাগের আগেই চলে গেছেন ওনারা। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ছিল তারাও এখন ভারতে। পাক বাহিনী সেই বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এক সময়কার শত শত লোকের যাতায়াত ছিল যে বাড়িতে, সেই বাড়িই এখন আমাদের পাড়ায় ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গলে। কোনও মানুষ ভুলেও সেখানে যাওয়ার কথা ভাবে না। যতই বড় হয়েছি, ততই এই বাড়িটিকে নিয়ে নানা কথ

া শুনেছি। আমাদের পাড়ার এক দাদী বলত সেই বাড়িতে গভীর রাতে একজনের কান্না শোনা যায়। ভয়ে আমাদের গা শিউরে উঠত। চোর পুলিশ খেলার সময়েও সে বাড়িতে লুকিয়ে থাকার কথা ভাবতাম না। একদিন শুনেছিলাম সেই বাড়িতে এক বুড়ি থাকে। সে সাপকে রাতের বেলায় নিজের বুকের দুধ খাওয়ায়। আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন বন্ধুরা মিলে একদিন আমাদের সমস্ত ভয় জয় করলাম। দুপুর বেলা সেখানে গিয়ে কাউকেই পেলাম না। যত কথা শুনেছি সেই বাড়ি নিয়ে, যত ভৌতিক গল্প; কিছুই পেলাম না, কেবল ঝোপ-ঝাড় আর পোড়া ইটের গণ্ধ ছাড়া। এরপর থেকে সেই বাড়িটি আমাদের সিগারেট খাওয়ার নিরাপদ জায়গা হয়ে উঠল। কেননা মফস্বল শহরে কারও সামনে এত অল্প বয়সে সিগারেট খাওয়া মানে রীতিমত ভয়ঙ্কর অপরাধ। আমরা প্রায় দুপুরেই বন্ধুরা মিলে করেজ ফাঁকি দিয়ে চলে যেতাম সেই পোড়াবাড়িতে। সেই বাড়ির নানা গল্প করতাম। একজন একদিন বলর, এই বাড়ির যে জমিদার ছিলেন, তাকে পরিবারের লোকজনই হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। এটা সে টের পেয়ে পালিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াত। একদিন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাকি সেই জমিদার বাড়ি দেখতে এসেছিলেন। কেউ তাকে চিনে নি। এমন কি আমাদের পাড়ায় জমিদারের বংশধর বলে যে হত-দরিদ্র পরিবারটিকে প্রায় সব মানুষ চেনে, সেই বাড়ির বুড়োরাও চিনতে পারে নি তাকে।

ভরদুপুরে সেখানে আড্ডার আসর বসলেও কেবল একটি ভয়কে জয় করতে পারি নি আমরা। তা হল অমাবস্যা রাতে সেখানে একজন মেয়ের কান্না শোনা যায় বলে যে গল্প শুনেছিলাম, তা ঠিক কিনা এটা যাচাই করা হয় নি। আমরা প্লেন করলাম কোনও এক অমাবস্রা রাতে সেখানে যাব সবাই মিলে। কিন্তু ভিতরে ভয়টা থেকেই গেল। মানে কেউই আসলে এই ঘুটঘুটে অন্ধকার অমাবস্যা রাতে এই পোড়াবাড়িতে আসার কথা ঠিক প্রথম কথাতেই রাজি হতে পারছিলাম না। মানে ভয়টা থেকেই গেল। কিন্তু আগে থেকে ভয় পেলে তো আর কিছু জয় করা হবে না। ঠিক করলাম পরশু অমাবস্যা রাতেই আমরা সবাই মিলে পোড়াবাড়িতে যাব। ঠিক করলাম এই স্থানে আমরা সবাই মিলে এক হয়ে তারপর পোড়াবাড়ির দিকে রওয়ানা হব।

রাতের বেলা,ঘুটঘুটে অন্ধকার, নিজের হাত-পা কোনও কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তারওপর অমাবস্যা রাত, বিদ্যুত নেই আমাদের পাড়ায় তখন। ঝিঁ ঝিঁ এক নাগারে ডেকেই চলেছে, অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি নিরব মনে হল আজকের রাতটা। আমি সেই নির্দিষ্ট স্থান এদাঁড়িয়ে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছি। এক ঘণ্টারও বেশি সময় হয়ে গেল কারও আসার নাম গন্ধ নেই। সেই সময়ে আমাদের কারোরই মোবাইল ছিল না যে মোবাইল করে পরিস্থিতি জানব। কেউ আসল না তো আসলই না। কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না। সবাই যে ভীতু আর আমি যে ওদের সবার চাইতে সাহসী তা প্রমাণ করার একটা চান্স পেয়ে গেলাম। আমি নিজেই রওয়ানা হলাম পোড়াবিড়র দিকে।

যতই এগুচ্ছি, ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ ততই তীব্র হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে পোড়াবাড়ির যে চেহারা হয়েছে, ভর দুপুরে আমরা যে চেহারা দেখতাম তার সাথে কোনও মিল নেই। আমি আগাচ্ছি। হঠাত পেছন থেকে কেউ আমাকে স্পর্শ করল বলে মনে হল। আমি দাঁড়িয়ে পরলাম। পেছনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমার গলা শুকিয়ে এল এবার সত্যি সত্যি। টর্চের আলো ফেললাম। হাত দিয়ে পেছনে নেড়ে চেড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কিনা। কেউ নেই। আবার আমি এগুতে লাগলাম। টর্চের আলো ফেলে ফেলে পোড়াবাড়ির ভেতরে যে স্থানে আমরা সিগারেট ফোকার জন্য দিনের বেলা সতাম, সেখানে গিয়ে বসলাম। কই কারও কান্না তো টের পাচ্ছি না। আমি বেশ কিছুক্ষণ মশার কামড় খেয়ে বসে রইলাম। কোনও শব্দ নেই। মশার কামড় খেয়ে আমার যখন অস্থির অবস্থা, আর যা শুনেছি তার কিছুই পোড়াবড়িতে দেখলাম না; আমি তখন বিরক্ত হয়ে বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম; ঠিক তখনই একটা ফিসফাস শব্দ আমার কানে গেল। আমি ঠিক সত্যিকার অর্থেই কোনও ফিসফাস শব্দ শুনলাম কিনা, তা জানার জন্য কান পেতে রইলাম। না, সত্যি একটা ছেলে আর একটা মেয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এই প্রথম দীর্ঘদিনের জমিয়ে রাখা ভয়টা তরতাজা হয়ে ওঠল। টের পাচ্ছি আমার হাত-পা কাঁপছে। তাহলে সত্যি পোড়াবাড়িতে অন্ধকার অমাবস্যা রাতে কারও কান্না শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। কান্নার তো একটা উতস থাকবেই। শব্দটা কোথায় হচ্ছে তা নির্ধারণ করে টর্চের আলো ফেলতেই- আমাদের পাড়ার রিপনদার সাথে স্বপ্নাকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় জড়িয়ে আছে দেখতে পেলাম।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ২৪

এক হোটেল দুই কর্মচারী ছিল। একজনের নাম কালো, আরেকজনের নাম ধলো। কালোর হায়ের রং কালো। ধলোর গায়ের রং ধলো। কালো আর ধলো হোটেল বয় হিসেবে কাজ করে। হোটেলে লোকজন আসলেই, ডাক দেয় ধলো কই রে। ধলোর সাথে লোকজন গল্প করে। এই হোটেলে তার কাজ করে কেমন লাগছে, বাড়িতে কে কে থাকে, এইখান থেকে কত টাকা পায়, চলে কিনা। ধলো বসে বসে লোকজনের সেই সব কথার উত্তর দেয়। আর লোকজন কালো ডাক দিয়ে বলে- এই চা টা নিয়ে আসলি এখনও। এই এখনও সিগারেট দিলি না। কালোর সাথে কেউ আলাপ করে না, এই হোটেলে কাজ করতে কেমন লাগে, টাকা কত পায়, তাতে তার চলে কিনা। এই নিয়ে কালোর মন ধীরে ধীরে খারাপ হয়। ধীরে ধীরে ধলোর ওপরে তার রাগ বাড়তে থাকে। কিন্তু কিছু বলে না। ধলোকে ম্যানাজারও কিছু বলে না। যা বলার সব কালোকেই বলে। মানে এইটা হলো না কেন, এইটা হলো কেন- সব কিছুর জবাবদিহিতা যেন কালোরই, ধলোর নয়। ধলো শুধু বসে বসে খাবে। এমনকি ম্যানেজার হোটেলে না থাকলে ধলোকে বসিয়ে দিয়ে যায়। কালো হোটেলের সব কাজ করে। আমরা ভাবলাম বড় হয়ে ধলো হোটেলের ম্যানেজার হবে। ম্যানেজার হওয়ার সমস্ত সামাজিক সাপোর্ট সে পেয়ে যাচ্ছে। আর কালো হোটেল বয়ই থাকবে। কারণ সমাজ তাকে হোটেল বয় হিসেবেই চায়। ধলো সাপোর্টটা পেত কারন তার গায়ের রং ফর্সা। সবাই তার সাথে অগোচোরেই কথা বলতে চাইত। আর কালো সাপোর্টটা পেত না। কারণ তার গায়ের রং কালো। লোকজন তার সাথে কথা বলতে চাইত না। অগোচোরেই চাইত না।

আমার মনে হল কালো ছেলেটি হয় ধলো ছেলেটিকে নানাভাবে নানা জায়গায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় কেউ কেউ হত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে। কারণ সে বিশাল অংশের সমাজকে কিছুই বলতে পারে না। কিন্তু রাগটা ঝেড়ে বসে প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর। এতখানি সিরিয়াস পর্যায়ে যে এই ঘটনাটা যাবে তা নয়। তবে কখনও কখনও এরকম ঘটে। ওদের মধ্যেকার সম্পর্কগুলোতেও এরকম আলামত পাওয়া গেছে। প্রায়ই হোটেলে তাদের মধ্যে মারপিট ঘটে। কখনও কখনও কালো খেতে বসে খাওয়ার প্লেট ধলোর দিকে ছুড়ে পর্যন্ত দিয়েছে, যদিও সে জানত হোটেলে এই এক প্লেটের বেশি ভাত আজ আর তাকে দেওয়া হবে না। পরে আবার তারা মিলেমিশে কাজ করেছে। কালো হয়ত ভেবেছে মিলেমিশে না থাকলে ধলোর হয়ত কিছু হবে না, কিন্তু চাকরিটা থাকবে না তার নিজেরই। ধলোও আর কিছু বলে নি। কিম্বা ধলো সমাজের সাপোর্টগুলো দ্রুত পেয়ে যাওয়াতে তার মধ্যে বুদ্ধি বা চালাকি বা অন্যকোনও ভাবে সারভাইব করার বিষয়টা তার ঘটেনি। বা প্রয়োজন পড়েনি। যারফলে সে কিছুটা বোকা টাইপের। এইভাবে তারা হোটেলে কাজ করতে থাকল।

