Home

ফোন ভাইব্রেশন মোডে রাখা। মধ্যরাতে বন্ধু ফোন দিয়েছিলেন, টের পাইনি। দেখলাম রাত একটায়। জরুরি কোনো ব্যাপার মনে করে কলব্যাক করলাম। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা। আমার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তার, আমার লেখালেখির প্রতি পক্ষপাতও কখনো লুকিয়েছেন বলে শুনিনি। পরিচয়ের শুরুর দিকে নিজের সংগ্রহ থেকে অমিয়ভূষণ মজুমদারের ৬/৭টি বই দিয়েছিলেন আমাকে। ফোন ধরেই বললেন, তোমাকে কঠিন কিছু কথা বলবো, মন দিয়ে শুনবে।

বলেন।

তুমি কী চাচ্ছ বলো তো? বাজারি সাহিত্যের প্রতি তোমার এই পক্ষপাত কেন?

বন্ধু হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আমার ‌‘গুডবাই, মায়েস্ত্রো’নোটটি পড়েছেন। কিছুটা বিরক্ত, কিন্তু পছন্দ করেন বলে আমার কাছেই বিহিত চাইছেন। বললেন,

সাহিত্য দুই প্রকার। বাজারি সাহিত্য ও সিরিয়াস সাহিত্য। এই বিভাজনটা নিয়ে তোমার কোনো প্রশ্ন আছে?

বললাম, মুদির দোকানে সাজানো জিনিশপত্রের মধ্যে কোনটা বাজারি আর কোনটা সিরিয়াস? আপনি হয়তো বলবেন, টুথপেস্ট বাজারি- ডিম সিরিয়াস। আসলে কি তা-ই বলবেন? বাজারে যা আসে সবই বাজারি। বই তো বিক্রির জন্যই আসে মার্কেটে। পৃথিবীতে এমন কোনো সিরিয়াস বই আপনি দেখেছেন যা কিনতে পাওয়া যায় না। এমন কোনো বই আছে যাতে দাম লেখা থাকে না?

বলে যাও।

আমরা একটা মার্কেট সিস্টেমের মধ্যে আছি। এই মার্কেট সিস্টেমে যা আমরা বিক্রি করি আর যা কিনি- সবই বাজারি। কোনো জিনিশ বেশি বিক্রি হলেই সেটি বাজারি আর কোনো জিনিশ কম বা বিক্রি না হলেই তাকে সিরিয়াস বলবো কেন? তাই আমাদের প্রথমেই একমত হতে হবে যে, সকল সাহিত্যই বাজারি। একমাত্র দুপুর মিত্রের সাহিত্যই বাজার ব্যবস্থার বাইরে।

দুপুর মিত্র কে?

কবি। সে নিজের টাকায় বই প্রকাশ করে বিনামূল্যে বিতরণ করে। তার বইয়ে কোনো দাম লেখা থাকে না।

কিন্তু যে লেখা মানহীন এবং শস্তা এবং একই সাথে জনপ্রিয় তাকে তুমি কী বলবে?

এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আপনি আমাকে এমন কোনো লেখকের নাম বলতে পারবেন যার লেখা মানহীন, বিষয়বস্তু শস্তা অথচ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন? একথা ঠিক, আমাদের দেশে কিছু লেখক জনপ্রিয় বলে পরিচিতি পেয়েছেন। নানা কীর্তিকলাপ করে জনপ্রিয় তকমাটা জুটিয়েছেন তারা। পাঠক পছন্দ করতে পারে এমন লেখাও লিখেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখেন, পাঠক তাদের পছন্দ করেনি। জনপ্রিয় বলে পরিচিত অমুক অমুক ও অমুকের (নামগুলা এখানে আর না বলি) লেখা আমি পড়ার চেষ্টা করেছি। একটা উপন্যাসও শেষ করতে পারিনি। আমি বিশ্বাস করি, এদের জনপ্রিয়তা বানানো। জনপ্রিয় হতে হলে প্রথম যে গুন তা হলো ভাষার সুখপাঠ্যতা। এই প্রথম গুনটাই এদের নেই। হুমায়ূন আহমেদই বাংলাদেশে আসলে একমাত্র জনপ্রিয়।

সে রাতের আলোচনা মোটামুটিভাবে শেষ ওখানেই শেষ। কিন্তু আলাপটার রেশ থাকলো কয়েকদিন।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর অনেকের লেখা পড়ছি, টক শো শুনছি, কতাবার্তাও কানে আসছে। বড় একটা অংশ প্রিয় লেখকের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত। অনেকেই মৃত্যুর পরের ঘটনাবলী, বিশেষ করে পারিবারিক ঘটনাবলীর সূত্রে হুমায়ূনের সম্পর্ক, সম্পত্তি নিয়ে মুখরোচক আলোচনায় ব্যস্ত।

লেখকের মৃত্যু হয়েছে, স্বাভাবিক কারণে লেখকদের প্রতিক্রিয়া নিচ্ছে মিডিয়াগুলো। সাধারণেও হয়তো সহলেখকদের মুখ থেকে হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন শুনতে চায়। লেখকরা বলছেনও সমানে। লেখকদের প্রতিক্রিয়াগুলো ইন্টারেস্টিং। মুখের অভিব্যক্তিতে শোক, কথাতেও খানিকটা। কিন্তু কথার বিস্তারের দিকে মন দিলে দেখা যাবে তাতে হুমায়ূনের প্রতি বিরাগ, বিদ্বেষই মূলত ফুটে উঠছে। মূলত, এই লেখকরাই শোকপ্রকাশের ছলে ফেনিয়ে তুলেছেন সেই ধারণাটি যে, হুমায়ূন জনপ্রিয় কিন্তু সিরিয়াস নন। সমকালের পাঠকরা তার লেখা পছন্দ করেছে কিন্তু তিনি সমকালীন বিষয়কে লেখায় আনেননি। কেউ বলছেন তিনি ম্যাজিশিয়ান, কেউ বলছেন হ্যামিলনের বাঁশিঅলা। কেউ বলছেন, হুমায়ূনের পাঠক মধ্যবিত্ত। অল্পবয়সী তরুণ-তরুণী মূলত গৃহিনীরা তার লেখা পড়েন। এর মধ্যে সেলিনা হোসেন লিখেছেন, হুমায়ূন আহমেদ রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসের পাঠকদের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। জনপ্রিয়তা দিয়ে যেহেতু সাহিত্যের বিচার হবে না, সেহেতু সাহিত্য দিয়েই সাহিত্যের বিচার হবে। আর তাতে যে ফল দাঁড়াবে এই যে, পাঁচ বছর পর হুমায়ূনের কথা মুখেও আনবে না কেউ। তার লেখা পড়া হবে না। একসময় আকবর হোসেন, রোমেনা আফাজদের মতো কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন হুমায়ূন। মহাকালের খতিব মহোদয়দের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই মহাকালে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছেন।