এরপর প্রায় দীর্ঘ বিশ-পঁচিশ বছর সেই হোটেলে যাওয়া হয়নি। আজ অনেকদিন পর সেই হোটেল ঢুকলাম। হোটেলটির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেকদিন পর যে কোনও কিছুরই পরিবর্তন চোখে পড়ে। কোনো কোনোটা ভালো পরিবর্তন, আবার কোনোকোনোটা খারাপ পরিবর্তন। হোটেলটির ভাল পরিবর্তন হয়েছে। মানে হোটেলটি বড় হয়েছে। বসার বেঞ্চ বেড়েছে। কলিং বেল লাগানো হয়েছে। কর্মচারী বেড়েছে। হোটেলের সামনে অনেক বড় চুলা বসানো হয়েছে। হোটেলের পেছনে বেশ বড় কিচেন রুম। যে হোটেলে আগে তেমন লোকজন দেখা যেত না, সেই হোটেলে হাট-বাজারের মত লোকজন। আগের পরিচিত কাউকে পাব না বরেই ধরে নিয়েছিলাম, মানে মালিককে হয়ত বা দেখতে পাব কিন্তু কালো ও ধলোকে নিশ্চয়ই দেখতে পাব না। আমি এক কোণায় বসে চাএর অর্ডার দিয়ে ম্যানাজারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ম্যানেজার দুই-একবার আমার দিকে তাকিয়েছে, কিন্তু এত বেশি লোকজনের টাকা -পয়সা নিতে হচ্ছে সে হয়ত কাউকেই ঠিকমত চেনে না বা পরিচিত কেউ হোটেলে এলেও টের পায় না। বা এই হোটেল ম্যানাজারকে আমিও চিনি না। সে আমাকে চিনবে কেমন করে। আমি কালো আর ধলো এখন কি করতে পারে, এরকম কিছু চা খাচ্ছিলাম আর মাথা নিচু করে ভাবছিলাম। ম্যানেজার আমার বেঞ্চের পাশে বসে জিজ্ঞেস করল- স্যার কিছু যদি মনে না করেন, একটা প্রশ্ন জিগাই। আমি বললাম- বলেন। ম্যানাজার বলল- স্যার আপনি অমুক না। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম-হ্যাঁ। ম্যানাজার আমাকে বলল- স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না। আমার নাম কালো। আমি অবাক হয়ে বললাম- কি বললা, তুমি কালো। ধলো কোথায়, আগের ম্যানাজার কোথায়। কালো হেসে হেসে বলল- সে অনেক কথা স্যার। আপনি অনেক দিন পর হোটেলে এসেছেন। দুপুরের খাবার খেয়ে যাবেন। একসাথে খাব। সব বলব।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ২৫

প্রতিদিন আমি ঘুম থেকে ওঠে আমার ঘরের জানালা খুলতেই একটা কিছু দেখতে পাই। কখনও কখনও খুবই স্বাভাবিক কিছু। কখনও কখনও এতটাই অস্বাভাবিখ যে সেসব ভাষায় প্রকাশ করাটাও অনেকটা দূষনীয় পর্যায়ের। একদিন আমি আমার ঘরের জানালা খুলতেই দেখতে পেলাম একটা রিক্সা যাচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। স্বাভাবিক মানে খুবই স্বাভাবিক। আবার একদিন জানালা খুলতেই দেখি রেলিং এ একটা কনডম আটকে আছে। উপর তা

লার কেউ সেক্স করে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। মানুষের আসলেই কোনও কান্ড জ্ঞান নাই। এই বিষয়টা বলাও যায় না। কেমন দূষনীয় দূষনীয় মনে হয়। আবার বাড়ি ওয়ালাকেও বলা যায় না যে ওপরের তালার লোকজন সেক্স করে কনডম জানালা দিয়েই ফেলে দেয় এবয এটা মাঝে মাঝে আমার জানালার রেলিং এ আটকে থাকে। তবে একদিন জানালা খুলেতই আমার মন ভাল হয়ে গিয়েছিল। আমি যে সময়টায় জানালা খুলেছি, ঠিক সেই সময়ে পাশের লাগোয়া ফ্ল্যাট বাসার একটা মেয়েও মানে অপূর্ব সুন্দরী অষ্টাদশী মেয়েও জানালা খুলেছিল। মন ভালো হওয়ার কারণ শুধুমাত্র এই আষ্টাদশী দর্শন নয়, আমি জানালা খুলেছি দেখে মেয়েটি তখনই তাদের ঘরের জানালা বন্ধ করে দিয়েছিল। একদিন জানালা খুলতেই আমি ফুটন্ত রক্তজবা ফুল দেখেছিলাম। মানে ঢাকা শহরে এই রক্তজবাটি ফোটার পর সম্ভবত আমিই প্রথম মানে সবার আগে দেখেছিলাম। এভাবে প্রতিদিন জানালা খুললেই আমি একটা কিছু দেখি। মানে প্রতিদিন জানালা খোলার সাথে সাথে একটা কিছু দেখব বলে মোটামুটি প্রস্তুত থাকি। সেটা স্বাভাবিকও হতে পারে, আবার অস্বাভাবিকও হতে পারে।

সাধারণত মানুষের স্বাভাবিক দৃশ্যের কথা মনে থাকে না। অর্থাত সাধারণত মানুষ অস্বাভাবিক দৃশ্যগুলো মনে রাখে। অতীতে আমি বেশ কিছু অস্বাভাবিক দৃশ্য আমি দেখেছি। জানালা খুলতেই সেইসব অস্বাভাবিক দৃশ্য আমাকে নাড়া দিয়েছে। সংগত কারণে সেই সব মনেও আছে। একদিন আমি সকাল বেলা, বাইরে ব্যাপক বৃষ্টি, জানালা খুলতেই একটি রিক্সা উল্টে যেতে দেখেছিলাম। একদিন আমি বাড়িওয়ালাকে পা পিছলে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখেছিলাম। এরকম অনেক অনেক কিছু। প্রতিদিন এভাবে আমি জানলার কাছে যাই আর আমার মনে হয় আজ কিছু একটা দেখব। এভাবে জানালা খুলে আগে হয়ত ৫ মিনিট বাইরে তাকাতাম। ধীরে ধীরে এটা ঘণ্টায় পৌঁছাল। মানে জানালার পাশে দাঁড়িয়েই দাঁত ব্রাশ করতাম। জানালার পাশে দাঁড়িয়েই নাস্তাটা শেষ করে নিতাম। আর অপেক্ষা করতাম একটা বিশেষ কিছু দেখার। জানালার প্রতি এভাবে আমার আকর্ষণ দিনকে দিন বাড়তেই থাকল। একদিন জানালার আশে-পাশে অনেক ময়লা জমেছে বলে বাড়িওয়ালাকে অভিযোগ করলাম। বাড়িওয়ালা যথারীতি সেসব পরিস্কারও করে দিলেন। জানালার কাছ থেকে দেখা দৃশ্যের প্রতি দিন দিন আমি কেমন যেন বন্দী হয়ে গেলাম। আমার কেন যেন মনে হতে থাকল পৃথিবীতে যদি মনোমুগ্ধকর কোনও দৃশ্য থাকে, পৃথিবীতে ভালোলাগার যদি কোনও দৃশ্য থাকে, পৃথিবীতে না দেখা যদি কোনও দৃশ্য থাকে, পৃথিবীতে মহত-অনাবিষ্কৃত, বিশেষ যদি কোনও দৃশ্য থাকে তা কেবল এই জানালা দিয়েই দেখা সম্ভব। আর তাই এই জানালা আমার বন্ধু হয়ে গেল, এই জানালা এখন একেবারে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হঠাত একদিন বাড়িওয়ালা আমাকে ডেকে বললেন- আপনাদের ফ্ল্যাটের দক্ষিণ পাশের জানালাটা না খুললেই কি নয়।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ২৬

আজ রিক্সার জ্যামে যখন অনেকক্ষণ ধরে বাধ্য হয়ে বসে আছি, তখন একটি মেয়ের দিকে চোখ চলে গেল। মেয়াটাকে চিনি চিনি মনে হল। কোথায় যেন দেখেছি। কোথায় যেন। নামটা একদমই মনে করতে পারছিলাম না। পড়ে মনে হল সে আসলে আমাদের বুড়িদির মত দেখতে। আসলে কোথাও দেখি নি তাকে। পরিচিতও নয়। কিন্তু বুড়িদির চেহারার সাথে অনেক মিল। আমি যখন একেবারে ছোট, মানে শৈশব যখন আমার, তখন একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল বুড়িদি। বুড়িদি নামটা কেমন অদ্ভুত না। বুড়ি। নিজে নিজেই কিছুক্ষণ হাসলাম। বুড়িদির নাম নাকি বুড়ি রাখা হয়েছিল এই কারণে যে সে ছোট বেলা থেকেই বড়দের মত মানে প্রাপ্ত বয়স্কদের মত কথা বলত। এজন্য ওর মা-বাবা নাম রেখেছিল বুড়ি। আমরা তাকে বুড়িদি বলে ডাকতাম। সে কোথাও বেড়াতে যাবে, কোথাও খেলতে যাবে, এই বাড়ি না ওউ বাড়ি যাবে, এসব জায়গায় যাওয়ার আগে প্রথমে বুড়িদি আমাদের বাড়িতে আসত। তারপর আমার মাকে বলে সাথে নিয়ে নিত আমায়। ওদের বাড়িতে দুইটি বড়ই গাছ ছিল। আমরা যে কত বড়ই পেরে খেতাম।

বুড়িদির সাথে আমার এতই ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গেল যে একসময় ওদের বাড়িতেই থাকতাম। আমার মাও অবশ্য বুড়িদির কাছে আমি আছি জেনে নিশ্চিন্ত থাকত। ওদের বাড়িতেও দুপুরের খাওয়া-রাতের খাওয়া অনেক সময় ওদের বাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়তাম। অবশ্য রাতে আমার বাবা বাড়ি ফিরলে আমাকে ওদের বাড়ি থেকে নিয়ে যেতেন। আমার ইচাছার কথা, আমার রেগে যাওয়ার কথা, আমার ভালোলাগার না লাগার কথা সবই বুড়িদিকে বলতাম। একদিন বুড়িদিকে বলেছিলাম- বুড়িদি আমার পুকুরে খুব বর্শি দিয়ে মাছ ধরার ইচ্ছা। মা-বাবা কখনই আমাকে বর্শি কিনে দিবে না। তুমি কি আমাকে একটা বর্শি কিনে দিবে। সে বলল- আচ্ছা দেব। আমি ভেবেছিলাম- ও এমনি এ কথা বলেছে। ওমা পরদিন সকালেই দেখি সে আমাদের বাড়িতে বর্শি নিয়ে হাজির। ওহ্ সেদিন আমরা দুজনে কত্তগুলা যে পুঁটি মাছ ধরেছিলাম। ময়দা গুলিয়ে বর্শির গায়ে লাগিয়ে পুকুরে ফেলতাম। বর্মির সুতা নড়তেই দিতাম টান। ওমনি পুঁটি মাছ। সেদিন দুপুর বেলা বুড়িদি সবগুলো পুঁটি মাছ কুটে ভাজি করেছিল ওদের বাসায়। আমরা কাউকে এগুলো খেতে দেই নি। দুজনে মিলে সবগুলো শেষ করেছিলাম।

এই বুড়িদির কারণে আমি কোনও দুষ্টামিই করতে পারতাম না। কোনকিছু করলেই সে সরাসরি আমার মা-বাবাকে গিয়ে বলে আসত। এই ভয়ে বুড়িদির সামনে খুব ভদ্র হয়ে থাকতাম। একদিন আমি একা একা হাঁটতে হাঁতে অন্য পাড়ায় চলে গিয়েছিলাম। বুড়িদি আমাকে বাড়িতে আর আমাদের পাড়ায় না পেয়ে অন্য পাড়ায় গিয়ে খুঁজে বের করে। পরে আমার মাকে গিয়ে সব বলে দেয়। সেদিন মা আমাকে অনেক বকেছিল। এরপর আর কখনই একা একা অন্য পাড়ায় যাইনি। আমাদের পাড়ার কোনও খারাপ ছেলের সাথে মিশতে দেখলেই সে আমাকে ধমকিয়ে নিয়ে যেত। বুড়িদি আমাদের সাথে অনেক গল্প করত। বলত- সে কখনই খারাপ ছেলেদের দেখতে পারে না।