শোক প্রকাশ করতে গিয়ে শঠতা করা যেতে পারে। হুমায়ূন কত বড় লেখক তা বলতে গিয়ে তার আতিথেয়তার কথাও বলা যায়। হুমায়ূনের সেলিব্রেশনে, জনপ্রিয়তায় ঈর্ষা পোষণ করাও সঙ্গত। ভদ্রোচিত সমালোচনা তো রীতিমতো উপভোগ্য ব্যাপার। কিন্তু ভাষায়, বর্ণনায়, ক্র্যাফটে, বিষয়বস্তুতে হুমায়ূনের চেয়ে দুর্বলতর কোনো লেখক যখন নিজের অজনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে নিজেকে তার চেয়ে শ্রেয়তর লেখক হিসেবে দাবি করেন তখন সত্যিই তা বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। এই যে, অজনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ছোট লেখকরাও নিজেদের বড় লেখক বলার সুযোগ পাচ্ছেন তার একটা শক্ত প্রেক্ষাপট আছে। এই প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে, একটা ভুল ভিত্তির ওপর। এর মূল সুর মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বের সমাজ-বাস্তবতা, নিম্নবর্গ-প্রীতি, লড়াই-সংগ্রাম, নিম্নবর্গের পিঠচাপড়ানি। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা এ সাহিত্যে পরিত্যাজ্য। এলেও আসতে হবে নেতিবাচকভাবে। লেখকরা মূলত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, পাঠকরাও। সাহিত্যে পলায়নপরতাকেই সাবাশি দেওয়া হয়। ফলে, বুদ্ধিজীবী-ভাবাপন্ন মধ্যবিত্ত পাঠকের কাছে সিরিয়াস সাহিত্য হলো এমন সাহিত্য যা পড়া উচিত। আর তারা যে সাহিত্য পছন্দ করে পড়েন তা পড়া উচিত নয়, পড়লেও প্রকাশ্যে স্বীকার করা উচিত নয়।

আমাদের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা প্রকারান্তরে এমন সাহিত্য পছন্দ করেন যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের জীবন ও যাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। লেখকরা এমন সব বিষয় নিয়ে লেখেন যা নিয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। অপরের উপকার করার মিশনারি চিন্তা, পেটিবুর্জোয়া পাপবোধ সর্বোপরি পলায়নপরতা আমাদের সাহিত্যকে জীবনের স্পর্শবিহীন, দিশাহীন এক জায়গায় নিয়ে গেছে। বিগত ষাট বছরে আমাদের সাহিত্য মহাকালজয়ী লেখকদের হাতে কী ঘোড়ার আন্ডা প্রসব করেছে তা আমরা সবাই জানি। গুনতে থাকলে ১০টি ভাল উপন্যাসের নাম করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর এই দশটি পাঠক পড়বে কি না সে প্রশ্ন তো আরও জটিল উত্তর বয়ে আনবে। পৃথিবীর কোনো সাহিত্যে বোধহয় এমন আত্মপ্রবঞ্চনার উদাহরণ নেই। আমি এই মুহূর্তে এমন কোনো লেখকের কথা মনে করতে পারছি না যিনি নিজের শ্রেণীর বাইরের বিষয়কে লেখার বিষয় করে কালোত্তীর্ণ হতে পেরেছেন। কারো মনে পড়লে জানানোর অনুরোধ রইলো।

আমি বলছি না, হুমায়ূন নিজের শ্রেণীকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। তবে হুমায়ূন আহমেদ এই বুদ্ধিজীবীতার খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসেছেন বলে আমাদের সাহিত্যের গভীরতর লাভ হয়েছে। শুধু এই নেতি-বুদ্ধিজীবীতা নয়- আমাদের লেখকদের অভ্যস্ত শঠতা, কতটতা, ধূর্ততা, দলবাজি, উচ্ছিষ্ঠভোগীতার চর্চা তিনি করেননি, করতেও হয়নি। নন্দিত নরকে/শঙ্খনীল কারাগার থেকে দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত লেখাজোখার অন্ধিসন্ধি নিশ্চিতভাবেই এই মহাকালের খতিবদের চোখে পড়েনি। আমি যতটুকু পড়েছি তাতে আমাদের সিরিয়াস অনেক লেখকের চাইতে অনেক সিরিয়াস মনে হয়েছে তাকে। একটা ছোট উদাহরণ দেই। গত এক দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজকে নানাভাবে ভাবিয়েছে। তাত্ত্বিক, লেখক, কলামিস্ট, অ্যাক্টিভিস্ট সহ কতজন কতভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কিন্তু সিরিয়াস লেখকদের উপন্যাসে কি এসেছে বিষয়টি? আমি যতদূর জানি, আসেনি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে সরাসরি এসেছে। এবং তাকে কিছুটা ভুগতেও হয়েছে। একটু চোখ বোলালেই দেখবো হিমু সময়ের সঙ্গে চলছে। বর্তমান ঘটনাবলীর দেখা হিমু-সম্পর্কিত উপন্যাসগুলোতে যথেষ্টই আছে। সিরিয়াস উপন্যাস আমি পড়েছি, তাতে নেই।

জীবনের জটিলতাও তো কম নেই। জীবনবাস্তবতারও কমতি নেই। কিন্তু, কী করবেন হুমায়ূন আহমেদ? শত বাস্তবতা আনার পরও তা লেখা জটিল হয় না। একটা চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যাদের ১০০ পৃষ্ঠা লিখতে হয় তারা কীভাবে বুঝবেন দুই লাইনে চরিত্র-চিত্রণের ক্ষমতাও লেখকের থাকতে পারে। ক্ষমতাকে অক্ষমতা বলি কীভাবে? সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো গল্প বলা। আমি কবিতা লিখি, কিন্তু অক্ষরবৃত্ত ছাড়া কোনো ছন্দ জানি না। আমি না জানলেও স্বীকার করি, কবিতার প্রাথমিক শর্ত হলো ছন্দ। তেমনিভাবে উপন্যাসে, প্রথম শর্ত গল্প বলা। যে গল্প বলতে (লিখতে) জানে না সে উপন্যাস লেখার দুঃসাহস করে কী করে? পৃথিবীর সব বড় লেখকই বড় গল্পকথক। আমি ভেবে অবাক হই, দুই দফা অনুবাদের পর মার্কেসের লেখার ভাষা ও ক্র্যাফটের বহুকিছুই তো হারিয়ে যায়। তারপরও শুরু করলে যে শেষ করা যায় না সে কিসের গুণে? অবশ্যই গল্পের গুনে। গল্প বলা মার্কেসের গুণ, গ্রাসের গুন কিন্তু হুমায়ূনের দোষ নাকি?

বর্ণনা কুশলতা, গল্পের বয়নের সঙ্গে বলতে হবে ভাষার কথাও। হুমায়ূন আহমেদ বইয়ের ভাষায় লেখেননি, মুখের ভাষার কাছাকাছি থেকেছেন। তার গল্পের আইডিয়া সবসময়ই আলাদা, আনপ্রেডিকটেবল। চরিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়েছে- ক্র্যাফটের বিন্যাসেও। কিন্তু সব ঝেড়ে বেছেও যা নিতে পারি, তা সিরিয়াস সাহিত্যিকদের তুলনায় কম নয়, একটু বেশিই।