একদিন বুড়িদিকে বাসায় খুব কাঁদতে দেখলাম। আমি সাহস করে সেদিন বুড়িদির কাছে যাই নি। বাড়িতে এসে মাকে বললাম- মা, বুড়িদি বাসায় অনেক কাঁদছে। কি হয়েছে ওদের। মা বলল- তোর বুড়িদির বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি তখন ভেবেছিলাম- বুড়িদির বিয়ে হচ্ছে মানে বুড়িদি আর নিজের বাড়িতে থাকবে না। সেজন্যই বোধহয় কাঁদছে। আমার খুব ভিতরে ভিতরে রাগ হল। মেয়েদের বিয়ে হরে কেন মেয়েরা নিজের বাড়িতে থাকতে পারে না। আমারও মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুড়িদির বিয়ে হয়ে গেলে আমি কার সাথে খেলব। বুড়িদির কান্না দেখার পর আমি একদিন-দুইদিন করে এক সপ্তাহ ওদের বাড়িতে যাই নি। ওদের বাড়িমুখো গিয়েছি। পরে কি মনে করে আবার আমাদের বাড়িতে চলে এসেছি। সেও আমাদের বাড়িতে এই একটা সপ্তাহ আসেনি। আগে যার একটা দিনও আমাদের বাড়িতে আসতে মিস হত না, এক সপ্তাহ টানা সে আমাদের বাড়িতেই এল না। আমি বুঝতে পেলাম- নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। অনেক বড় কিছু। একদিন মা আলাপ করছিলেন- বুড়িদির সাথে যার বিয়ে ঠিক হয়েছে, সে ভাল ছেলে না। সে নাকি রাজনীতি করে আর এলাকায় নানান কাজ করে আয়-রোজগার করে। বুড়িদি যে কিনা একদম খারাপ ছেলেদের দেখতে পেত না, সেই বুড়িদির সাথে খারাপ ছেলের বিয়ে হল। বাড়ির চাপ, মানে বাড়িতে হয়ত সবাই মনে করেছে রাজনীতি করা ছেলে, এলাকার প্রভাবশালী, অনেক টাকা-পয়সা, মেয়ে সুখেই থাকবে। বুড়িদির বিয়ে হয়ে গেছে কতদিন হল। বুড়িদিদের বিয়ে হয়ে যায় ওদের অমতেই, কাউকে পছন্দ না হলেও। বুড়িদির কি হাসবেন্ডের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখতে পেরেছে? হয়ত পেরেছে মানে পারতে হয়েছে। বুড়িদি কি তার হাসব্যান্ডকে খারাপ রাজনীতি থেকে সরিয়ে আনতে পেরেছে? হয়ত পারি নি। হয়ত মেনেই নিয়েছে সব। বুড়িদিদের সব মেনে নিতে হয়। বুড়িদিদের সব মেনে নিতে হয় কেন?

 ফ্ল্যাশ ফিকশন- ২৭

নৌকা ভ্রমন একেবারে নিজের মত করে মানে ঘটা করে নয়, হই হুল্লোর করে নয়, নিরবে-নিভৃতে নৌকা ভ্রমনটা সাধারণত করা হয় না আমাদের। কিন্তু সেই করা না হওয়াটা আরাধ্য করতেই আমি আর বীথি আজ নদীর পাড়ে। শহর থেকে নদীর পাড়ে এসে পৌঁছতে দুপুর চলে এল। এই নদী মানুষ এ পার থেকে ওপারে যাতায়াতের জন্য খুব একটা ব্যবহার করে না। তাই বরাবরই লোকজন থাকে কম। আজ এই ভর দুপুরে যেন আরও কম। বেদেদের ণৌকাগুলো সারি সারি করে রাখা। কয়েকটি বেদে পরিবারের মানুষজনকেও দেখা যাচ্ছিল। তারা ণৌকায় বসে রান্না করছে। ঘাটে এসে আমরা একটা নৌকা ভাড়া করলাম। সারাদিনের জন্য ৫০০ টাকা। লোকটা খুব খুশি। এত টাকা দিয়ে ণৌকা সাধারণত ভাড়া করে না কেউ। এখানে যারা আসে, তাদের অধিকাংশই প্রেমিক-প্রমিকা। ১ ঘণ্টার জন্য বা দুই ঘণ্টার জন্য নৌকা ভাড়া করে ঘুরে। তাতে ১ ঘণ্টার জন্য ৫০ টাকা করে দিতে হয়। কিন্তু আমি নৌকাটা একেবারে নিজের করে নিলাম। মানে নৌকাটা আমি চালাব। মাঝি লাগবে না। নিজের মত করে চালাব। মাঝি একবার জিজ্ঞেস করলেন- আপনি আগে কখনও নৌকা চালাইছেন? টাকার লোভে পরে হয়ত আর কিছু বলেনি বা বলতে চায় নি। কেবল একবার বিড়বিড় করে বলল- ভরদুপুরে মাঝ নদীতে যাবেন না স্যার। আমি অবশ্য নৌকা আগে চালিয়েছি। আমাদের বাড়িতেই বিশাল বড় পুকুর রয়েছে। পুকুরের তত্ত্বাবধানের জন্য প্রায়ই বাবা আমাকে পাঠাতেন। তখন নৌকা চালিয়ে চালিয়ে পুকুরের এপার থেকে ওপার ঘুরে বেড়াতাম।

বীথু একটু ভীতু টাইপের। নদী এলাকার মানুষ হবার পরও সাঁতার শেখেনি। নদীর জল আমাকে যতটা না আবেগী করে তুলে, বীথিকে ঠিক ততটাই ভয়ার্ত করে তুলে। বীথির ধীরে ধীরে নৌকায় পা পড়ল। একটু ভয়, একটু রোমাঞ্চ, একটু আবেগ নিয়ে বীথি নৌকার এক পাশে বসল। আমি ধীরে ধীরে নৌকা চালানো শুরু করলাম। আমার নৌকা চালানো দেকে বীথি খুব খুশি। আমি নৌকা চালাতে পারি, এটা তার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। মানে সকল পুরুষ মানুষের বোধহয় নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হয়, তা না হরে সে পুরুষ না। মানে সাহসি না মানে নারীকে নিয়ে চলার মত না। মানে যে পুরুষ নৌকাই চালাতে পারে না, সে কিভাবে একজন নারীকে নিয়ে ঘর-সংসার করে। নৌকার বৈঠায় এক এক করে যখন ভর দিচ্ছিলাম, নদীর স্রোত, জলের শব্দ আর বাতাসের আনাগোনায় একটা নিবিড় ছন্দের সৃষ্টি হয়েছিল। আমার গান গাইতে ইচ্ছে হল। গান ধরলামও। ওরে সাম্পানের নাইয়া। বীথিও বেশ উল্লসিত। এতটাই উল্লসিত যে বীথি আনন্দে এই থরথর নৌকায় নাচানাচি করবে এরকম পরিস্থিতি। কিন্তু নৌকা যখনই এদিক সেদিক হেলে যায়, তখনই সে ভয়ে চুপ হয়ে যায়। বীথিও অবশ্য আমার সঙ্গে গান ধরল।

ধীরে ধীরে আমাদের নৌকা একেবারে মাঝ নদীতে এসে পৌঁছাল। ভর দুপুরে মাঝ নদীর দৃশ্য আসলেই অন্যরকম। চারপাশে তাকালে কিছুই দেখা যায় না। কেবল জল আর জল ছাড়া। কেবল জল আর জল ছাড়া। রোদ-জল আর বাতাসের যাচ্ছেতাই খেলাটা কেবল ভরদুপুরে মাঝ নদীতে আসলেই দেখা যায়। দুপুরের এই সময়টায় নদীতে জোয়াড় চলছিল। এতে কেমন আরও উন্মত্ত, প্রাণোচ্ছল মনে হচ্ছিল নদীকে। আমি একবার নদীর দিকে তাকালাম, আরেকবার বীথির দিকে। এইভাবে কয়েকবার। এই মাত্র মনে হল এত উন্মত্ত নদী আগে কখনই দেখিনি। নদীটি কি যেন চাইছে। আমি হাত বাড়িয়ে নদীর জল ছুঁয়ে দেখলাম। বীথিও আমার মত নদীর জল ছুঁয়ে দেখতে চাইল। ও সাঁতার জানে না তাতে কি, ও যদি নদীতে পরে মরে তাতে কি, নদী যদি আজকে ওকে নিয়ে যেতে চায় তাতে কি। ও জল ছূঁয়ে দেখুক। নদীর জল কেমন। আমি বারণ করলাম না। বীথি একেবারেই শিশুদের মত করে এক হাতে নৌকার একটা অংশ শক্ত করে ধরে নদীর জল ছুইল। একবার সাহস পাবার পর সে যেন একটা খেলা পেয়ে গেল। যেন সে আগে কখনই জল ছোঁয় নি। সে বারবার নদীর জল ছুঁইতে শুরু করল। নৌকাটা একটু নাড়িয়ে দিলেই বীথি পড়ে যাবে। ও যখন হেলান দিয়ে নদীর জল ছোঁয়ার চেষ্টা করল তখন একবার মনে হল নৌকাটা একটু নাড়িয়ে বীথিকে ফেলে দেই। এই ভরদুপুরে নদীর স্রোত আর বীথি। আমি একবার নৌকাটা নাড়ালাম। বীথি চিতকার করে ওঠল। খবড়দার। নৌকা নাড়াবে না। বীথি কি টের পেল আমি ওকে ফেলে দিতে চাচ্ছি। নদী ওকে চাচ্ছে।

হঠাত খেয়াল করলাম- মাঝ নদীতেই আমাদের থেকে অল্প দূরে আরেকটি নৌকায় একজন বেদেনি আমাদের দেখে হাসছে। আমি এতক্ষণ ভেবেছিলাম মাঝ নদীতে কেবল আমরা দুজনই। বেদেনি চিতকার করে বলছে, ও স্যার, মাঝ নদীতে এসে গেছ। ভরদুপুরে কেউ মাঝনদীতে আসে না। আমি বুঝতে না পারলেও সন্দেহটা হল বীথির। বীথি আমাকে এবার তাগাদা দেওয়া শুরু করল। এই চল, চল। নদীর পাড়ে চলে যাই। আমি আস্তে আস্তে নদীর পাড়ে দিকে নৌকা ভেড়াতে শুরু করলাম। তখনই মনে পড়ল আমি কিন্তু বীথিকে নদীতে ফেলে দিতে চেয়েছিলাম। আমার ভিতরে কেন এমনটা হল। আমি কেন বীথিকে নদীতে ফেলে দিতে চাইলাম – এরকম ভাবতে যে মাঝির কাছে থেকে প্রথমে নৌকাটি ভাড়া করে এনেছি, তার বিড়বিড় করে বলা কথা মনে পড়ল; ভরদুপুরে মাঝ নদীতে যাবেন না স্যার।

 ফ্ল্যাশ ফিকশন- ২৮

শীতের সকাল। ঘুম থেকে ওঠেই মনে হল ছাদে যাই। শীতের রোদ গায়ে লাগলে খুব আরাম লাগে বিশেষ করে সকাল বেলা। হাত-মুখ ধুয়ে ছাদে ওঠতেই কেমন ভাললাগা তৈরি হল আমার ভিতরে। ছাদের ওপর অজস্র রোদ। মনে হচ্ছিল ওরা হি হি করে হাসছে আর নানা রকমের গল্প করছে। ছাদের ওপরে দাঁড়াতেই রোদটা গায়ে লাগল। শীতের দিনে রোদ গায়ে লাগলে খুব আরাম লাগে। কিন্তু গ্রীষ্মকালে রোদ গায়ে লাগলে খুবই খারাপ লাগে। শীতকালে মনে হয় প্রমেকার শরীর ঘেষে বসার মতন আরও বেশি করে রোদের শরীর ঘেষে বসি। শরীরে ভাললাগা কাজ করলেও ছাদে ওঠে কেন রিপনের কথা মনে পড়ল। রিপন আমার খুবই কাছের বন্ধু ছিল। ও প্রায়ই আমাকে বলত ছাদের ওপর থেকে কখনও মাটির দিকে তাকিয়ে দেখেছ? মাটি কিন্তু মানুষকে টানে। সেই রিপন একদিন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে। ও কেন আত্মহত্যা করেছিল, অনেক ভেবেছি। কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারি নি। এত কম বয়সী একটা ছেলে, এত পড়ুয়া একটা ছেলে, এত শান্ত স্বভাবের ভাল একটা ছেলে; কথা নেই, বার্তা নেই; ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে বসল। ও জীবনে এমন কিইবা ঘটল যে ওকে আত্মহত্যা করতে হবে। ওর মা-বাবা দুজনেই ছিল চাকুরিজীবী। একা একা ঘরে থেকে বড় হয়েছে। এইজন্য হয়ত একটু আতেল টাইপের ছিল। কিন্তু ঘরে থেকে থেকে ওর বই পড়া হয়েছিল। কত বইয়ের, বইয়ের কাহিনীর গল্প যে সে আমাদের সাথে করেছে। এমন কম বয়সী একটা ছেলে, কোনও মেয়ের সাথে যে সম্পর্ক ছিল সেটাও নয়, ঘুণাক্ষরে এইসব বিষয়ে তাকে কথা বলতে দেখিনি। একবার বলেছিল, ছোট বেলায় ও দড়ি নিয়ে গাছে ওঠেছিল মরার জন্য। ঠিক মরার জন্য নয় স্বর্গ আর নরক আছে কিনা সেইটা যাচাইয়ের জন্য। ওর কথা শুনে সেদিন আমরা হাসতে হাসতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। হেসে হেসে বলেছিলাম- তুই ব্যাটা আসলেই একটা আতেল। পারফেক্ট আতেল। আমাদের হাসি থামার পর সে বলেছিল, আমাদের দাদীকে বলতে শুনেছি যারা একবার আত্মহত্যা করতে যায়, তারা নাকি আত্মহত্যা করেই মরে। জীবনের কোনও না কোনও সময়ে সে নাকি আত্মহত্যাই করে। এই কথা শোনার পর আমাদের মুখ মলিন হয়ে গিয়েছিল। অনেকটা ভয়ও পেয়েছিলাম। সেই ছেলেটা সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করল।

আজ কেন যেন আমিও ছাদ থেকে নিচে বারবার তাকাচ্ছিলাম। ওর কথা মনে হচ্ছিল, ছাদ থেকে মাটির দিকে তাকালে মাটি মানুষকে টানে। মানুষ যতই উপরে উঠে মাটি ততই মানুষকে টানে। ছাদের কার্ণিশ ঘেষে বসে, উপর হয়ে, নিজের মুখটা একেবারে মাটিমুখো করে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। মাটি কিভাবে মানুষকে নিচের দিকে টানে। মাটি আসলেই নিচের দিকে টানে। মানুষ কি আসলেই যত উপরে উঠে, মাটি তাকে ততই নিচের দিকে টানে? এরকম ভাবতে ভাবতে একবার মনে হল আমি যদি ছাদ থেকে লাফ দেই, তাহলে কেমন হবে। মানুষ মরে গেলে আসরে কি হয়? সবই তো আগের মত, সবই তো পৃথিবীর মতই থাকে। রিপন মরে গেছে তাতে কি হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও তো কিছু হয়নি। ওর মা-বাবা হয়ত কেঁদেছে। ভীষণ কেঁদেছে। এখন তো ওরা স্বাভাবিক। সব কিছুই তো স্বাভাবিক। কোনও কিছুই তো পাল্টায় নি। আমি মরলেই কি আর বেঁচে থাকলেই কি। পৃথিবীর তো কোনও ক্ষতিও হবে না, লাভও হবে না। না লাভ হবে। বেঁচে থাকলে বরঞ্চ পৃথিবীর আরও ক্ষতি হবে। আমার প্রেমিকার মানে যাকে আমি প্রেমিকা বলে মনে করি মানে যে আমাকে প্রেমিকা বলে মনে করে না, সে নিস্তার পাবে। আমার মা-বাবা, যাদের আমাকে পালতে হচ্ছে এখনও, যার কিনা এখন মা-বাবকে দেখার কথা; তাকেই এখনও মা-বাবাকে পালতে হচ্ছে আমার চাকরি না পাবার কারণে; তারা নিস্তার পাবে। বরঞ্চ পৃথিবীই লাভবান হবে। বরঞ্চ আমি বেঁচে থাকলে শুধু পৃথিবীর না, অনেকের জন্যই সমস্যা। আমার বরঞ্চ ছাদ থেকে লাফ দেওয়াই উচিত। মোটামুটি বেশ নিশ্চিত হয়ে গেলাম, মোটামুটি নয় একশ ভাগই নিশ্চিত হয়ে গেলাম, আমার বেঁচে থাকার দরকার নেই। মানে আমার ছাদ থেকে লাফ দেওয়া উচিত। আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি, একেবারেই প্রস্তুত, সে সময়েই আমার বোনের ডাকাডাকি- নাস্তা করবি না। আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। ছাদ থেকে নিচে নামলাম। নাস্তা খাচ্ছিলাম আর বারবার মনে হচ্ছিল আমি কিন্তু আজ সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম মানে একশভাগই নিশ্চিত ছিলাম মানে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আমি হয়ত আজ আত্মহত্যা করেই ফেলতাম যদি না আমার বোন নাস্তার খাওয়ার জন্য ডাক না দিত। তাহলে কি রিপনের কথাই ঠিক, মানুষ যতই উপরে উঠে, মাটি ততই তাকে নিচের দিকে ডাকে।

 ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ২৯

প্রায় এক বছর পর আবারও সেই রাঙ্গামাটিতে পৌঁছলাম, উদ্দেশ্য রাম-সীতা পাহাড়ের জীববৈচিত্রের জরিপ। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। আজ আর পাহাড়ে যাওয়া হবে না বলেই পাহাড়ের কাছাকাছি এই সন্ধ্যাবেলায় কোথাও কোনও হোটেল আছে কিনা তা বের করতে বেরিয়ে পড়লাম। পেয়েও গেলাম। আমার মত চুপচাপ একা একা থাকা মানুষের জন্য এমন নিরিবিলি একটা হোটেল পেয়ে যাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার বলতেই হয়। হোটেলটা নিরিবিলি তবে এত নিরিবিলি হোটেল আমি বোদহয় জীবনে এই প্রথম দেখলাম। হোটেলে ঢুকতেই ম্যানাজারের নজরে পড়লাম। ম্যানেজার বলল- পুরা হোটেল খালি। আপনি যেখানে থাকতে চান, সেখানেই থাকতে পারবেন। অফারটা অদ্ভুত এবং লোভনীয়। কিন্তু ভাল রুম কোনটা এটা মোটেই আমার জানার কথা নয়। তাই তাকে বললাম- আমি কোন রুমে থাকব, এটা আপনারই ব্যাপার। পুরো হোটেল ঘুরে ঘুরে দেখলেও আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না, কোন রুমটি আমার জন্য ভাল হয়। কেবল বললাম- একটু নিরিবিলি রুম হলেই হবে। লোকটা অদ্ভুত করে হাসে। হোটেলের ম্যানেজার কিন্তু দেখলে মনে হয়- ও জীবনে অনেকগুলো খুন করে করে এই পর্যায়ে এসেছে। কেমন কালো কুচকুচে চেহারা। যখন হাসে, তখন দাঁতের সাদা রং নয়, পানের লাল রঙ রক্তের মত ফিনকি দিয়ে ওঠে তার মুখে। সে হাসল। বলল- এই যে চাবি নিয়ে যান। দক্ষিণ পাশের রুমটা অনেক নিরিবিলি। সেখানে একসময় আমার পরিবার থাকত। এখন কেউ থাকে না। আমি চাবি নিয়ে রুমে চলে এলাম।

রুমটা পরিস্কার করার জন্য একজন ছেলে পাঠাল ম্যানেজার। ছেলেটি সবকিছু পরিস্কার করছে আর কি যেন বলার চেষ্টা করছে। আমি নিজেই তাকে বললাম, তোমার নাম কি? সে কিছু বলল না। আমি ভাবলাম- সে বোধহয় বাংলা জানে না। চেহারা আদিবাসীদের মত। রাম-সীতা পাহাড়ে অনেক মারমা আদিবাসী বসবাস করে। অনেক গরীব ওরা। আমিও আর তার সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলাম না। রুম ঝাড়ু-টারু দিয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে সে যখন চলে যাবে, সে তখন আমাকে এক নাগাড়ে বলে চলল আমার নাম রাম। আপনি এই এলাকায় নতুন এসেছেন, তাই না? আগে কখনও আসেন নি। এই রুমে ম্যানেজার স্যারের পরিবার থাকত। হোটেলের সবচেয়ে ভাল রুম এটা। ওরা কেউ বেঁচে নেই। মাঝে মাঝে ওদেরকে এই রুমে বেড়িয়ে যেতে দেখা যায়। এরকম বলে সে হেসে হেসে চলে গেল। আমার কোনও কথা শোনার বা জানার প্রয়োজন মনে করল না। কেবল হাসিটার ভেতরে অনেক অনেক দিনের অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে, তার একটা আঁচ টের পাচ্ছিলাম। আমি হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ভাবছিলাম- হোটেলের সবকিছুই রহস্যময়। ম্যানেজার, হোটেলের রুম এমনকি এই যে রাম কিছুক্ষণ আগে আমার সাথে কথা বলে গেল, সেও রহস্য করে হাসে। রুমটাও কেমন থমথমে। চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার এক টানা ডাক, মানুষের শব্দ বলে চারপাশে কোথাও কিছু নেই। টিভিটা চালানোর সময় একটা বড় লাল রঙের টিপ চোখে পড়ল। কেউ একজন টিভি স্ক্রিনের উপরে লাগিয়ে রেখেছে। হয়ত ম্যানেজারের বউ। ম্যানেজারের বউ এই রুমে থাকত। কিন্তু ওরা বেঁচে নেই। মাঝ বয়সী এই ম্যানেজারের বউয়ের বয়স আর কতই বা হবে, সে মরে গেছে। হয়ত কোনও অসুখে, হয়ত কোনও দুর্ঘটনায়। কিন্তু রাম এই কথা বলল কেন- মাঝে মাঝে ওদেরকে এই রুমে দেখতে পাওয়া যায়। আসলেই কি মানুষ মরে গেলে মানুষের প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়। যারা কম বয়সে মারা যায়, তাদের আত্মা নাকি পৃথিবীতেই থেকে যায়। নিজে নিজেই হাসলাম। প্রেতাত্মা বলে কিছু আছে নাকি? খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে তাড়াহুড়ো করে, সমস্ত রিসার্চ ইন্সট্রুমেন্ট রেডি করে পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হলাম। সকাল বেলা পাহাড়ে না গেলে, অনেক প্রাণী তো বটেই; পাখিদের একদমই চেনা যায় না। চেনা যায় না মানে সারাদিন ঘুরলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ ওরা সকাল বেলা বাসা থেকে বেরুয়, সারাদিন খাবার সংগ্রহ করে আর সন্ধ্যা বেলা বাসায় ফিরে আসে। সকাল বেলায় পাখিরা যখন বাসা থেকে বের হয়, সেই সময়টাই ওদেরকে ভাল করে চেনা যায় এবং অনেক পাখি দেখা যায়। দিনের বেলা খুব একটা পাওয়া যায় না। আর সন্ধ্যা বেলায় তো পাখি দেখার প্রশ্নই আসে না। হোটেলের মেইন গেঠে আসতেই দেখি ম্যানেজার আমাকে ডাকছে। লোকটা কি ঘুমায় না। এত ভোরবেলাতেও লোকটা জেগে আছে। ম্যানেজার ডেকে বলল- স্যার কোথায় যাচ্ছেন- রাম-সীতা পাহাড়ে? বেশিক্ষণ থাকবেন না স্যার। পাহাড় দুইটা ভাল না। আমি হাসলাম। বললাম কাজ সেরে সকাল দশটা এগারোটার দিকে নাস্তা খেতে আসব হোটেলে। কিন্তু পাহাড় দুইটা ভাল না এর অর্থ কি। আমি সকালে পাহাড়ে পৌঁছতেই দেখলাম দ্ভুত আদ্ভুত পাখিদের শব্দ। এক কলকাকলি যে আমি শব্দগুলো দিয়ে কোনটা কোন পাখি তা চিহ্ণিত করতে পারছিলাম না। সকাল আটটা পর্যন্ত আমি পাখিদের পেছেনই দৌঁড়ালাম। প্রচুর ছবি তুললাম। কোন কোন জায়গাগুলো পাখি বেশি দেখা গেল মানে ডেনসিটি বেশি তা চিহ্ণিত করলাম। পাহাড় থেকে নামতে নামতেই এগারোটা বেজে গেল। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেল আমার। আশে-পাশে বেশ কিছু চায়ের দোকান দেখতে পেলাম। একটা দোকানে পোরোটা আর চা খাচ্ছিলাম। লোকজন প্রথমেই বুঝেছে আমি এই এলাকায় নতুন। এবং এইও বুঝেছে আমি পর্যটক নই। পর্যটক হলে হই-হুল্লোড় করতাম। সাথে অনেকেই থাকত। একজন মারমা আদিবাসী নারী আমার সাথে কথা বলতে চাইল। অনেক ভোরে আপনি পাহাড়ে গেছেন, তাই না? তার চোখে বিস্ময়। আদিবাসী নারীটি চা য়ের দোকানে বসা লোকদের বলল- হ ভোরবেলায় সে পাহাড়ে উঠছিল। অনেক ছবি তুলছে। আমি হাসছিলাম। একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করল- কোথায় উঠেছেন। আমি বললাম এখানে একটা হোটেল আছে না। এইটাতেই। তারা বুঝতে পারল। বলল- হ ওই ম্যানেজার, এই ম্যানেজারের বউ- মাইয়া সীতা পাহাড় থেকে পইড়া মইরা গেছে। একজন বলল- সাবধানে থাইকেন। অনেকে বলে- এই ম্যানেজারই নাকি সিতা পাহাড় থেকে বউ-মাইয়া ফালাইয়া দিছে। হে নাকি কি স্বপ্ন দেখছে। সীতা পাহাড় নাকি তারে কি স্বপ্ন দেখাইছে। যারা জানে তারা কেউ এই হোটেলে থাকে না। দেখেন না। হোটেলে কাউরে দেখছেন। কথাগুলোর সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করলাম। ম্যানেজার বলছিল পাহাড় দুইটা ভাল না। রাম বলছিল- ম্যানেজারের বউ-মেয়ে হোটেলে বেড়াতে আসে। এরা বলছে- ম্যানেজারই তাদের পাহাড় থেকে ফেলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে আমি নিজে একটা বড় রহস্যের ভিতরে পড়ে গেলাম বলে মনে হল।