জনপ্রিয়তা সম্পর্কে যে ভুল ধারণা আমাদের সমাজে আছে তা বাজার সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে জন্ম নেওয়া। বাজারি কথাটার মতো আরেকটি কথা শস্তা জনপ্রিয়তা। বস্তুত, জনপ্রিয়তাই মূল্যবান। যা লোকে কষ্টে উপার্জিত টাকা দিয়ে স্বেচ্ছায় কিনছে নিশ্চিতভাবেই সেটি তার অবশ্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর তালিকায় আছে। এই তালিকায় একটি বই যোগ করা কঠিন। লেখার গুন বড় ব্যাপার। কিন্তু বইয়ের মার্কেটিং সিস্টেমটাও জরুরি। আমাদের প্রকাশনা সিস্টেমে মার্কেটিং বলে কিছু নেই। আছে একটি ব্র্যান্ড। মার্কেটিং সিস্টেম ছাড়া সেই ব্র্যান্ডটাই বিক্রি হয়। আর কতই বা বিক্রি হতো? প্রথম আলো জনপ্রিয় পত্রিকা। কেউ নিশ্চয়ই বলবেন না মানহীন, শস্তা বলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তারা। লোকে মানসম্মত সিরিয়াস পত্রিকা রেখে প্রথম আলো পড়ছে। প্রথম আলো বিক্রি হয় চার লাখ। একটি জরিপে দেখা যায়, মার্কেটিংয়ে সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারলে একটি পত্রিকার পাঠক এখানে ১০ লাখ হতে পারতো। প্রশ্ন হলো, হুমায়ূন আহমেদের বই কি প্রতিটা চার লাখ কপি বিক্রি হয়? হতে তো পারতো। সঠিক মার্কেটিং সিস্টেম থাকলে হুমায়ূন আহমেদের বই আরও বিক্রি হতে পারতো। পশ্চিমে এমনকি লাতিন আমেরিকায় একেকটি বই ২/৩ লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায়। তথাকথিত সিরিয়াস বইও চলে সমানে। এখানে যে তেমন ঘটছে না, তার পেছনে মিডিয়া, মার্কেটিং সিস্টেমের অব্যবস্থাপনাই বড় কারণ। অথচ আমাদের অসূয়াগ্রস্ত লেখকরা ভাবছেন হুমায়ূনের বই বিক্রি হচ্ছে বলে তাদেরটা কেউ কিনছে না। ভাবখানা এমন যে, হুমায়ূন নেই, তাকে ছোট করো। পাঠক কনভিন্সড হয়ে এখন এদের বইয়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বেন।

বইয়ের মার্কেটিং সিস্টেমে একটা বড় ক্ষতি করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তার ব্র্যান্ড ভ্যালুর কারণেই প্রকাশকদের এতকাল মার্কেটিং নিয়ে ভাবতে হয়নি। তার প্রতিভা, যোগাযোগ ক্ষমতাই এতকাল সব উতরে দিয়েছে। তিনি ছাড়া বাকী জনপ্রিয়রা কিন্তু বিক্রিতে ৫ হাজারের কাতারে। আর সিরিয়াসরা এক হাজারের ওপরে উঠতে পারেন না। দেশে ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে সিরিয়াস পাঠক মাত্র ১ হাজার? অবিশ্বাস্য! এই ফেসবুকেই তো হাজার দশেক সিরিয়াস আছে।

হুমায়ূন আহমেদ একদিকে প্রকাশকদের নিশ্চিন্ত রেখে ক্ষতি করেছেন, অন্যদিকে লেখকদের একটি অংশ ভেবেছে তার মতো লিখলেই হবে। কিন্তু আসলে তো তার মতো লেখা যায় না। তিনি ইউনিক। তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে এরা তার মতো হতে পারেনি, নিজেদের রাস্তাটাও আবিষ্কার করতে পারেনি।

অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দিকে দেখুন : জনপ্রিয় শংকর, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ, বুদ্ধদেব গুহ থেকে বাণী বসু পর্যন্ত এ ডজন লেখকের নাম করা যাবে যারা লেখার স্টাইলে পরস্পরের থেকে আলাদা। শুনেছি, সিরিয়াস সাহিত্যের বিক্রিও কম নয় সেখানে। আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্যিকের বই যেখানে ৫ হাজার বিক্রি হয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে প্রবন্ধের বই বিক্রি হয় ৫ হাজার।

শুধু জনপ্রিয়তাকামী লেখকরাই নন, সিরিয়াসকামীদের মধ্যে বৈচিত্র্য কম এখানে। প্রত্যেকেই একেকজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস হতে চায়।

হুমায়ূনকে ছোট করে, ঈর্ষা করে, অসূয়াগ্রস্ত হয়ে আমাদের সাহিত্যের বড় বড় সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। বরং তার প্রাপ্যটা দিতে হবে। মহাকালের ওপর কারো হাত নাই। যারা নিজেদের মহাকালের খতিব ভাবছেন তাদেরও কিছু করার নাই। মহাকাল অন্য জিনিশ।আপাতত আমরা নিজেদের কাল নিয়ে ভাবি। মহাকাল সাহেব খুশী হবেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s