হোটেলে ফিরতেই ম্যানেজার বলল- আজ রাতে সীতা পাহাড়ের মন্দিরে কীর্তন বসবে। এখানকার সব মানুষই থাকবে। আমি হেসে বললাম- আচ্ছা থাকব। এই ম্যানেজারটা কেমন করে যেন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই ম্যানেজারই সীতা-পাহাড় থেকে তার বউ-মেয়েকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছিল। এই হোটেলে কেউ থাকে না। কারণ তার বউ-মেয়ে এই হোটেলে বেড়াতে আসে। এই ম্যানেজারের হাসলে কেমন পানের রং কেমন রক্তের মত ফিনকি দিয়ে ওঠে তার মুখে। এই ম্যানেজার কেন আমাকে সীতা পাহাড়ের মন্দিরে কীর্তন করার আমন্ত্রণ জানাল। এই ম্যানেজার কি আমাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে? এই ম্যানেজারের ভিতরে কি হত্যার নেশা আছে? এই ম্যানেজার কি আসলেই বিশ্বাস করে- সীতা পাহাড় তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে, সীতা পাহাড়ের জন্য আরও মানুষ তাকে দিতে হবে। আমার এসব ফালতু মনে হল। রাতে ম্যানেজারের সাথে সীতা পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হলাম। রাম হোটেলের ছাদ থেকে আমাদের লক্ষ্য করছিল। কেন যেন আমাদের সামনে আসেনি। আমরা এত বড় পাহাড় চুড়া, হারিকেন জ্বেলে উঠতে উঠতে ম্যানেজার বলছিল- বুঝলেন স্যার। এই সীতা পাহাড়টা অনেক কিছু চায়। এখানে আসলে একবার এই সীতা পাহাড়ের কাছে আসলে কেউ ফিরে যেতে পারে না। আমি তার বউ কি কারণে মারা গেছে, তা বলার সাহস করলাম না। পাহাড়ের চূড়ায় রাতের বেলায় মন্দিরে বসে আমরা কীর্তন করছি। অদ্ভুত এক দৃশ্য। অদ্ভুত এক আনন্দ। অদ্ভুত এক জীবন্ত পাহাড়। মনে হচ্ছিল এই পাহাড় সত্যি নেচে ওঠে। এই পাহাড় সত্যি কিছু একটা চায়। মন্দিরে কীর্তন করতে করতেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি সেখানে। সকালে ওঠে দেখি কেউ নেই। আমি নিজে নিজেই পাহাড় থেকে নেমে সোজা হোটেলে চলে আসি। ঢাকা থেকে জরুরি ফোন আসে। মানে ঢাকায় চলে আসতে হবে। এইবার কোনও কাজই হল না। এই মাসেই আবার আসতে হবে। ব্যাগ-ট্যাগ গুছানোর সময়- রাম এসে জিজ্ঞেস করল, স্যার জানেন না? আমি বললাম কি? ম্যানেজার স্রার পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেছেন। মাথাটা একদম ধরে বসল। কাল রাতেই সে মন্দিরে যাওয়ার পথে আলাপ করছিল- এই পাহাড়টা অন্যরকম। এই পাহাড়টা অনেক কিছু চায়। নিজের কিছু মানুষ। আমার ঢাকায় যাওয়া হল না। মৃত দেহ সতকারের কাজ করতে হবে। এই ম্যানেজারের রাম ছাড়া আর কেউ নাই। আমার থাকতেই হবে। মনে পড়ল- ম্যানেজার একবার বলেছিল- এই পাহাড়া যে একবার আসে, সে কখনই ফিরে যেতে পারে না।

 ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ৩০

আজ দেখলাম ফার্মগেটে এক কোনায় বসে একটা মেয়ে হাসছে যে শুধু হাসছেই। মানে বুঝলাম না। মেয়েটি এত হাসছে কেন? তার এই হাসি দেখে আমারও হাসি পেল। দেখলাম কিছুক্ষণ পর তার সাথে আরেকটা বুড়ো লোকও হাসিতে যোগ দিল। অল্প কিছুক্ষণ পর দেখলাম একজন মহিলাও তার সাথে হাসছে। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং মনে হল। বিষয়টা আসলেই কি এটা জানার জন্য আমি ওদের কাছে গেলাম। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম। কি ব্যাপার এখানে আপনারা সবাই এত হাসছেন কেন? আমি যাওয়ার পরপর আরও কয়েকজন সেখানে এসে হাসতে লাগল। মেয়েটা বলল- আমি হাসছি। কারণ আমি সবার হাসি মুখ দেখতে চাই। দিন দিন আমরা কেবল বিষণ্ণ থেকে বিষণ্ণ হয়ে পড়ছি। আমাদের অনেক হাসিমুখ থাকা দরকার। সমাজের সব খানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দরকার এই হাসিমুখ। কিন্তু হাসিমুখ একদমই দেখা যায় না। কিন্তু চুপ করে বসে থাকলে তো চলবে না। কাউকে না কাউকে এর দায়িত্ব নিতে হবে। মাথায় বুদ্ধি এল। একজনের হাসতে দেখলে আরেকজন মানুষ অবশ্যই হাসবে। তাই হাসছি। আপনিও হাসুন।

 ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩১

এক দেশে ছিল দুই বন্ধু। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এক সাথে শেষ করে এখন তারা দু’জন দুই দিকে চলে গেছে। এদের একজন ছিল খুবই মেধাবী আর পড়ুয়া। বই দিয়ে রাখলে সারাক্ষণ সে বই নিয়েই বসে থাকে। তার জগত বলতে এই শুধু বই আর বই। ও প্রেমেও পড়ে বইয়ের নায়িকাদের। কষ্টও পায় বইয়ের কথায়। আরেকজন ছিল বিপ্লবী। মানে কলেজে এসেছে, সেখানে বিপ্লব। সারাদিন ঘুরবে,সেখানে বিপ্লব। প্রেম করছে, সেখানেও বিপ্লব। বইয়ের প্রতি তার কোনও ভাললাগা ছিল না। পড়ত, তবে বইটা তার ধান-জ্ঞান ছিল না। মানে বইয়ের ভেতরেও সে বিপ্লব খুঁজে বেড়াত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে কখনও বই ধরে দেখেছে কিনা সন্দেহ আছে। আন্দোলন আর আন্দোলন। যেন কালই শুরু হবে বিপ্লব। কালই ভেসে ওবে তার স্বপ্ন। কালই পেয়ে যাবে সে যা চায় প্রাণপণে। আর ওই বন্ধুটিকে বাইরে তেমন দেখা যেত না। ডিপার্টমেন্ট-ক্লাশ-রুম ছাড়া সে তেমন কোথায় বেড়িয়েছে বলে অনেকেই জানে না। আমরা ভাবলাম বই পড়ুয়া ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে আর বিপ্লবী ছেলেটি পার্টির হোল টাইম কর্মী হবে। কিন্তু পড়ুয়া ছেলেটিকে বিশ্ববিদ্যালয নিল না। কারণ সে রাজনীতি করে না। কারণ সে রাজনীতি বুঝে না। অ আও বুঝে না। খালি বই আর বই। ওদের ক্লাশে সে সেকেন্ড সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হল। তাকে নেওয়া হল না। শেষে তার এমন অবস্থা কোথাও চাকরি পাবে, আদৌ তার কোনও চাকরি হবে কিনা বা চাকরি পাবে কিনা এরকম অবস্থার মধ্যে পড়ে গেল সে। কোনও রকমে সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা দেবার বয়স পার হবার আগে-ভাগে একটা চাকরি জেটে গেল তার। মফস্বলে পোস্টিং। মফস্বলই তার ভাল লাগে। ঢাকা তার ভাল লাগে না। আর বিপ্লবী ছেলেটি তো বিপ্লব নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু চলতে তো হবে। ঢাকা ছাড়া বড় নেতা হওয়া যায় না। কিছুদিন সে পার্টিতে থেকে দেখা গেল একটি ইন্টারন্যাশনাল এসজিওতে বড় পদে ঢুকে গেল। সেই দুই বন্ধরই আজ দেখা হল হঠাত। কি একটা কাজে পড়ুয়া বন্ধুটি ঢাকায় এসেছে। রাস্তাতেই নিজের গাড়ি করে যাচ্ছিল অফিসে। বিপ্লবী বন্ধুটিও খেয়াল করল পড়ুয়া বন্ধুটির মতো একজন আট নম্বর বাসে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু উঠতে পারছে না। বারবার খেয়াল করে নিশ্চিত হল যে এটা পড়ুয়া বন্ধুটিই। গাড়ি থেক নেমে নাম ধরে ডাকতেই পড়ুয়া বন্ধুটি চিনতে পারল এটা সেই বিপ্লবী বন্ধু। এই ভিড়ের ভেতরে দুইজনে কোলাকুলি করল। পড়ুয়া বন্ধুটি অবশ্য এরকম অবস্থায় কোলাকুলি করতে চায় নি। কিন্তু বিপ্লবী বন্ধুটি যেহেতু নেতা- মানে নেতা সুলভ মানে মানুষকে বুকে টেনে নেওয়াটাই তার বাসনা তাই তারা কোলাকুলি করল।

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- চল।
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- কোথায়?

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- আমার গাড়িতে।
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- না মানে আমি মতিঝিলের দিকে যাব।

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- পথে যেতে যেতে সব কথা হবে। তোকে মতিঝিলে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাব।
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- আচ্ছা, ঠিক আছে।

বিপ্লবী বন্ধুটির অনেক সংকোচ-দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, পূর্বেকার বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সবকিছুই অনেক ভয়ে ভয়ে রাখত পড়ুয়া বন্ধুটিকে। সেই ভয় এখনও যায় নি। এই যে নিজের গাড়ি করে সেখানে পৌঁছে দিয়ে আসব। ঢাকা শহরে তারপর আবার নিজের গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে আসবে এর মধ্যে বড় ধরণের একটা নেতৃত্ব সুলভ আচরণ রয়েছে আবার পড়ুয়া বন্ধুটির আশঙ্কাও রয়েছে যে ছেলে সারাক্ষণ বিপ্লব বিপ্লব করে ঘুড়ে বেড়াত তার নিজের গাড়ি, কি করে সম্ভব এসব, নিম্চয়ই এখানে একটা বিপ্লবী চটকদারী আছে; এরকম ভেবে ভয়ে ভয়ে গাড়িতে ওঠল এবং জিজ্ঞেস করল বিপ্লবী বন্ধুটিকে- কি করছিস?

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- আমি একচি এনজিওতে কাজ করি। গুলশানেই অফিস। তোকে নামিয়ে দিয়ে গুলশানে যাব। তোর কি খবর।
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- এই ত আছি। একটা ছোট সরকারি কাজ করি। মফস্বলেই থাকি।

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- বিয়ে করেছিস?
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- করেছি। এক ছেলে। তুই?

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- আমারও এক ছেলে, নাম রেখেছি বিপ্লব।
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- হা হা। এখনও বিপ্লব করছিস?

বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- আমি বুঝি না। সবাই কেন বিপ্লব বলতে গরীবদের সাথে, জেলে-মুচিদের সাথে থাকতে হবে মনে করে। ক্ষেতে-খামারে তাকতে হবে মনে করে। সবখানেই বিপ্লব দরকার আছে। এই ধর আমি এনজিও করি। বাইরের পয়সায় চলি। এর মানে কি এইখানে বিফ্লব করার নাই। একবার ভাব, এদেরকে যদি সংগঠিত করা যায়, বিপ্লব কতদূর এগিয়ে যাবে?
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- হ্যাঁ।

আলাপ করতে করতে মতিঝিলে এসে গেল তারা। পড়ুয়া বন্ধুটিকে নামিয়ে বিপ্লবী বন্ধুটি বলল- কাজ কখন শেষ হবে। সন্ধ্যার দিকে আমি শাহবাগে থাকব। আমাদের সব বিপ্লবী বন্ধুরাই এখন শাহবাগে আসে। সবাই বিভিন্ন কাজ করে। কাজ শেষে সন্ধ্যা বেলায় আমরা আড্ডা দেই। তুই থাকলে ভাল লাগবে।
পড়ুয়া বন্ধুটি বলল- আচ্ছা আসতে পারি দেখা যাক।

 ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩২

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের সামনেই আরেকটি ফ্ল্যাট। মুখোমুখি দরজা। আমি যখন বের হই, তখন যেমন আমাকে মনে হয় ওদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আবার ওরা যখন বের হয়, তখন মনে ওরা আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ফ্ল্যাটেই নতুন ভাড়াটে এসেছেন। একদিন দরজা খুলে বের হতেই দেখলাম, অদ্ভুত সুন্দর এক মেয়ে। অনেকদিন এত সুন্দর মেয়ে আমি দেখিনি। পৃথিবীতে এত সুন্দর মেয়ে থাকতে পারে, তাকে দেখলে প্রথম প্রথম তাই মনে হবে। প্রথম দিন এক পলক দেখেই আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করি। আমার মধ্যে কেমন একটা খুশি খুশি ভাব চলে আসে। কোথ্থেকে অনকগুলো আনন্দ এক সাথে পেখম মেলে নাচতে শুরু করে। আমি সেই আনন্দ শরীরে নিয়ে অফিস করি, বাসায় ফিরি। বাসায় ফেরার সময় এখন আরেকবার খেয়াল করলাম, মেয়েটির দর্শন পাওয়া যায় কিনা। না পেলাম না। মনে মনে ভাবলাম, কাল সত্যি যেন মেয়েটাকে আবার দেখি। আমি অফিসে যাওয়ার জন্য বের হবার সময়ই যেন মেয়েটিও ওদের বাসার দরজায় দাঁড়ায়। আরেকবার দেখব মেয়েটিকে। আরেকবার দেখতে চাই মেয়েটিকে। পৃথিবীতে এত সুন্দর মেয়ে থাকতে পারে। আমি সেই সকাল বেলার সৌন্দর্য শরীরের মেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল হল। অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম আর ভাবলাম এইবার নিশ্চিত আমি মেয়েটিকে দেখতে পাবে। অবশ্যই দেখতে পাব। দেখা যেন হয়। এরকম বিড়বিড় করতে করতে, আমাদের বাসার দরজা খুলেতই দেখলাম ওদের বাসার দরজার সামনে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে সাহস সঞ্চয় করলাম। মেয়েটাকে ভাল ভাবে দেখব। গতকাল এক পলক দেখেছি। আজ একটু বেশি সময় ধরে দেখব। দেখলাম মেয়েটির সমস্ত শরীর কেমন শীতের রোদের মত নরম। ঠোঁটগুলো কেমন বুষ্টিতে ভেজা গাছের নরম পাতার মত। চোখগুলো কেমন মেঘের আকাশের মত যেন এই মাত্র বৃষ্টি নামবে আর হেসে উঠবে সমস্ত ধানক্ষেত। খুব বেশিক্ষণ তাকাতে পারিনি। যতটুকু দেখেছি, তাতে বারবার মনে হয়েছে, এই মেয়ের সৌন্দর্য এতটুকু দেখে শেষ হয়ে যাবার মত নয়। এইভাবে প্রায় প্রতিদিন আমাদের দেখা হয়, দেখা হয়ে যায় আর আমি ভিতরে ভিতরে ঠিক করতে থাকি, ভিতরে ভিতরে সিদ্ধান্ত নিতে তাকি এই মেয়েটির সাথে কথা বলব। বললেই বা কি। ওরা আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকে। পাশের বাড়িতে কে ওঠল, এটা তো জেনে রাখা দরকার। একদিন জানতে হবে মানে এখনই জানব মানে ওদের ঘরের দরজায় টোকা দিলাম সাহস করে। ভেতর থেকে কথা বলে ওঠল- কে? সেই মেয়েটিই বোধহয়। এত সুন্দর করে কে বলে ওঠল, এত সুন্দর গলার কণ্ঠ- এ সেই মেয়েই হবে। দরজা খুলতেই বুঝতে পারলাম, এ সেই মেয়েটিই। আমি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। নিজেই এসেছি , পাশের বাড়িতে কে থাকে এটা খুঁজ নেবার জন্য অথচ আমিই দেখেন অপ্রস্তুত। না বিষয়টা একদমই স্বাভাবিক না। আমাকে কথা বলতে হবে মানে আমি কথা বললাম সাহস করে। আমি আপনাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকি। আপনাদের সাথে পরিচয় নেই তো অথচ পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন; তাই খোঁজ নিতে এলাম। মেয়েটি হাসল। এই হাসি নয়, গোধূলি বেলায় রোদের রং যেরকম নরম করে হাসে, সেটা। মেয়েটি বলল- ভিতরে আসুন। আসলে আমাদেরই দোষ। নতুন উঠেছি তো। সবকিছু গোছগাছ করা হয়নি। একদমই সময় পাচ্ছি না। তাই আপনাদের সাথে পরিচিত হওয়াও উঠেনি। বাসায় আমার হাসবেন্ড আছেন। উনাকে ডেকে দিচ্ছি। উনার সাথে কথা বলুন। আমি চা করে নিয়ে আসছি। আমি বললাম – আচ্ছা আর ভিতরে ভিতরে ভাবলাম- এ মেয়ে নয়, এ বউ। বউ এত সুন্দর হতে পারে! যে লোকটা তাকে বিয়ে করেছে, সে আসরে কতই না ভাগ্যবান। লোকটা আসল। আমরা অনেকক্ষণ আলাপ করলাম। লোকটা একসময় দাপুটে সাংবাদিক ছিল। বাংলাদেশের হেন জায়গা নেই যে দাপিয়ে বেড়ায় নি। সড়ক দুর্ঘটনায় এখন এক প্রকার অবশ হয়েই বসে থাকেন বাসায়। অনেক ভাল মানুষ। অনেক জানা-শোনা। মেয়েটি চারু-কলার ছাত্রী ছিল। পড়াশোনা শেষ। মাঝে মাঝে কিছু কাজ করে। আর ছেলেটি স্ক্রিপ্ট লিখে। এই দিয়েই সংসার চলে। এক প্রকার সংসারটা মেয়েটিই ধরে রেখেছে।

কেমন এলেমেলো হয়ে গেল। আমি ঘরে বসে ভাবলাম- কি যেন একটা হয়নি, কোথায় যেন কি একটা হয়নি, কি যেন একটা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হল না। একপ্রকার অস্থির লাগছিল বলা যায়। কিন্তু এই অস্থিরতা কোনও কারণ ছাড়া। কারণ ছাড়াও মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। অকারণে বিচলিত যাকে বলে। পরদিন সকালেও মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সৌজন্যতার খাতিরে বললাম- কেমন আছেন? মেয়েটি বলল- হ্যাঁ আছি, ভাল আছি। আপনি? আমি বললাম – হ্যাঁ ভাল। অফিসে যাচ্ছি। আজ মেয়েটিকে ততটা সুন্দর মনে হল না। যতটা সুন্দর আগে তাকে মনে হয়েছে। এই গতকালও তাকে যতটা সুন্দর মনে হয়েছে, আজ কিন্তু তাকে তা মনে হল না। আমি অফিস করে বাসায় ফিরলাম দেখলাম মেয়েটিও তাদের বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকদিন যাবত আবার মনে মনে একটা সন্দেহ দানা বেধে উঠল। আমি যখনই বরে হই, দেখি মেয়েটি ওদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, আমি যখনই বাসায় ফিরি দেখি তখনও মেয়েটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি এত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কেন? অন্য সময় তো তাকে দেখা যায় না বা আদৌ দেখা যায় কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আমি একদিন দুপুর বেলায় বাসায় ফিরলাম। দেখি আমি আমাদের বাসার সামনে দাঁড়াতেই মেয়েটি তাদের বাসার সামনের দরজা খুলল এবং বলল- কি ব্যাপার আজ দুপুরে বাসায় চলে এলেন। শরীর খারাপ নাকি? আমি হেসে বললাম না। অফিসে তেমন একটা কাজ নেই। তাই চলে এসেছি। এই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটি আমাকে অনুসরণ করে। মেয়েটি আমাকে খেয়াল করে। আমি কখন ঘরে ফিরি। আমি কখন ঘর থেকে বের হই। এতদিন যে তাকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, তা আসলে তার অনুসরণেরই অংশ। সে আমাকে ফলো করে। কি ফলো করে? কেন ফলো করে। সন্দেহ বাড়তেই থাকল এবং আরও বেশি পাকাপোক্ত হতে থাকল সন্দেহ। আমার মনে হল আমার মেয়েটি জিজ্ঞেস করা উচিত, কেন সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এটা কি করে বলা সম্ভব? ওদের বাসার সামনে ওরা দাড়াবে না তো কে দাঁড়াবে? এটা কি করে বলা যায়? এটা কি বলা যায় আদৌ? না বলা যায় না ? তাহলে কি বলা যায়? কিছুই খুঁজে পেলাম না। কিন্তু এটা ভাল খবর না যে আমার পাশের বাড়ির একজন মেয়ে আমাকে ফলো করে মানে আমি কখন বাড়ি থেক বের হয়, কখন ফিরি, কিভাবে ফিরি। হাতে কি থাকে? সব, সব? কিন্তু ফলো করলেই কি? আমি এমন কি করি যে তাকে ফলো করতে হবে? যার ইচ্ছে ফলো করার, সে করুক। তাতে আমার কি? কিন্তু অন্য কোনও কারণও তো থাকতে পারে? মেয়েটার হাজবেন্ড অসুস্থ। কাজ করে না। বলতে গেলে সংসারটা মেয়েটাই চালায়। তাহরে মেয়েটা কি অন্যকিছু চায়। অন্যকিছু, অন্যকিছু মানে শরীর। সে হয়ত দীর্ঘদিন এমন কিছু পায় না যা সে চায়। সে হয়ত দীর্ঘদিন এমন কিছু পায় না, যা তার পাওয়া উচিত। সে কি একটা সুযোগ খুঁজছে, সে কি একটা বিশেষ সময় খুঁজছে যে এই সময় পেলেই সে আমাকে একটা ইশারা দেবে। বা সে হয়ত ইশারাই দিয়ে গেছে এতদিন, কিন্তু আমি তা টের পাইনি। এটাও হতে পারে। কিন্তু এরকম একটা সুন্দর মেয়ে যদি আমাকে চায়, যদি সে এও বলে যে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, তাহলে আমার রাজি হয়ে যাওয়া উচিত। মনে মনে এই সিদ্ধান্ত নিলাম সে যদি সত্যিই আমাকে কিছু দিতে চায় বা পেতে চায় মানে শরীরের স্বাদ আমি তাকে দেব মানে আমিও নেব বা এর বদরে যদি আমাদের বিয়েও করতে হয় তাতে আমরা রাজি। এই সিদ্ধান্ত ভিতরে ভিতরে পাকাপোক্ত করে ফেললাম। আমার মনে হল আমার সিদ্ধান্ত টিক আছে। একদিন অফিস থেকে পিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল, এদিকে বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আমি কোনও রকমে বাসায় দরজায় সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, অমনি এত রাতে টের পেলাম একটি হাত। পেছনে থাকিয়ে দেখি মেয়েটা। বলে ফেললাম মানে মুখে চলেই এল- এত রাতে। মেয়েটা হাসল। এই হাসি এমন যে সে আমাকে নিশ্চিত চায়। আদ্যোপান্ত চায়। এই বৃষ্টিতে ভেজা ঠাণ্ডা শরীইটা কেমন গরম হয়ে ওঠল। সে আমার ঘরের ভেতরে এখন। আমি তোয়ালে দিয়ে গা মুছে, ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসলাম। মেয়েটির সোফায় বসে আছে। একটা ম্যাগাজিন দেখছে। আমি মেয়েটির কাছে ঘেঁষে বসার চেষ্টা করলাম। মেয়েটি কিছু বলছে না। আমার শরীর তার শরীর কিছুটা ছুঁয়েছে। মেয়েটা তখন বলল- আমার হাজবেন্ড দীর্ঘদিন চাকরি-বাকরি পাচ্ছে না। অনেকদিন ধরেই ও ট্রাই করছে। শুনেছি, আপনার অনেক বন্ধু-বান্ধব অনেক ভাল ভাল জায়গায় কাজ করে। ওর জন্য আমি একটা কিছু করে দিতে পারবেন? আমি একটু দূরে সরে বসলাম। প্রচণ্ড গরমে এই বৃষ্টির রাতে যে শরীর কাঁপছিল, সেই শরীরটাই হঠাত করে কেমন শীতল হয়ে এল। আমি মাথা নিচু করে আচ্ছা বলতেই মেয়েটি উঠে ওদের বাসায় যাওয়ার জন্য দাঁড়াল এবং দরজায় বাইরে গিয়ে বলল দেখবেন কিন্তু।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ৩৩

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। বাচ্চাটা আজ আর ঘরের বাইরে যেতে পারছে না। কোথাও খেলবে, সবাই বৃষ্টির দিনে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। মারও ভাল লাগছে না। কেমন যেন অলসতা পেয়ে বসেছে শরীরে। বাচ্চা মাকে বলল- মা ভাল লাগছে না। কোথাও খেলার জায়গা নেই। সবাই বাসায়। আমাকে গল্প শুনাও না। মা বাচ্চার কপালে হাত রেখে বলল- আচ্ছা আয় শোন। এই যে আকাশে মেঘের গর্জ শুনছিস এটা কি জানিস? এই যে
বিদ্যুত চমকাচ্ছে এটা কি জানিস?

মা বলর- পৃথিবীর আদিতে ছিল – শিব আর পার্বতী। শিব দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াত। পাহাড় থেকে পাহাড়ে সে ঘুরে বেড়াত। শিব যখন এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেত, তখন পৃথিবী কেঁপে ওঠত। শিব যখন কোনও পাহাড়ে দাঁড়িয়ে নাচত, তখন পৃথিবীতে ভূমিকম্প হত। পার্বতী শিবের এই উদাস, চঞ্চলতা পছন্দ হত না। শিবের এই সংসারের প্রতি কোনও রকমের নজর না থাকা পার্বতীর ভাল লাগত না। তখন থেকে এখনও পর্যন্ত শিবের এই আচরণের কোনও পরিবর্তন হয় নি। এখনও শিব চঞ্চল, উদাস। আর পার্বতী নিজে নিজে ডুকরে কাঁদে। তাদের মধ্যে প্রায়ই তাই ঝগড়া হয়। এই যে আকাশের গর্জন দেখছিস, এটা শিবের গর্জন আর এই বিদ্যুত চমকাচ্ছে, এটা পার্বতীর কান্না। ওদের মধ্যে যখন ঝগড়া হয়, তখন এই আকাশ গর্জন করে ওঠে, আর বিদ্যুত চমকায়।

বাচ্চাটা মাকে বলে, তাহলে ঝগড়া খুব খরাপ তাই না মা। তুমি যখন বাবার সাথে ঝগড়া কর, তখনও কি এরকম আকাশে গর্জন হয়? বিদ্যুত চমকায়? মা বাচার এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেন না। কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠেন, কি জানি বাবা।

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ৩৪

তারপর কি?

তারপর আমি আমার কাছে ফিরে আসলাম। মানে বাসায় এসে ফেসবুক খুললাম।

ফেসবুকে দুপুর মিত্রকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন?

দুপুর মিত্র কোনও উত্তর দিলেন না।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩৫

ইদানিং একটা ছায়া আমার পেছন পেছন প্রায়ই ঘুরতে দেখি। ছায়াটা বড় হয়। ছোট হয়। ছায়াটা একবার ডান দিকে যায়। আরেকবার বাম দিকে যায়। ছায়াটা একবার আমাকে ধরে ফেলতে চায়। আর তখনই আমি পেছনের দিকে তাকাই। দেখি কিছু নেই। কেবল আমার ছায়া। ঠিক ছায়া নয়, কি যেন একটা পেছন পেছন আমার সাথে ঘুরে। আমি পিছনে তাকাতেই দেখি সে নেই।

গতরাতেও আমার এরকম হল। মানে এরকম মনে হল। মনে হল কেউ একজন আমার পেছন পেছন আসছেন। একবার মনে হল এটা আমার সেই বন্ধুটা ক্লাশে সে প্রায়ই সেকেন্ড হত। আমি কেন বারবার ফার্স্ট হই, এটা তার মাথায় ঢুকত না। একদিন বার্ষিক পরীক্ষার আগে আগে সে আমাকে রাস্তায় আটকে মেরেছিল। সেবারও পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম। কিন্তু সে হবে কি করে। এখন সে কোথায় থাকে আর আমি কোথায়। তার তো আমাকে খুঁজে পাবার কথাই না। এটা অসম্ভব। কিন্তু মনে হল সে। সে বেশ কিছুদিন ধরে আমার পেছন পেছন ঘুরছে। একটা সময়, একটা সুযোগমত সময় খুঁজছে। যখনই আমি একা কোনও নিরিবিলি রাস্তায় এসে দাঁড়াই, তখনই ছায়াটা একদম আমার কাছে চলে আসে। আর পেছনে তাকাতে দেখেই ছায়া নেই।

কয়েকদিন আগে সেই ছায়াটিকে আমার বান্ধবীর মত মনে হয়েছিল। সে একদিন তাকে বিয়ে করার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু আমার মা-বাবা রাজি হবে না বলে না পিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। পরে শুনেছি সেই বান্ধবীর যার সাথে বিয়ে হয়েছে, সেই ছেলেটি নাকি ভালো নয়। মনে হয়েছিল পেছনে পেছনে সেই বান্ধবীটি আসছে। একদিন বাসায় ফিরতেই বিদ্যুত চলে যায়। সমস্ত বাসা অন্ধকার আর অন্ধকার। ঘরের ভিতরে ঢুকে কোনোকিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখনই মনে হগল কেউ একজন আমার পেছেন, অবিকল সেই বান্ধবী আর আমি সাহস করে পেছনে ফিরে হাত নেড়েচেড়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, সত্যিই কি সেখানে কেউ। কিন্তু কাউকেই পেলাম না। পাই নি। এখনও পাই না। কিন্তু মনে হয় সে আমার পেছন পেছন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা সুয়োগ খুঁজে। কিসের যেন সুযোগ। সম্ভবত প্রতিশোধ নিতে চায়। কোনও একটা প্রতিশোধ। কিন্তু কিসের প্রতিশোধ, তা আর আমি ভেব পাই না। সম্ভবত সে আমাকে মেরে ফেলতে চায়। কেন যেন মেরে পেলতে চায়।

রাস্তায় হাঁটছিলাম একা একা। মনে মনে ভাবছিলাম আজ যেই হোক না কেন, যেভাবেই হোক না কেন, আমি তাকে ধরবই। এরকম ভেবে ভেবে হাঁটছি, ঠিক তখনই একটা কিছু আমার পেছনে পেছনে হাঁটছে টের পেলাম। পেছনে তাকাতেই দেখলাম সে। আজ সত্যি সত্যি সেই ছায়াটিকে ধরে ফেলেছি। সে এখন আমার সাথেই আছে।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩৬

এই পুকুরে কেউ যান না। যান না মানে এই পুকুরে কেউ গোসল করেন না। কেউ মুখ ধুন না। এমন কি কেউ এই পুকুরের ধরা মাছ পর্যন্ত খান না। কারণ এই পুকুরে মাঝে মাঝেই কেউ কেউ নাকি বিশেষ কিছু দেখেন। বিশেষ কিছু মানে একদিন এই পুকুরে একজন মানুষের মত মাছকে দেখা গেছে। এই খবর পাওয়ার পর পুরো পুকুর জাল ফেলে দেখা গেছে পুকুরে এরকম কোনও কিছু নেই। এর দুই-একদিন পর আবারও সেই রকম একটি মাছের
মত মানুষ বা মানুষের মত মাছ দেখা গেছে। এলাকার মানুষ বিষয়টা একেবারেই সিরিয়াসলি নিচ্ছে। বিষয়টা বোধহয় আসলেই সিরিয়াস। পুরো পুকুরে জাল ফেলে দেখা হল কোনও কিছু মানুষের মত নেই। তারপর আবারও সেখানে মানুষের মত মাছ দেখতে পেলে কেউ কেউ। এ নিয়ে সারা এলাকায় নানা কথা ছড়িয়ে গেল। পুকুরটা সেই জমিদার আমলে গড়া। জমিদার বাবু সেখানে বসে বসে মাছ ধরতেন। একদিন জমিদারের বউ নাকি এই পুকুরেই জমিদারকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে আরকেজনকে বিয়ে করে। সেই জমিদারই মাঝে মাঝে পুকুরে ঘুরে বেড়ান। পুকুরের লাল শাপলা পাহাড়া দেন। মাছ ধরতে দেন না। এই পুকুরে নাকি সত্যি সত্যি জমিদার আমলে কেউ মাছ ধরতে পারত না। কারণ এখানে কেবল জমিদারই মাছ ধরবেন। কেউ গোসল করতে পারত না, এমন কি হাত-মুখ পর্যন্ত কেউ এই পুকুরে ধুতে পারত না। একবার নাকি এই পুকুর থেকে বিশাল বড় মাছ ধরে নিয়ে সাহস করে আরেক এলাকার লোক খেয়েছিল। সেই পরিবারের লোকজন সেদিন রাতে বেশ আয়েশ করে মাছ খেলেও সকালে সবাই বাড়িতেই মরে পড়ে থাকে। এরপর থেকে কেউই এই পুকুরের মাছ ধরে খান না। শুধু মাছে ধরা খাওয়া নয়, মাছ ধরেন না পর্যন্ত।

বিষয়টা আসলেই সিরিয়াস। এরকম একটি এলাকায় আজও এই ধরণের একটা পুকুর থাকতে পারে। আর লোকজন সেই পুকুরে গোসল করবেন না, মাছ ধরবেন না, মাছ ধরে খাবেন না, এমন কি হাত-মুখ পর্যন্ত এই পুকুরে ধুবেন না। এটা কি করে সম্ভব? এটা কি করে মেনে নেওয়া যায়? এটা কি করে ভাবা যায়? পৃথিবী যেখানে এত দূর এগিয়ে গেছে, সেখানে কি করে এটা সম্ভব? কি করে মানুষ এটা মনে করে? আসলেই কি পুকুরে জমিদার ঘুড়ে বেড়ান? রাতে পুকুরের এপার থেকে ওপারে ঘুরে দেখেন কেউ মাছ মারছেন কিনা। সাধারণত কেউ এই পুকুরের দিকে যেতে পারত না। কাউকে যেতে দেখলে এলাকার মানুষ যেতে নিষেধ করতেন। তাই একদিন গভীর রাতে পুকুরের দিকে এগুল সোহাগ। সোহাগকে এই এলাকার কেউ চেনেন না। শুধু এ্‌ই এলাকা নয়, আশেপাশের কোনও এলাকার মানুষই তাকে ঠিকমত চেনেন না। নতুন এসেছেন এই এলাকায় তিনি। একেবারেই নতুন। কি একটা কাজে। কিছুদিন থেকে চলে যাবেন। যাই হোক, চারদিকে কুয়াশা পড়ে আছে। কুয়াশায় অন্ধকার কেমন গলে গলে পড়ছে। সোহাগ ধীরে ধীরে পুকুরের দিকে এগুল। পুকুরের পাড়ে এত রাতে এত গভীর রাতে একজন মানুষের মত কাউকে দেখতে পেল। এই ঠাণ্ডা শীতের রাতে এই পুকুরে এখানকার কোনও মানুষ থাকার কথা না। এখানকার না। অন্য কোনও এলাকা থেকেও এত রাতে পুকুরের পাড়ে আসার কথা না। এই মানুষটা তাহলে কে? এটা কি সেই জমিদার? যে জমিদারের কথা লোকজন এত বলে। সোহাগ সেই মানুষটার দিকে টর্চ ফেলল। এটা ছি ঝোপ-ঝাড়। অন্ধকার রাতে এ্‌ই ঝোপ-ঝাড়ের শেপটা এমন হয়ে গিয়েছিল যে এটাকে মানুষের মত মনে হচ্ছিল। হঠাত সে টের পেলে চারপাশে বেশ কিছু মানুষ ঘিরে ধরেছে। কেউ একজন তাকে শক্ত করে ধরে আবার ছেড়ে দিল। সোহাগ একটি শব্দ টের পেল, মানে একটা প্রশ্ন- জমিদারবাবু?

এরপর থেকে সোহাগ এই এলাকার জমিদার বাবু হয়ে ওঠলেন। সোহাগ যে বাড়িতে থাকেন, সেই বাড়ির এক মাইল দূর থেকেই লোকজন সতর্ক হয়ে যায়, এটা জমিদারবাড়ি। এখানে জমিদার বাবু থাকেন। সোহাগকে দেখলে লোকজন মাথা নিচু করে থাকেন। কেউ কিছু বলেন না। দূরে দূরে থাকেন। সোহাগ যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বের হন, সেই রাস্তা খালি হয়ে যায়। সেই রাস্তায় আর কেউ হাঁটেন না।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩৭

কাছিমের মত করে ভুতটা আসল। কাছিমের মত করে গলা বের করে তাকাল। অদ্ভুত করে শব্দ করল সে। এমনভাবে সুদীপ্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে যে কিছুই বলতে পারছে না সে। সে কাঁপছিল আর বিশ্বাস করছিল না। তার কিছু করা উচিত। কিন্তু এটা কি আদৌ ভূত। ভূত বলে কি কিছু আছে? কি অদ্ভুত! ভূতের কি এমন চেহারা হয়? ভূত কি এরকম অদ্বুত করে শব্দ করে।

সুদীপ্ত বলল, তুমি ভূত না।

ভূতটি গলা বাড়িয়ে সুদীপ্তের মুখের সামনে তার মুখ টেনে আনল। লাল টকটকে চোখ দিয়ে তাকাল। আর অদ্ভুত শব্দ করল। ভূতের মুখটা এখন প্রায় সুদীপ্তের মুখের কাছেই। এগুচ্ছে ধীরে ধীরে।

সুদীপ্ত গড়িয়ে গড়িয়ে খাট থেকে পড়ে গেল।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩৮

লোকটা গিরগিটির মত হাসে। গিরগিটর মত করে কথা বলে। গিরগিটির মত তাকিয়ে থাকে।

লোকটা হাঁটলে মনে হয় গিরগিটি হাঁটছে। লোকটা ঘুমালে মনে হয় গিরগিটি ঘুমিয়ে আছে। লোকটা দৌঁড়ালে মনে হয় গিরগিটির মত করে দৌঁড়ায়। লোকটা দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয় গিরগিটির মত করে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা বসে থাকলে মনে হয় গিরগিটির মত করে বসে আছে।

লোকটা গিরগিটির মত করে খায়। লোকটা গিরগিটির মত করে পায়খানায় যায়। লোকটা গিরগিটির মত সেক্স করে।

লোকটা আসলে গিরগিটি।

ফ্ল্যাশ ফিকশন- ৩৯

এলিয়েন কিন্তু আসলেই আছে। যদিও অনেকেই বিশ্বাস করে না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা কিন্তু বরাবরাই বলে চলেছেন এলিয়েন থাকার কথা। এই তো কিছু দিন আগেও নাসার বিজ্ঞানীরা বললেন, টাইটানে এ এলিয়েন আছে। নাসার বিজ্ঞানীরা কিন্তু এও বলেছেন পৃথিবীতেই রয়েছে এলিয়েনের অস্তিত্ব। মঙ্গলেও প্রাণ আছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।

বিশ্বাস করেন আর নাই করেন আমার সাথে একদিন এলিয়নের দেখা হয়েছিল।
এদের দেহ কিন্তু আসলেই সরীসৃপদের মতো। এরা আসলেই অতিবুদ্ধিমান। এদের মধ্যে পোষাক-পরিচ্ছদের কোনো বালাই নাই। এরা স্কুলেও যায়। তবে শুধুমাত্র আকৃতিতে লম্বারা স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়।

একদিন অনেক রাতে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি কমলা রঙ্গের একটা সরীসৃপ প্রাণী সদৃশ আভা। তাকাতেই উড়ে উড়ে আমার কাছে আসতে দেখে আমি জানালা বন্ধ করে দেই। তারপর এই আজব জিনিসটি জানালার পাশেই আছে কিনা দেখার জন্য জানালাটি আবার খুলি। তখন চিকন সুরে আমাকে বাংলায় বলে- এই শোন ভয়, পেয়ো না। তোমরা যাকে বলো এলিয়েন আমি কিন্তু তাই। আমি তাকালাম। শরীর থেকে কেমন আগুন গলে গলে পড়ছে। আমাদের যেমন ঘাম ঝড়ে পড়ে, ওদের তেমনি শরীর থেকে ঝড়ে পড়ে আগুন। আমার সাথে এই এলিয়েনের অনেক কথা হল। তারপর অনেক চিন্তিত ভঙ্গিতে আমাকে একটা প্রশ্ন করল- আচ্ছা তোমরা মানুষেরা ঘরের ভিতরে আরেকটি ঘর বানিয়ে কেন মল ত্যাগ করো?

ফ্ল্যাশ ফিকশন-  ৪০

আমরা ডাইনোসর যুগে চলে গিয়েছিলাম। কিছু বিশাল বিশাল ডাইনোসর দেখলাম ঘাস খাচ্ছে। একবার এক অদ্ভুত চিকন সুর শুনতে পেলাম। তারপর বিকট পাখা ঝাপটানোর শব্দ। ওটা ছিল পাখি। ডাইনোসর পাখি। কিছু ডাইনোসর গলা বড় করে গাছের কচি পাতা খাচ্ছিল। ওদের চোখ কেমন শান্ত আর জ্ঞানীদের মত ছিল। ডাইনোসররা আমাদের থেকে এত বড় ছিল যে ওরা আমাদের বুঝতেই পারেনি যে আমরা ওদের দেখতে এসেছি। আমি একটা বড় ও বৃদ্ধ ডাইনোসরের লেজে বসেছিলাম। ও টেরই পায় নি। আমার ওর লেজ ধরে আদর করতে ইচ্ছে হয়েছিল।
এই ডাইনোসরেরাই পৃথিবী শাসন করেছে প্রায় ১৬ কোটি বছর। ওরা পৃথিবীতে এসেছিল ট্রায়াসিক যুগের শেষ দিকে, অর্থাৎ প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করতে শুরু করে। আর ওদের শাসনকাল চলে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ পর্যন্ত। আমাদের তখন একদম ভয় করেনি। কারণ আমরা যে সময়টায় ডাইনোসর যুগে ছিলাম, তখন ছিল দিনের বেলার সময়। এখানে ছয় মাস দিন থাকে আর রাত থাকে ছয় মাস। রাতের বেলায় ডাইনোসর যুগে গেলে খুবই ভয়ানক ভয়ানক ডাইনোসর দেখতে পাওয়া যায়। রাতের বেলার এই ডাইনোসরগুলো মাংসভোজী। দিনের বেলায় ডাইনোসরগুলি সবই তৃণভোজী থাকে। সে যাই হোক, এখানেই আমাদের সাথে দেখা যায় পাশের বাড়ির এক মেয়ের সাথে। আমি তাকে বললাম, এখানে তোমার কেমন লাগছে। ও বলল- না বোরিং। এখানেও প্রচণ্ড বিরক্ত আর এক ঘেয়েমি লাগছে।

Advertisements

One thought on “কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ভূমিকাসহ দুপুর মিত্রের সবগুলো ফ্ল্যাশ ফিকশন/গল্প

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s